খুনিদের শাস্তি ও বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি

বিক্ষোভে উত্তাল ক্যাম্পাস উপাচার্য ৩ ঘণ্টা অবরুদ্ধ

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সমকাল প্রতিবেদক ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে বিক্ষোভে মঙ্গলবার দিনভর উত্তাল ছিল ক্যাম্পাস। বুয়েট থেকে হত্যাকারীদের স্থায়ীভাবে বহিস্কার ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এবং ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করাসহ আট দফা দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে উত্তপ্ত ছিল বুয়েট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। দাবির সমর্থনে গতকাল বুয়েটের শহীদ মিনারের সামনে অবস্থান নেন বুয়েট শিক্ষার্থীরা। একই দাবিতে আজ বুধবারও বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি চলবে বলে জানিয়েছেন আন্দোলন-কারীরা।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসহ আশপাশের এলাকায় আবরারের প্রতীকী লাশ নিয়ে বিক্ষোভ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহস্রাধিক শিক্ষার্থী। বিক্ষোভে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত রাজধানীর সাত কলেজের শিক্ষার্থীরাও যোগ দেন। ক্যাম্পাসে আবরারের গায়েবি জানাজাও পড়েন ঢাবি শিক্ষার্থীরা। আবরার খুনের বিচার দাবিতে আন্দোলনে নামা বুয়েট শিক্ষার্থীরা মামলার অভিযোগপত্র না হওয়া পর্যন্ত ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ডাক দিয়েছেন। দিনভর ক্ষোভ-বিক্ষোভে উত্তাল ক্যাম্পাসে উপাচার্যের কথায় সন্তুষ্ট না হওয়ায় আন্দোলনরতদের মুখপাত্র হিসেবে গতকাল সন্ধ্যায় এ ঘোষণা দেন ২০১৫ ব্যাচের শিক্ষার্থী আবুল মনসুর। তিনি বলেন, 'যাদের গ্রেফতার করা হয়নি, তাদের দ্রুত গ্রেফতার করতে হবে। মামলার চার্জশিট না হওয়া পর্যন্ত বুয়েটের আসন্ন ভর্তি পরীক্ষাসহ সব একাডেমিক ও প্রশাসনিক কাজ স্থগিত থাকবে। আন্দোলনও চলবে।'

আট দফা দাবিতে মঙ্গলবার সকাল থেকে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ শুরু করেন বুয়েটের শিক্ষার্থীরা। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সব ক্লাস-পরীক্ষা ও একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধের ঘোষণা দেন তারা। শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে অপরাধীদের শাস্তির দাবি জানান বুয়েটের বিভিন্ন ব্যাচের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাও। ঢাবি ও বুয়েট ক্যাম্পাসে পূজার ছুটি থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে আন্দোলনে অংশ নেন। তারা সন্ধ্যায় উপাচার্যকে তার কার্যালয়ে প্রায় তিন ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখেন।

আন্দোলনরতদের আট দফা দবি হলো- আবরারের খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে খুনিদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আজীবন বহিস্কার করা, আবাসিক হলগুলোতে র‌্যাগের নামে এবং ভিন্নমত দমানোর নামে নির্যাতন বন্ধে প্রশাসনের সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চিত করা, ঘটনার ৩০ ঘণ্টা পরও ভিসি কেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হননি তা মঙ্গলবার বিকেল ৫টার মধ্যে ক্যাম্পাসে উপস্থ্থিত হয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে জবাব দেওয়া, আবরার হত্যা মামলার খরচ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে বহন করা, এর আগের ঘটনাগুলোর বিচার করা, ১১ অক্টোবরের মধ্যে শেরেবাংলা হলের প্রভোস্টকে প্রত্যাহার করা এবং বুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা। বুয়েটের শেরেবাংলা হলে প্রভোস্ট পদত্যাগে সম্মত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া আগামী সাত দিনের মধ্যে বুয়েটে সব ছাত্র সংগঠনের সাংগঠনিক কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধের ঘোষণা দেন আন্দোলনকারীরা।

আন্দোলন চলাকালে শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করতে আসেন বুয়েটের ছাত্রকল্যাণ পরিষদের পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর রহমান। সকাল সাড়ে ১১টার দিকে তিনি ক্যাম্পাসে এলে আন্দোলনকারীরা তাকে ঘিরে ধরেন। শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের জন্য তার কাছে দাবি জানান। তোপের মুখে পড়েন তিনি। তিনি স্বীকার করেন, 'আমাদের দেশে বর্তমানে যে পরিস্থিতি, তাতে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি থাকার দরকার নেই। বুয়েটে ছাত্ররাজনীতি থাকার কোনো প্রয়োজন নেই।' এ সময় শিক্ষার্থীরা করতালি দিয়ে তাকে অভিনন্দন জানান। তবে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের কথা না বলায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়াও দেখান আন্দোলনকারী অনেকেই। একপর্যায়ে মিজানুর রহমান বলেন, তিনি উপাচার্যকে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করার বিষয়টি অবহিত করবেন। তিনি বলেন, 'আমি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আছি'। এ সময় তাকে সেখানে ৫টা পর্যন্ত থাকার অনুরোধ জানান শিক্ষার্থীরা। এ ছাড়া শিক্ষার্থীরা উপাচার্যকে ক্যাম্পাসে নিয়ে আসার জন্যও তার কাছে অনুরোধ করেন।

শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ কর্তৃপক্ষ :শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে বুয়েট শিক্ষক সমিতি। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে এমন অভিযোগ করেন শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. একেএম মাসুদ। এর আগে আবরার হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বিবৃতি দেয় শিক্ষকদের এ সংগঠন। অধ্যাপক মাসুদ সেটি পুনরায় শিক্ষার্থীদের পড়ে শোনান।

শিক্ষার্থীদের আট দফা দাবির সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে অধ্যাপক মাসুদ আবরার হত্যায় জড়িতদের শাস্তির জোরালো দাবি জানান তিনি। এ ছাড়া বুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করা দরকার বলেও মনে করেন তিনি। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষার্থী নির্যাতনের শিকার হবে এবং মৃত্যুবরণ করবে তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

শিক্ষক সমিতির এ বিবৃতিতে বলা হয়, একাডেমিক ভবন, আবাসিক হলসহ সমগ্র ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের। এ হত্যা প্রমাণ করেছে, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। এতে বলা হয়, অতীতে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীদের ওপর ঘটে যাওয়া নির্যাতন ও র‌্যাগিংয়ের ঘটনায় দোষীদের শাস্তি প্রদানে কর্তৃপক্ষের নিষ্ফ্ক্রিয়তায় আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটেছে। ফলশ্রুতিতে আবরার হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, এর দায় কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে না। বিবৃতিতে আবরার হত্যায় জড়িতদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে চিহ্নিত করে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদানের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

উপাচার্য কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ :শিক্ষার্থীদের আলটিমেটাম অনুসারে বিকেল ৫টার মধ্যে উপাচার্য উপস্থিত না হওয়ায় বিকেলে তার সঙ্গে দেখা করতে উপাচার্যের কার্যালয় ঘিরে বিক্ষোভ মিছিল করেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। তবে কার্যালয়ের গেটের ভেতর থেকে তালা দেওয়া থাকায় প্রবেশ করতে পারেননি তারা। পরে গেটের বাইরে থেকে আরেকটি তালা লাগিয়ে দিয়ে কার্যালয় সামনে অবস্থান নেন তারা। বুয়েট শহীদ মিনারের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করার পর বিকেল ৪টার পর থেকেই উপাচার্যের কার্যালয়ের সামনে জড়ো হতে থাকেন শিক্ষার্থীরা। উপাচার্য অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম ওই সময় বিভিন্ন হল প্রভোস্টদের নিয়ে মিটিং করছিলেন। এদিকে উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করতে না পারায় গেটের তালা ভেঙে প্রবেশ করার দাবিও জানায় শিক্ষার্থীদের একপক্ষ। অপরপক্ষের দাবি, উপাচার্য নিজ থেকে এসে শিক্ষার্থীদের কাছে জবাবদিহি করুক।

এ সময় উপাচার্য কার্যালয়ের সামনে শিক্ষার্থীদের স্লোগান দিতে দেখা যায়। 'আমার ভাই মরল কেন, প্রশাসন জবাব চাই', 'আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে', 'প্রশাসনের টালবাহানা, চলবে না চলবে না'সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন তারা।

তোপের মুখে উপাচার্য :অবশেষে সন্ধ্যা ৬টার পর শিক্ষার্থীদের সামনে আসেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলাম। শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েন তিনি।

শিক্ষার্থীরা নানা প্রশ্নবাণে তাকে জর্জরিত করেন। উপাচার্য বলেন, 'তোমাদের দাবির বিষয়ে নীতিগতভাবে আমরা একমত। সবক'টা দাবি আমরা মেনে নিয়েছি। তোমরা অধৈর্য হয়ো না। দাবিগুলো বাস্তবায়নে আমরা কাজ করব।' শিক্ষার্থীরা জানতে চান, 'গতকাল (সোমবার) আপনি আসেননি কেন?' উপাচার্য বলেন, 'আমি রাত ১টা পর্যন্ত অফিস করেছি। তোমাদের জন্যই কাজ করেছি।' এ সময় তিনি শিক্ষার্থীদের অধৈর্য না হওয়ার আহ্বান জানান।

এ সময় তিনি সার্বিক বিষয়ে কথা বলার জন্য শিক্ষার্থীদের একটি প্রতিনিধি দল পাঠিয়ে আলোচনায় বসার আহ্বান জানান। তবে শিক্ষার্থীরা তা প্রত্যাখ্যান করেন। তারা সবাই মিলে একসঙ্গে বসতে চান। এ সময় উপাচার্য সবাইকে নিয়ে বসা যায় না বলে জানান।

শিক্ষার্থীরা তার আশ্বাসে আশ্বস্ত না হলে দাবি দ্রুত মেনে নিতে বিভিন্ন প্রশ্ন করতে থাকেন। এক পর্যায়ে উপাচার্য স্থান ত্যাগের চেষ্টা করলে শিক্ষার্থীরা তাকে উপাচার্য কার্যালয়ে ঢুকতে বাধ্য করেন। এরপর তাকে কক্ষে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়। তার সঙ্গে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ পরিষদের পরিচালক অধ্যাপক মিজানুর রহমানসহ কয়েকজন শিক্ষক। এ সময় শিক্ষার্থীরা তাদের আট দফা দাবি না মানা পর্যন্ত আগামী ১৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিতব্য ভর্তি পরীক্ষাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কার্যক্রম বন্ধ রাখার ঘোষণা দেন।

রাতে বুয়েট শহীদ মিনারে শিক্ষার্থীরা মোমবাতি প্রজ্বালন করেন। ভিসি এ সময় তার কার্যালয়ে অবরুদ্ধ ছিলেন। সর্বশেষ প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে, প্রায় ৩ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর রাত সাড়ে ৯টায় উপাচার্য ক্যাম্পাস থেকে মুক্ত হয়ে লালবাগের বাসায় ফেরেন। শিক্ষার্থীরা জানান, তারা রাতে ব্যাচভিত্তিক বৈঠক করে বুধবার সকালে নতুন কর্মসূচি ও দাবিগুলো তুলে ধরবেন।

ঢাবিতে গায়েবানা জানাজা ও প্রতীকী লাশ নিয়ে মিছিল :এদিকে দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের সামনে হত্যাকাণ্ডের শিকার আবরার ফাহাদের গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সহস্রাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেন। বিচারকার্যে কোনো অবহেলা হলে কঠোর আন্দোলনে যাওয়ার ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা আববারকে শহীদ হিসেবে অবহিত করেন। তারা বলেন, আবরার দেশের পক্ষে কথা বলে শহীদ হয়েছেন। জানাজা শেষে আবরারের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে মোনাজাত করা হয়। জানাজা ও মোনাজাত পরিচালনা করেন ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেন। এ সময় ডাকসুর ভিপি নুরুল হক নুর, বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের আহ্বায়ক হাসান আল মামুন, যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খান, ফারুক হাসানসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।

এরপর আবরারের প্রতীকী লাশ নিয়ে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেন শিক্ষার্থীরা। রাজু ভাস্কর্য থেকে শুরু হয়ে মিছিলটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে পলাশী, বুয়েটের শহীদ মিনার, দোয়েল চত্বর, শাহবাগ হয়ে পুনরায় রাজু ভাস্কর্যের সামনে গিয়ে শেষ হয়। এ সময় সাত কলেজ ব্যানারেও শতাধিক শিক্ষার্থী তাদের সঙ্গে মিছিল করেন। এর আগে সকালে ঢাকা কলেজের মূল ফটকের সামনে মানববন্ধন করেন সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা।

ঢাবি শিক্ষক সমিতির প্রতিবাদ :আবরার ফাহাদের হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। এ হত্যাকাণ্ডকে নির্মম ও পৈশাচিক আখ্যা দিয়ে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তির দাবি জানায় সংগঠনটি। গতকাল মঙ্গলবার সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল ও যুগ্ম সম্পাদক অধ্যাপক ড. তাজিন আজিজ চৌধুরী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব কথা জানানো হয়।

রুম নম্বর ১০১১ :বুয়েটের শেরেবাংলা আবাসিক হলের ১০১১নং কক্ষে থাকতেন আবরার। ছাত্রলীগ নেতারা রুম থেকে ডেকে নেওয়ার সময় অঙ্ক করছিলেন আবরার।

গতকাল সকালে গিয়ে আবরারের ১০১১ নম্বর রুমে তার পড়ার টেবিলে অঙ্ক খাতাটি উন্মুক্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে। তিনি ইলেকট্রিক মেশিনারি ফান্ডামেন্টালস বইয়ের ৫৯ পৃষ্ঠার কনটিনিউয়াস টাইম সিস্টেম সাফটার-২ অধ্যায় অনুশীলন করছিলেন। রোববার রাত ৮টার দিকে এই বই পড়ার সময় তাকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়।

তার এক সহপাঠী জানিয়েছেন, ডেকে নেওয়ার সময় অঙ্ক করছিলেন আবরার। ছাত্রলীগ নেতাদের ডাকে সাড়া দিয়ে গণিতের খাতাটা খোলা রেখে তাদের সঙ্গে চলে যান আবরার।

মঙ্গলবার সকালে আবরারের রুমে গিয়ে দেখা যায়, জায়নামাজ বিছানায় পড়ে আছে। টেবিলে পড়ে আছে পটেটো চিপস, টিস্যু পেপার, কলমদানিতে কিছু খুচরা টাকা এবং বিছানায় পড়ে আছে বিদ্যুৎ সংযোগ লাগানো মোবাইল চার্জার।

আবরার সাহিত্য পড়তে খুব ভালোবাসতেন বলে জানান রুমমেটরা। রবীন্দ্র রচনাসমগ্র, সাধারণ জ্ঞানচর্চার কিছু বই, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় রচনাসমগ্রসহ আরও কিছু বই দেখা যায়। নিয়মিত আরবি লেখাপড়া চর্চাও করতেন তিনি।

রুমমেটদের কিছু জিজ্ঞাসা করতেই তারা কান্নায় ভেঙে পড়েন। আবরারের রুমের বড় ভাই মিজানুর রহমান বলেন, 'রোববার আমি সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে টিউশনি থেকে ফিরি। আসার পর আবরার সালাম দেয়। আমি পোশাক পাল্টে ওয়াশরুমে যাই। পরে দেখি কয়েকজন এসে তাকে ডেকে নিয়ে গেল। এই তার সঙ্গে আমার শেষ দেখা।' এই বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

এ ঘটনায় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকসহ এ পর্যন্ত নয়জনকে আটক করেছে পুলিশ।

আলোচনায় অমিত সাহা :আবরার হত্যাকাে র পর বুয়েট ক্যাম্পাসে আলোচনার শীর্ষে আছেন অমিত সাহা। সব ছাত্রছাত্রীর মুখে তার নাম। বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক তিনি। তার বিরুদ্ধে আবরার ফাহাদকে হত্যার অভিযোগ থাকলেও মামলায় তাকে আসামি করা হয়নি। তিনি এখন কোথায়, তা বলতে পারছে না আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কেউ। অথচ আবরারকে তার কক্ষেই হত্যা করা হয়। আবরার হত্যাকাে অমিত সাহা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন বুয়েটের শিক্ষার্থীরা। অবশ্য কেউ কেউ বলেন, তিনি ওইদিন হলে ছিলেন না। সাড়ে ৭টার দিকে তিনি হল থেকে বেরিয়ে যান।

চকবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সোহরাব হোসেন বলেন, 'ভিডিও ফুটেজ দেখে যাদের শনাক্ত করা হয়েছে, কেবল তাদের নামেই মামলা হয়েছে। এর পরও তদন্ত হবে। তদন্তে যদি অমিতের সংশ্নিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া যায়, অবশ্যই তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।'

মঙ্গলবার বুয়েট ক্যাম্পাসের সামনে ১৫তম ব্যাচের শিক্ষার্থী হেলালউদ্দিন বলেন, '২০১১ নম্বর কক্ষটি অমিত সাহার। ঘটনার সময় তার নেতৃত্বে ছাত্রলীগের কর্মীরা আবরারকে বেদম মারধর করেন। পরে তিনিসহ অন্যরা বেরিয়ে যান।'

বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর কৃষ্ণ কনশাসনেসের (ইসকন) সদস্য অমিত সাহা। ইসকনের ব্যানারে তিনি বিভিন্ন সময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্ম নিয়ে বিভিন্ন স্ট্যাটাস দিতেন। তবে ঘটনার পর থেকে তার ফেসবুক ডিঅ্যাকটিভ আছে। তার মোবাইল নম্বরও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।

প্রেস ক্লাবে প্রতিবাদী মানববন্ধন :আবরার হত্যাকাে প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করে 'ফিউচার অব বাংলাদেশ' এবং 'ইসলামী ছাত্রসেনা'।