সুখের আশায় নিঃস্ব তারা

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সাজিদা ইসলাম পারুল

গার্মেন্ট শ্রমিক রোকসানা বেগম। বয়স ২৮। ২০০৫ সালে সহকর্মী মিজান সরদারকে বিয়ে করেন। তাদের সংসারে রয়েছে এক ছেলে সন্তান। কিন্তু বিয়ের তিন বছর পর স্ত্রী-সন্তানকে রেখে বিদেশে চলে যান মিজান। এরপর থেকে স্বামীর সঙ্গে আর যোগাযোগ নেই রোকসানার। নিজের সামান্য উপার্জনে খেয়েপরে একমাত্র ছেলেকে নিয়ে ভালোই চলছিল তার জীবন। ২০১৮ সালের প্রথম দিকে পাশের বাড়ির ভাড়াটিয়া সোহাগ মিয়া ও তার স্ত্রী সানজিদা আক্তারের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। পরিচয়ের সূত্র ধরেই তাদের ফাঁদে পা দেন রোকসানা। সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার আশায় মালয়েশিয়া যাওয়ার স্বপ্ন দেখা শুরু করেন। ওই বছরের মে মাসে সোহাগ-সানজিদা তাকে নিয়ে যায় রাজধানীর ফকিরাপুলের ১৩০, ডিআইটি এক্সটেনশন রোডের রহমত ভবনের চারতলায়। সেখানে দেশ ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড মেডিকেল সেন্টারের মালিক পরিচয়দানকারী তোতা সিকদারের সঙ্গে পরিচয় করানো হয়। মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য এই তোতা সিকদারের হাতে তিন দফায় তুলে দেন জমানো ও ধারদেনা করে আনা তিন লাখ টাকা। প্রায় দেড় বছর কেটে গেছে, কিন্তু বিদেশে পাঠানোর কোনো নাম নেই। পাসপোর্ট কিংবা টাকা কোনো কিছুই ফেরত দেওয়া হয়নি। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস রোকসানা ঘুরছেন তোতা মিয়া, সোহাগ ও সানজিদার পিছু। বারবার তোতা সিকদারের অফিসে এসে লাঞ্ছিত, হুমকি-ধমকির শিকার হতে হয়েছে রোকসানাকে।

রোকসানা বেগম এই প্রতিবেদককে বলেন, একবার পল্টন থানার এক এসআইকে নিয়ে তোতা সিকদারের কাছে যাই টাকা তুলতে। পুলিশ দেখে তোতা বলেন, টাকা দিয়ে দেবেন। পরে আবার সে হুমকি দিয়ে বলে, 'পুলিশ নিয়ে আসছ, কোনো লাভ নাই, কেউ আমার কিচ্ছু করতে পারবে না।'

এ অবস্থায় চলতি বছরের ১১ সেপ্টেম্বর পল্টন মডেল থানায় জিডি করতে গেলে দায়িত্বরত কর্মকর্তা জিডি না নিয়ে টাকা তুলে দেওয়ার আশ্বাস দেন। তাতেও কোনো অগ্রগতি নেই। এখন মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন রোকসানা।

রোকসানার মতো আরও অনেকে তোতা, সোহাগ ও সানজিদার ফাঁদে পা দিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন। তাদের মধ্যে এই প্রতিবেদকের কথা হয় গার্মেন্টকর্মী আলমগীর হোসেন ও রীনার সঙ্গে। তারা ভিটেবাড়ি বিক্রি করে, স্বর্ণালঙ্কার বন্ধক রেখে ও ঋণ করে তাদের হাতে টাকা তুলে  দিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে টাকা ফেরত চাইতে গেলে তোতার হুমকির শিকার হন।

নারায়ণগঞ্জের বাসিন্দা আলমগীর হোসেন বলেন, 'সানজিদা ও সোহাগের কথায় গত বছর জানতে পারি, তারা বিদেশে লোক পাঠায়। তাদের কথায় বিশ্বাস কইরা স্ত্রীর স্বর্ণালঙ্কার জামানত রাইখা ২৫ হাজার টাকাসহ ভাই-বোনদের কাছ থেকে ঋণ নিয়া মোট সাড়ে তিন লাখ টাকা জমা দিই তোতা সিকদারের কাছে। কিন্তু গত দেড়টা বছর অফিসে ঘুরতাছি। কোনো কূল-কিনারা পাইতাছি না।'

গার্মেন্টকর্মী রীনার ভাগ্যেও ঘটেছে একই ঘটনা। সুখের আশায় বিদেশে পাড়ি জমাতে চেয়েছিলেন। সে আশায় তোতা সিকদারের হাতে তুলে দেন দুই লাখ টাকা। কষ্টার্জিত টাকার সঙ্গে সুদে ঋণ নিয়ে এ টাকা দেওয়া হয়। অথচ প্রতি মাসেই টাকার লাভ দিতে হচ্ছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, আদম ব্যবসায়ী তোতা সিকদার প্রতারণার এক ফাঁদ খুলে বসেছে। তার প্রতারণার কাজে সহযোগিতা করে সানজিদা ও সোহাগ মিয়া। তারা প্রথমে বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে অসহায় মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে। পরে বিদেশে গিয়ে বেশি টাকা বেতন পাওয়ার লোভ দেখিয়ে প্রতারণার ফাঁদ পাতে।

বিষয়টি নিয়ে আদম ব্যবসায়ী তোতা সিকদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। সে অভিযোগ স্বীকার করে বলে, রোকসানা, আলমগীর, রীনা টাকা দিয়েছে। ভিসা জটিলতার কারণে এখনও তাদের পাঠানোর ব্যবস্থা হয়নি। তাদের সঙ্গে আরও দু'জন টাকা দিয়েছিলেন। তারা বর্তমানে মালয়েশিয়ায় আছেন। চাকরি করছেন। টাকা ফেরত দেওয়া প্রসঙ্গে সে বলে, আমার অফিসে টাকা লেনদেন হয়েছি ঠিক, তবে তারা প্রত্যেকেই সানজিদার স্বামী সোহাগের হাতে টাকা দিয়েছে। সোহাগের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে সে বলে, 'টাকা আমি নেই নাই। নিছে তোতা সিকদার।'

পল্টন মডেল থানায় রোকসানার জিডি না নেওয়া প্রসঙ্গে এসআই জসীম সমকালকে বলেন, 'আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে জিডি হয় না। আমরা ভুক্তভোগীকে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছি। পরে তিনি অভিযোগ দায়ের করেন। প্রাথমিক তদন্তে তোতা সিকদার টাকা নেওয়ার বিষয় স্বীকার করেছে। সে জানিয়েছে সানজিদা ও সোহাগের হাতে টাকা দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে রোকসানাকে টাকা দিতে হলে তাদের দু'জনের উপস্থিতি কাম্য। সমঝোতার জন্য আমরা সময় দিয়েছি। এরপরও তারা টাকা ফেরত না দিলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'