রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে পাঠানো নিয়ে ধোঁয়াশা

 আন্তর্জাতিক মহলের সম্মতি মিলছে না: ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী

প্রকাশ: ০৩ নভেম্বর ২০১৯     আপডেট: ০৩ নভেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

জাহিদুর রহমান, ঢাকা ও আব্দুর রহমান, টেকনাফ

ভাসানচর -ফাইল ছবি

নোয়াখালীর ভাসানচরে যেতে রাজি হয়েছে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া কিছু রোহিঙ্গা পরিবার। কক্সবাজারের ঘিঞ্জি শিবিরের চাপ কমাতে সরকার এক লাখ রোহিঙ্গাকে নোয়াখালীর ভাসানচর দ্বীপে নতুন আবাসস্থলে স্থানান্তরের চেষ্টা করে আসছে। অনেক দিন ধরেই এ চেষ্টা চলছিল, তবে তা সফল হচ্ছিল না রোহিঙ্গাদের অনিচ্ছা ও কিছু এনজিওর বাধার কারণে।

অনেক রোহিঙ্গা উন্নত জীবনের আশায় ভাসানচরে যেতে চায়। আবার কেউ কেউ যাওয়ার আগে তাদের একটি প্রতিনিধি দল পাঠাতে চায়। অন্যদিকে ভাসানচরে যেতে আগ্রহী রোহিঙ্গাদের মাঝে ভাসানচরকে 'মরার চর' বলে অভিহিত করে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে ক্যাম্পের একটি চক্র। এতে ভাসানচরে যেতে ইচ্ছুক রোহিঙ্গারাও মত বদলে ফেলছে।

এদিকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান বলেছেন, রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্মতি মিলছে না। বিবিসিকে তিনি বলেন, কিছু পরিবার স্বেচ্ছায় যেতে চেয়েছিল। সে ব্যাপারে সরকার প্রস্তুতি নিয়েছিল। তবে সরকার এই মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে জাতিসংঘ এবং ইউএনএইচসিআরসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার ওপর নির্ভরশীল। জাতিসংঘ, ইউএনএইচসিআর এবং আইওএমসহ অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠকের পরও এখন পর্যন্ত সেখানে যাওয়ার পক্ষে মতামত দেয়নি। এ কারণে এটা আটকে আছে।

তবে স্বেচ্ছায় ভাসানচরে যেতে রাজি পাঁচ শতাধিক রোহিঙ্গা পরিবারের তালিকা হাতে পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন বাংলাদেশ শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কার্যালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা। শরণার্থী শিবিরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্যাম্পের মাঝি (নেতা) ও রোহিঙ্গাদের সঙ্গে প্রতিদিন ভাসানচরের বিষয়ে কথাবার্তা হচ্ছে। সেখানকার পরিস্থিতি ভিডিওর মাধ্যমে তাদের কাছে তুলে ধরা হচ্ছে। অনেকেই সেখানে যেতে আগ্রহী। ভাসানচরে যেতে রাজি রোহিঙ্গার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মাহাবুব আলম তালুকদার বলেন, বাংলাদেশের জন্য এটা অত্যন্ত ভালো দিক, অবশেষে স্বেচ্ছায় রোহিঙ্গারা ভাসানচরে যেতে রাজি হয়েছে। কাউকে সেখানে জোর করে পাঠানো হবে না। যারা যেতে ইচ্ছুক, তাদের তালিকা নেওয়া হচ্ছে। তালিকা এখনও চলমান রয়েছে।

সপরিবারে, স্বেচ্ছায় ভাসানচরে যেতে রাজি হয়েছেন টেকনাফ ক্যাম্পের মাঝি নূর হোসেন। তিনি বলেন, ক্যাম্প ইনচার্জ ভাসানচরে তৈরি করা ঘরবাড়িগুলোর ভিডিও মোবাইল ফোনে দেখিয়েছেন, সেগুলো দেখে ভালো মনে হয়েছে। অন্তত এখানকার ঘরগুলোর চেয়ে অনেক ভালো হবে। তাই স্বেচ্ছায় সেখানে চলে যেতে রাজি হয়েছি।

রোকেয়া বেগম নামে এক রোহিঙ্গা নারী বলেন, মিয়ানমারে স্বামীকে হারিয়ে এখানে চলে এসেছি। ছেলেমেয়ে বড় হচ্ছে, তাদের জন্য খুব চিন্তা করি। এখানে প্রায়ই খুনখারাবি হয়। ক্যাম্পগুলো পাহাড়ের পাদদেশে হওয়ায় ডাকাতরা ধরে নিয়ে মুক্তিপণ চায়, না দিলে মেরে ফেলে। এমনকি ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে মারধর করে লুট করে নিয়ে যায় সহায় সম্বলটুকু। রাত এলে মেয়েদের চিন্তায় ঘুম আসে না। এই ক্যাম্পে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। তাই ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের নিয়ে যাওয়ার খবর শুনে সর্বপ্রথম আমার নাম লিখতে বলেছিলাম। অন্তত সেখানে সন্তানরা নিরাপদ থাকবে।

লেদা শরণার্থী শিবিরের মরিয়াম খাতুন ভাসানচরে যেতে নাম নিবন্ধন করেছেন। তিনি বলেন, আমাদের জীবন তো শেষ, এখন ছেলেমেয়েদের কথা ভাবতে হবে। অন্তত ওদের জীবনে যাতে কষ্ট না আসে, সেজন্য চলে যাচ্ছি। যে কষ্ট আমরা পেয়েছি, সেই কষ্ট যেন সন্তানদের জীবনে না আসে।

উন্নত জীবনের আশায় কয়েকদিন আগেও ভাসানচরে যেতে পুরোপুরি প্রস্তুত ছিলেন লেদা ক্যাম্পের আনোয়ারা বেগম। কিন্তু এখন তিনি সেই মত বদলে ফেলে বলেন, 'ভাসানচর মারারচর, হেরে যাইলে মরি যাইবাগই (ভাসানচর মৃত্যুরচর। সেখানে গেলে মারা যাবই)।' তিনি বলেন, ভাসানচরে গেলে আত্মীয়স্বজন আসতে পারবে না। সেখানে ভালো খাবারও মিলবে না। এ ছাড়া শিবিরে ত্রাণসহ অন্য কার্ড রয়েছে, সেগুলো নিয়ে নেবে। এসব কথাবার্তা শিবিরের লোকজনের কাছে শুনে এখন ভাসানচরে যেতে ভয় পাচ্ছেন। ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের নিয়ে যাওয়ার পেছনে চীন ও মিয়ানমারের ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে শিবিরে প্রচার রয়েছে। ফলে ভাসানচরে যাওয়ার বিষয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন।

শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের প্রতিনিধি ও টেকনাফ নিবন্ধিত নয়াপাড়া ও লেদা রোহিঙ্গা শিবিরের কর্মকর্তা আবদুল হান্নান বলেন, রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে নিয়ে যেতে সরকার আগে থেকেই কাজ করছিল। কেউ স্বেচ্ছায় রাজি না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে এগোনো যায়নি। যেহেতু এবার রোহিঙ্গারা নিজে থেকেই সেখানে যেতে ইচ্ছা প্রকাশ করছে, তাই গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি নিয়ে তারা কাজ করছেন।

র‌্যাব-১৫, সিপিসি-১-এর টেকনাফ ক্যাম্প ইনচার্জ লেফটেন্যান্ট মির্জা শাহেদ মাহতাব বলেন, যেসব রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভাসানচরের বিষয়ে গুজব চালানো হচ্ছে, সেখানে র‌্যাবের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। যারা এসব কাজে জড়িত, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।

এ বিষয়ে কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, এক লাখ মানুষের জন্য ভাসানচর পুরোপুরি প্রস্তুত। ইতোমধ্যে স্বেচ্ছায় ভাসানচরে যেতে কিছু রোহিঙ্গা পরিবার রাজি হয়েছে। তবে কবে নাগাদ স্থানান্তর করা হবে তা না বললেও ভাসানচরে নিয়ে যেতে যেসব লজিস্টিক সমর্থন প্রয়োজন, তা সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে বলে জানান তিনি।

২০১৫ সালে প্রথম ভাসানচরে শরণার্থীদের বসবাসের জন্য আবাসন গড়ার পরিকল্পনা করা হয়। সে সময় চরটিতে কোনো জনবসতি ছিল না। কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের চাপ কমাতে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে উন্নত সুবিধাসহ নোয়াখালীর ভাসানচরে ৪৫০ একর জমির ওপর শিবির নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে নৌবাহিনী।