সমস্যার গোড়ায় নজর দিন

বিশিষ্টজনের মত

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

ক্রীড়া প্রতিবেদক

দেশে অন্তত এই একটি জায়গায় কোনো বিভক্তির দেয়াল ছিল না, থাকলেও তা এতটা প্রকটভাবে দৃশ্যমান কখনও হয়ে ওঠেনি। ষোলো কোটি প্রাণ এক হয়ে দলমত নির্বিশেষে ক্রিকেটকে ভালোবেসে টাইগারদের পাশে দাঁড়ানোটাই বরাবরের অভ্যাস। তাই সেই প্রিয় ক্রিকেটাঙ্গনে দুই পক্ষ হয়ে যাওয়ায় শঙ্কিত ক্রিকেট অনুরাগীরা। এগারো দফা দাবি নিয়ে ধর্মঘট ডেকে একদিকে ক্রিকেটাররা, অন্যদিকে 'অনড়' অবস্থানে নাজমুল হাসান পাপনের নেতৃত্বে বিসিবি। সাকিবদের এ ধর্মঘটকে গতকাল 'ষড়যন্ত্র' বলে উড়িয়ে দিয়েছেন বিসিবি সভাপতি। দেশের ক্রিকেটকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেওয়ার চক্রান্ত মনে করছেন তিনি। ক্রিকেটারদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতেও একাট্টা হয়েছেন পরিচালকদের একাংশ।

ক্রীড়াঙ্গনের বিশিষ্টজন, বিশেষ করে ক্রিকেট বোর্ডের সাবেকরা মনে করেন, বিভেদ তৈরি না করে, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব থেকে বেরিয়ে এসে সমস্যার সমাধানে উদ্যোগী হওয়া উচিত। ব্লেমগেম কোনো প্রকার সুফল বয়ে আনবে না। তাদের পরামর্শ হচ্ছে, বোর্ড সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন সমস্যার গোড়ায় নজর দিয়ে তার সমাধানের জন্য চেষ্টা করবেন। পর্যবেক্ষকদের মতে, দাবি বা বক্তব্য উপস্থাপনের ক্ষেত্রে ক্রিকেটারদের যদি কোনো বিচ্যুতি থাকেও সেটাকে এতটা আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে মোকাবেলা করতে যাওয়া খুব একটা জরুরি ছিল না পাপনের জন্য। বরং ক্রিকেটের অভিভাবক সংস্থার কর্ণধার হিসেবে তিনি আরও সহনশীলতার পরিচয় দিতে পারতেন। সত্যিকার অর্থে সংকটের সমাধান করতে চাইলে তাকে আরও সংবেদনশীল হতে হবে। ক্রিকেটারদের ভুল-ত্রুটি নিয়ে বেশি মাথা না ঘামিয়ে প্রকৃতপক্ষে তাদের সমস্যাগুলোই মনোযোগ দিয়ে বিশ্নেষণ করতে হবে। দায়িত্ব নিয়ে তাদের কাছে ডাকতে হবে এবং সবার কথা শুনে একটা গ্রহণযোগ্য উপায় খুঁজে বের করতে হবে।

পাল্টা অভিযোগে কোনো সমাধান আসবে না বলেই মনে করেন বিশিষ্টজন। ক্রিকেটারদের প্রতি তাদের আহ্বান, যেন তারাও ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে সমাধানের পথটুকু সবসময়ই খোলা রাখেন।

বিদ্যমান সংকটের বিষয়ে বিসিবির সাবেক সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, 'আমি জানি না, সভাপতি সাহেবের কাছে কী তথ্য আছে। খেলোয়াড়রা সোমবার সংবাদ সম্মেলন করল। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে উনি ষড়যন্ত্র দেখতে পেলেন। উনার কাছে নিশ্চয়ই কোনো তথ্য আছে। তথ্য ছাড়া যদি তিনি কিছু বলে থাকেন তাহলে এটা আরেকটা বড় বিপদ। ধরে নিয়েছেন ষড়যন্ত্র হয়েছে। পরবর্তী সময়ে এই ষড়যন্ত্রকেই প্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্টা করবেন তিনি। তবে যদি আসলেই ষড়যন্ত্র হয়ে থাকে, তাহলে দোষীদের শাস্তি হওয়া উচিত।'

স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন চৌধুরী মনে করেন, ফুটবলের মতো ক্রিকেটকে বাঁচাতে হবে। 'বাংলাদেশের পতাকা একমাত্র ক্রিকেটাররাই সসম্মানে উড়িয়েছে। বাংলাদেশের ঐশ্বর্যশালী প্রতিষ্ঠান যদি বলি সেটা ক্রিকেটকেই মনে করা হয়। এটার তো সমাধান হওয়া উচিত। পাপন সাহেব খুঁজছেন ষড়যন্ত্রকারী। উনি যে ষড়যন্ত্র করে ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি হয়ে আছেন। উনাকে বিসিবিতে দেওয়া হয়েছিল তিন মাসের জন্য। নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালন করে উনি সরে যাবেন। উনি করেছেন কি, একেকটা ক্লাবকে দুটি করে কাউন্সিলরশিপ দিয়ে নিজের জায়গা শক্ত করেছেন। এই ষড়যন্ত্রগুলোরও তো তাহলে বিচার হওয়া দরকার। পৃথিবীতে যারা ষড়যন্ত্র করে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করে তারা সব সময় সব কাজে ষড়যন্ত্র দেখে। কারণ তার মাথার ভেতরে ওটা ছাড়া আর কিছু ঘুরপাক খায় না। উনি তো বলেছেন, না খেললে কোনো অসুবিধা নেই। খেলোয়াড়ের অভাব নেই।'

সাবের হোসেন চৌধুরীর মতে, ক্রিকেটারদের দাবিগুলো ইতিবাচকভাবে দেখা উচিত। এখানে দুটো দিক আছে- খেলোয়াড় হিসেবে যে সুযোগ-সুবিধা, পারিশ্রমিক এবং খেলার পরিবেশ ও ফ্যাসিলিটি একটা দিক। আর একটা দিক হলো, ঘরোয়া ক্রিকেটে তাদের মন্তব্য বা সুপারিশ ছিল। নীতিগতভাবে আমরা সবাই তো একমত যে, ঘরোয়া ক্রিকেটের ভিত শক্তিশালী না হলে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট দাঁড়াবে না। সেদিক থেকে তাদের সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত। বিশেষ করে তারা যে আম্পায়ারিংয়ের মান নিয়ে বলেছে। খেলা হওয়ার আগেই ফলাফল নির্ধারিত হয়ে যায়। সেটা যদি হয়, তাহলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ম্যাচ ফিক্সিং বা দুর্নীতিকে প্রতিষ্ঠিত করা হবে। এখানে তো একটা গুণগত পরিবর্তন আসতেই হবে। আর আর্থিক যে বিষয় আছে সেগুলো বসে সমাধান করতে হবে। আমি কিছুটা অবাক হয়েছিলাম, যখন সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তারা জানাল। সবাই কিন্তু বলছিল, এটা যৌক্তিক ও প্রত্যাশিত। আমার প্রত্যাশা ছিল ক্রিকেট বোর্ড সমাধানের দিকে যাবে। তারা সমাধানের দিকে না গিয়ে পাল্টা একটা সংবাদ সম্মেলন করল। আসলে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সমাধান হওয়ার নয়। ক্রিকেট বোর্ডকে বুঝতে হবে, খেলোয়াড় ছাড়া খেলা নেই। খেলোয়াড়দেরও বুঝতে হবে তাদের যে দাবিগুলো আছে সেগুলো ক্রিকেট বোর্ডের মাধ্যমেই আদায় বা নিশ্চিত করতে হবে। এখন যেটা হয়ে গেছে, একটা পক্ষ এবং বিপক্ষ দাঁড়িয়ে গেছে। দেশের ক্রিকেটে বিভেদের সৃষ্টি হয়েছে। বিসিবিপ্রধানকে অভিভাবক হিসেবে ক্রিকেটারদের সঙ্গে বসে পুরো ব্যাপারটির সমাধানের পক্ষে পরামর্শ দিয়েছেন সাবের চৌধুরী। তারা সমাধানের কথা না বলে মোটামুটি ইগোর সমস্যা বলে ধরে নিয়েছেন। তারা আসেনি, ঠিক আছে। ক্রিকেট বোর্ড তো ক্রিকেট এবং ক্রিকেটারদের অভিভাবক। অভিভাবক হিসেবে একটু হলেও তাদের এগিয়ে আসতে হবে। খেলোয়াড়দেরও অহং থেকে বেরোতে হবে। এখন যা হয়েছে তাতে সমাধান দূরের কথা, সংকট আরও ঘনীভূত হবে। সেটা তো আমরা কেউই চাই না। এখন যেটা দরকার, কে কী বলল না বলল, দুই পক্ষকে বসে দ্রুত একটা সমস্যার সমাধানে পৌঁছাতে হবে।