'১৭-এর আবরার ফাহাদ। মেরে হল থেকে বের করে দিবি দ্রুত। এর আগেও বলেছিলাম। তোদের তো দেখি কোনো বিগার নাই। শিবির চেক দিতে বলেছিলাম।' শনিবার (৫ অক্টোবর) দুপুর ১২টা ৪৭ মিনিটে বুয়েট ছাত্রলীগের মেসেঞ্জার গ্রুপে এমন কথোপকথন ছিল মেহেদী হাসান রবিনের। তিনি বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। তার নির্দেশনার উত্তরে মনিরুজ্জামান মনির বলেন, 'ওকে ভাই।' পরে মেহেদী উত্তেজিত হয়ে একটি অশ্নীল শব্দ লিখে বলে, '...ভাই। দুই দিন সময় দিলাম।' মনির হলেন বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের সাহিত্য সম্পাদক। এরপর গ্রুপ চ্যাটে মেহেদী লিখেন, 'দরকার হলে ১৬ ব্যাচের মিজানের সঙ্গে কথা বলিস। ও শিবির ইনভোলমেন্টের ব্যাপারে আরও কিছু ইনফো দেবে।' মিজান হলেন আবরারের রুমমেট। তারা দু'জন শেরেবাংলা হলের ১০১১ নম্বর কক্ষে থাকতেন। আবরার হত্যার পর তদন্তে বেরিয়ে আসছে মেসেঞ্জার গ্রুপে এমন কথোপকথন। সমকালের হাতে আসা এসব কথোপকথনের কিছু স্ট্ক্রিনশটে দেখা যায়, ওই গ্রুপটি চালাত শেরেবাংলা হল ছাত্রলীগের ১৬ ও ১৭ ব্যাচ। যার সংক্ষিপ্ত নাম 'এসবিএইচএসএল-১৬+১৭'। ওই কথোপকথন দেখে এটার প্রমাণ মিলল, নির্যাতনের জন্য আগে থেকেই টার্গেটে ছিলেন আবরার।

মেসেঞ্জার গ্রুপের কথোপকথনে আরও রয়েছে, ঘটনার রাতে একজন লিখেন, 'আবরার ফাহাদকে ধরছিলি তোরা।' উত্তরে একজন, 'হ।' প্রথমজন আবার জানতে চান, 'বের করছস।' দ্বিতীয়জন জানতে চান, 'হল থেকে নাকি স্বীকারোক্তি।' এরপর উত্তরে আরেকজন বলে, 'মরে যাচ্ছে।' অন্যজন বলে, 'মাইর বেশি হয়ে গেছে।' উত্তরে আরেকজন বলে, 'ওহ! বাট ওরে লিগ্যালি বের করা যায়।'

একই মেসেঞ্জার গ্রুপের অপর একটি স্ট্ক্রিনশটে আবরারকে ধরে আনার আগের একটি কথোপকথন উঠে আসে। মনির লিখেছে, 'নিচে নাম সবাই।' 'ওকে' ভাই বলে পরপর দু'জন পোস্ট করে। আবরারকে যখন নির্যাতন করা হয়, তখন একই গ্রুপে একজন জানতে চান, 'আবরার কি হলে আছে?' আবু নওশাদ সাকিব ও শামসুল নামে দু'জন বলে, 'হ ভাই। ২০১১-তে আছে।'

এদিকে, আবরারকে নির্যাতনের প্রস্তুতি ও নির্যাতনের পরের ঘটনার বিবরণ দেন প্রত্যক্ষদর্শী বুয়েটছাত্র আশিকুল ইসলাম বিটু। বিটু বলেন, জেমি আর তানিমকে ফোন দেয় মনির। বলে, আবরারকে ডেকে ২০১১ নম্বর রুমে আনতে। পরে দু'জন আবরারের ফোন ও ল্যাপটপ চেক করতে দেখি। কোথায় আবরার লাইক দেয় বা কমেন্ট করে অথবা কাদের সঙ্গে মেসেঞ্জারে কথা বলে, এগুলো নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছিল। এরপরে আমি রুম থেকে বের হয়ে যাই। পরে ১২টা ৩০ মিনিটের দিকে আমি আবার রুমে আসি আমার ল্যাপটপ ও বই নিতে। আমি রুমের ভেতরে ঢুকে দেখলাম যে আবরার একদম মাটিতে লুটিয়ে পড়ে আছে। সেখানে আবরারের ব্যাচেরও সাত-আটজন ছিল। পরে রুম থেকে বের হয়ে সকালকে প্রশ্ন করি, এ অবস্থা কীভাবে হলো? তখন মনির উত্তর দিল, 'অনিক ভাই মাতাল অবস্থায় একটু বেশি মারছে।' তখন ওখানে থাকা আমার জন্য ভালো হবে না ভেবে আমি ওখান থেকে ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে আসি। বিটু আরও বলেন, এমন মারধরের ঘটনা অনেক সময়ই হলে হয়। ওকে মেডিকেলে নিয়ে গেলে হয়তো বাঁচানো যেত।

একজনের স্বীকারোক্তি :আবরার হত্যাকারীদের মধ্যে গতকাল ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন ইফতি মোশাররফ সকাল। বুয়েটের বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র সকাল বুয়েট ছাত্রলীগের উপসমাজসেবা সম্পাদক ছিলেন। রিমান্ডে থাকা সকাল জবানবন্দি দিতে রাজি হয়েছেন জানিয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে তাকে ঢাকার হাকিম আদালতে নিয়ে যায় পুলিশ। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত তিনি মহানগর হাকিম সাদবির ইয়াসির আহসান চৌধুরীর আদালতে জবানবন্দি দেন। জবানবন্দি শেষে তাকে কারাগারে পাঠিয়ে দেন বিচারক।

এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা লালবাগ জোনাল গোয়েন্দা বিভাগের পরিদর্শক মো. ওয়াহিদুজ্জামান সকালের জবানবন্দি রেকর্ড আবেদন করেন। আবেদনে বলা হয়, ওই আসামি ৬ অক্টোবর রাত ৮টা ৫ মিনিটে বাদীর ছেলে আবরারকে বুয়েট শেরেবাংলা হলের ১০১১ নম্বর কক্ষ থেকে হত্যার উদ্দেশ্যে ডেকে নিয়ে আনুমানিক রাত আড়াইটা পর্যন্ত ২০১১ ও ২০০৫ নম্বর কক্ষে নিয়ে মামলার এজাহার নামীয় ও অন্য আসামিরা পূর্ব পরিকল্পিতভাবে স্টাম্প এবং লাঠিসোটা দিয়ে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় প্রচণ্ড মারধর করে। এতে ঘটনাস্থলেই আবরার মারা যান। মৃত্যু নিশ্চিত করে আসামিরা ওই ভবনের দ্বিতীয় তলার সিঁড়িতে তার মরদেহ ফেলে রাখে।

রুমমেট মিজানের ভূমিকা :শেরেবাংলা হলের ১০১১ নম্বর কক্ষে আবরার ছাড়াও অন্তিম, রাফি ও মিজানুর রহমান মিজান থাকতেন। এর মধ্যে রোববার রাতে আবরারকে ডেকে নেওয়ার সময়ে তার সঙ্গে রুমে ছিলেন অন্তিম। রাফি ও মিজান বাইরে ছিলেন। তবে গতকাল বৃহস্পতিবার ডিবি পুলিশ আবরার হত্যা মামলায় মিজানকে গ্রেফতার করেছে।

আবরার হত্যাকাণ্ডে মিজানের সম্পৃক্ততার বিষয়ে জানতে চাইলে ডিবির যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম সমকালকে বলেন, এজাহারভুক্ত আসামিদের গ্রেফতারের বাইরেও তারা সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্নেষণ ও প্রযুক্তিগত তদন্ত করছেন। ওই হত্যাকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অনেকেরই ভূমিকা রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই মিজানকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

ডিবি ও শেরেবাংলা হল সূত্র জানায়, গতকাল দুপুরের দিকে ডিবির লালবাগ জোনের এডিসি খন্দকার রবিউল আরাফাতের নেতৃত্বে ডিবির একটি দল হলে অভিযান চালায়। ওই সময়ে ১০১১ নম্বর রুমেই ছিলেন মিজান। সেখান থেকেই তাকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়।

ডিবি সূত্র জানায়, গ্রেফতার মিজানই ছাত্রলীগ নেতাদের কাছে আবরারের বিষয়ে অভিযোগ দিয়েছিলেন। তিনিই জানিয়েছিলেন, 'তার রুমমেট আবরার শিবির করে, সে বিভিন্ন সময়ে ফেসবুকে সরকারবিরোধী নানা স্ট্যাটাস দেয়।' এরপরই ছাত্রলীগের একটি গ্রুপ আবরারকে ধরে নিয়ে যায়।

ওই সূত্রটি জানায়, এর আগেও বিভিন্ন সময়ে মিজান ছাত্রলীগের নেতাদের কাছে রুমমেট আবরারের বিষয়ে অভিযোগ করেছিলেন। আবরার হত্যাকাণ্ডের পেছনে তার অভিযোগও বড় ভূমিকা রেখেছে। ঘটনার রাতেও ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে তার মোবাইল ফোনে কথোপকথনের তথ্য মিলেছে।

তদন্ত অগ্রগতি জানিয়ে ডিএমপির সংবাদ সম্মেলন :এদিকে, আবরার হত্যার তদন্তের অগ্রগতিসহ সার্বিক বিষয় জানিয়ে গতকাল দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। সেখানে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (সিটিটিসি) মনিরুল ইসলাম বলেন, আবরার নৃশংসভাবে খুন হওয়ার তথ্য পেয়েই পুলিশ তৎপর হয়। এজাহার দায়েরের আগেই পুলিশ কাজ শুরু করায় ১০ জনকে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়। পুলিশের এই তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। এজাহার দায়েরের পর আরও ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

মনিরুল বলেন, আসামিদের কার কী পদবি, কে কোন দলে- তা দেখার সুযোগ নেই। নৃশংসতম এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবাইকে গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করা হবে। এ জন্য শতভাগ পেশাদারিত্ব নিয়ে ডিবি কাজ করছে। এর আগেও ক্যাম্পাসে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু আবরার হত্যায় জড়িতদের এত দ্রুত গ্রেফতার পুলিশের পেশাদারি ও নিষ্ঠার কারণেই সম্ভব হয়েছে।

তিনি বলেন, রিমান্ডে থাকা আসামিরা ঘটনার কথা স্বীকার করেছেন। তারা আদালতেও স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে চান। কিন্তু তদন্তকারীরা পুরো ঘটনা উদ্‌ঘাটনে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রেখেছে। যাতে জড়িত কেউ পার পেয়ে না যায়, সেভাবে তদন্ত চলছে।

হত্যাকাণ্ডে মোট কতজন জড়িত এবং হত্যার মোটিভ সম্পর্কে জানতে চাইলে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, এটি তারা এখনও নিশ্চিত হতে পারেননি। মোটিভ অনুসন্ধানই তদন্তের মূল বিষয়। প্রাথমিকভাবে যে তথ্য পাওয়া গেছে, পরবর্তী তদন্তে যদি তা না মেলে, তাই এখনই মোটিভ সম্পর্কে বলা উচিত হবে না। তবে ফেসবুকের স্ট্যাটাস এবং শিবিরকর্মী সন্দেহের যে বিষয়টি এসেছে, তা তদন্ত সংস্থার মাথায় রয়েছে।

হত্যার উদ্দেশ্যেই তাকে আনা হয়েছিল কি-না, সে সম্পর্কে মনিরুল বলেন, এ ব্যাপারে তারা এখনও নিশ্চিত হতে পারেননি। পুলিশ আগেই উপস্থিত হয়েছিল- এমন একটি বিতর্কের বিষয়ে ডিএমপির এই কর্মকর্তা বলেন, এখানে কাউকে গুরুতর আহত করা হয়েছিল, এ তথ্য পুলিশের কাছে ছিল না। খবর পেয়ে টহল টিম সেখানে গিয়েছিল, কিন্তু তাদের বলা হয়েছে কিছু ঘটেনি। তা ছাড়া গোলমালের যখন কোনো লক্ষণ পাওয়া যায়নি, এ জন্য পুলিশ চলে এসেছে। তা ছাড়া রেওয়াজ হচ্ছে, প্রভোস্টকে সঙ্গে নিয়ে পুলিশকে হলে ঢুকতে হয়। অবশ্য তিনি বলেন, 'আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি, আমরা জানতে পারলে হয়তো এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটত না।'

বিষয় : বুয়েট ছাত্রলীগের মেসেঞ্জার গ্রুপে নির্যাতনের ছক

মন্তব্য করুন