ক্রিকেটারদের ধর্মঘট

হার্ডলাইনে বিসিবি

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

ক্রীড়া প্রতিবেদক

কোনোটা বাউন্সার, কোনোটা গুগলি, কোনোটা বা বিষাক্ত ইয়র্কার- এক ঘণ্টা ছত্রিশ মিনিটের সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের দিক থেকে তেড়ে আসা বলগুলোর সবই যেন ডাউন দ্য উইকেটে খেলছিলেন বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন। সাকিবদের ১১ দফা দাবিগুলোকে 'কোনো দাবিই না' বলে এক-এক করে ব্যাখ্যা দিচ্ছিলেন তিনি। বলার চেষ্টা করেছেন, দাবিগুলোর বেশিরভাগই পূরণ হয়েছে, না হয় পূরণ হওয়ার পথে। আক্ষেপ করছিলেন- ভালো সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও ক্রিকেটাররা কেন তার কাছে না এসে ধর্মঘট ঘোষণা করলেন, কেন ভারত সফরের আগেই করলেন? এসব কৌতূহলের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তিনি পুরো ব্যাপারটির মধ্যে 'ষড়যন্ত্র' দেখছেন। আশা করছেন, নিজেদের অবস্থান থেকে সরে এসে সাকিবরা ভারত সফরের ক্যাম্পে যোগ দেবেন। ক্রিকেটারদের কোর্টে বল ঠেলে বিসিবিপ্রধান এখন অপেক্ষা করছেন সাকিবদের দিক থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার। কিন্তু সেটা যদি না হয়? 'ওরা এলে আসবে, না এলে নাই। ক্রিকেটাররা খেললে খেলবে, না খেললে আমাদের কিছুই করার নেই।' বিসিবি যে হার্ডলাইনে যাচ্ছে, তা নাজমুল হাসান পাপনের এই কড়া সুরেই স্পষ্ট।

এদিকে বিসিবির কঠোর অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে নিজেদের পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে আজ সিদ্ধান্তের কথা জানাবেন ক্রিকেটাররা। গতকাল বিসিবিপ্রধানের সংবাদ সম্মেলনের পরই নিজেদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে সাকিব-তামিমরা বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন। 'এখানে ষড়যন্ত্রের কোনো ব্যাপার নেই। আমরা কেউই ব্যক্তিগত কোনো দাবি নিয়ে যাইনি। আমাদের দাবিগুলো সমষ্টিগত। তাই পরবর্তী সিদ্ধান্তগুলোও সবাই মিলে বসে ঠিক করব'- নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলের এক সিনিয়র ক্রিকেটার বলছিলেন এমনটাই। সাকিবদের এই আন্দোলনকে বিসিবির পক্ষ থেকে 'ষড়যন্ত্র' বলা হলেও ক্রিকেটারদের স্বার্থ রক্ষার দায়িত্বে থাকা আন্তর্জাতিক সংগঠন ফেডারেশন অব ইন্টারন্যাশনাল ক্রিকেটার্স অ্যাসোসিয়েশন (ফিকা) সমর্থন জানিয়েছে। গতকাল এক বিবৃতিতে ফিকার প্রধান নির্বাহী টনি আইরিশ বলেন, 'বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা তাদের সংহতির জন্য এবং পেশাদার ক্রিকেটার হিসেবে ন্যায্য অবস্থা নিশ্চিত করতে যে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিয়েছে, তার জন্য সাধুবাদ জানাচ্ছে ফিকা।'

একদিকে খেলা চলছে, অন্যদিকে ধর্মঘট। ঢাকা তৃতীয় বিভাগ ক্রিকেট লিগের ম্যাচ হয়েছে গতকাল। পাকিস্তানে গেছে অনূর্ধ্ব-১৬ এবং জাতীয় নারী ক্রিকেট দল। আজ ঢাকায় আসছে শ্রীলংকান অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দল। বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের ক্যাম্পও পূর্বের নিয়মেই চলছে। দেশের ক্রিকেট সচল এবং অচল। ১১ দফা দাবি আদায়ে সোমবার জাতীয় দল এবং জাতীয় লিগের ক্রিকেটাররা ধর্মঘট ডাকায় উঁচু স্তরের ক্রিকেট অচল হয়ে পড়েছে। শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটারদের এই ধর্মঘটের পেছনে ষড়যন্ত্র দেখতে পাচ্ছেন বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন। একে দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র বলছেন তিনি। বাইরের কেউ ক্রিকেটারদের আন্দোলনে নামিয়েছেন বলে দাবি তার। এক-দু'জন সিনিয়র ক্রিকেটারও এর পেছনে জড়িত বলে মনে করেন তিনি। ১০ দিনের মধ্যে ষড়যন্ত্রকারীদের খুঁজে বের করার ঘোষণাও দেন বোর্ড সভাপতি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গতকাল পরিচালনা পর্ষদের এক জরুরি সভা শেষে সোয়া এক ঘণ্টার সংবাদ সম্মেলনে নরমে-গরমে ক্রিকেটারদের আলোচনায় টেবিলে আনতে চাচ্ছেন পাপন। সমস্যার সমাধানে ক্রিকেটাররা এগিয়ে না এলে বোর্ড কঠোর হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিসিবি সভাপতি।

বিসিবি কর্মকর্তাদের একপেশে সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ এবং নিজেদের দাবি-দাওয়া আদায়ে হঠাৎ করেই একাট্টা হয়েছেন ক্রিকেটাররা। ১১ দফা দাবি আদায়ে জাতীয় লিগ এবং জাতীয় দলের খেলাসহ সব ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার ঘোষণা দেন তারা। খেলোয়াড়দের এই সিদ্ধান্তে বিস্মিত হন বিসিবি সভাপতিসহ পরিচালকদের সবাই। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সোমবার সন্ধ্যায় পাপন 'কোর' পরিচালকদের সঙ্গে বেক্সিমকো ফার্মার অফিসে বৈঠক করেন। গতকাল দুপুরে জরুরি সভা ডেকে খেলোয়াড়দের দাবি-দাওয়া নিয়ে পরিচালকদের সঙ্গে কথা বলেন পাপন। যেখানে বেশিরভাগ দাবি মেনে নেওয়ার ব্যাপারে একমত হয়েছে পরিচালনা পর্ষদ। একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ক্রিকেটারদের সঙ্গে কথা বলে খেলায় ফেরাতে চান তারা। সংবাদ সম্মেলনে আক্ষেপ করে পাপন বলেছেন, 'আমি খুব বিস্মিত হয়েছি ক্রিকেটাররা ধর্মঘটের ডাক দেওয়ায়। দাবি আদায়ে তারা যে খেলা বন্ধ রাখার ঘোষণা দিতে পারে, সেটাই বিশ্বাস করতে পারছি না। যে কোনো প্রয়োজনে আমার কাছে আসে তারা। সবার সব ধরনের সমস্যার সমাধান করে দিই। অথচ তারা আমার কাছে না এসে মিডিয়ায় ব্রিফিং দিয়ে দাবি-দাওয়া পেশ করেছে। তারা যে ১১টা দাবির কথা বলেছে সেগুলোর সবই তো হয়ে আছে। আরও কিছুর দরকার হলে আমাকে জানালেই তো পেয়ে যেত তারা। দাবি-দাওয়া দিয়ে এখন আবার তারা মোবাইল বন্ধ করে রেখেছে। ফোন করলেও ধরছে না। এর অর্থ হলো, পেছনে কেউ আছে যে দেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। ১০ দিনের মধ্যেই এই ষড়যন্ত্রকারীকে বের করা হবে।'

এই আন্দোলনে খেলোয়াড়দের কোনো লাভ হয়নি বলে দাবি পাপনের। বরং তারা দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করতে পেরেছে বলে মনে করেন তিনি। পাপনের দৃষ্টিতে, 'ওরা টাকার জন্য এটা করতে পারে, আমি ভাবতেও পারি না। কোটি কোটি টাকা বোনাস দেওয়া হয়। টাকার জন্য হতে পারে না, এর পেছনে অন্য কিছু আছে। কেউ না কেউ ষড়যন্ত্র করছে। তারা দেশের ক্ষতি করতে চায়। একটা জায়গায় তারা সফল হতে পেরেছে, দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে।' তবে এই ষড়যন্ত্রের পেছনে কে বা কাকে সন্দেহ করছেন, তা বলেননি বিসিবি সভাপতি পাপন। যে ক'জন ক্রিকেটারকে সন্দেহের তালিকায় রেখেছেন বিসিবি সভাপতি, তাদের নামও বলতে চাননি। হাবেভাবে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন, সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবাল এই আন্দোলনের পেছনে কলকাঠি নাড়ছেন। কারণ সাকিব সামনে থেকে এই ধর্মঘটের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

এদিকে কালই জাতীয় লিগের তৃতীয় রাউন্ডের ম্যাচ শুরু হবে। জাতীয় দলের ক্যাম্প শুরু পরশু। তাই কাল থেকেই ক্রিকেটারদের মাঠে দেখতে চান বিসিবি সভাপতি। সেটা না হলে কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে হুঁশিয়ারি দেন পাপন। তিনি বলেন, 'আমরা আশা করছি, ক্রিকেটাররা খেলায় ফিরবে। জাতীয় দলের ক্যাম্পও ঠিক সময়ে হবে। আর তারা না এলে তখন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।' তবে কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে বিসিবি সভাপতি বলেন, 'না এলে নাই। দেখেন, ওরা কোন সময়টাকে বেছে নিয়েছে, যখন ভারতের বিপক্ষে খেলা। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ শুরু হচ্ছে ভারতের বিপক্ষে সিরিজ দিয়ে। নতুন কোচিং স্টাফ এসেছে কিছুদিন হলো। স্পিন পরামর্শক কোচ ড্যানিয়েল ভেট্টরি আসবে। আর এই সময়ে তারা খেলবে না। তারা ফোন ধরছে না, যোগাযোগ করছে না, এর অর্থ ওরা খেলবে না।' তবে বিসিবি সভাপতি পাপন সংবাদ সম্মেলনে যেভাবে আক্রমণাত্মক ছিলেন তাতে করে বলা যেতে পারে, দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় সমস্যার সমাধান হলেও খেলোয়াড়দের সহজে ছাড় দেওয়া হবে না। ভুলত্রুটি পেলেই নিষেধাজ্ঞার বিপজ্জনক জোনে ছুড়ে দেওয়া হবে টার্গেট ক্রিকেটারদের।