অভিবাসন নীতির বেড়াজাল

একটু সহানুভূতি আদিয়ান কি পেতে পারে না

প্রকাশ: ০৪ নভেম্বর ২০১৯     আপডেট: ০৪ নভেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সমকাল ডেস্ক

অস্ট্রেলিয়ায় মা-বাবার সঙ্গে ছোট্ট আদিয়ান-দ্য গার্ডিয়ান

আর পাঁচটা ছোট্ট শিশুর মতোই আদিয়ানের মায়াবী চোখ, মুখভরা হাসি। তার দিকে চোখ রাখলেই যে কারও মন জুড়িয়ে যায়। তবে এসব কিছুর আড়ালে পাঁচ বছরের শিশুটির রয়েছে 'কিছুটা প্রতিবন্ধিতা'। আর সেই অজুহাতে মা-বাবার সঙ্গে তাকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিতে চাইছে অস্ট্রেলীয় সরকার। গতকাল রোববার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, অস্ট্রেলিয়ার কঠোর অভিবাসন নীতির বেড়াজালে আটকা পড়তে যাচ্ছে আদিয়ানের পরিবার।

অস্ট্রেলিয়া সরকারের অভিবাসন নীতিতে রয়েছে 'পরিবারের একজন অকৃতকার্য মানে সবাই অকৃতকার্য'। আদিয়ানের প্রতিবন্ধিতার কারণে তাই পুরো পরিবারটি দেশটিতে থাকার যোগ্যতা হারাতে চলেছে। শিশুটির প্রতিবন্ধিতা অস্ট্রেলিয়ার চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াতে পারে উল্লেখ করে পরিবারটির স্থায়ী ভিসার আবেদন এরই মধ্যে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ড. মেহেদী হাসান ও রেবেকা সুলতানা দম্পতির ছেলে আদিয়ান। মেহেদী হাসান শিক্ষার্থী ভিসায় ২০১১ সালে অস্ট্রেলিয়া যান। পরের বছর বাংলাদেশে এসে রেবেকাকে বিয়ে করেন। রেবেকাও তার সঙ্গে ২০১৩ সালে অস্ট্রেলিয়া যান। একই বছরের শেষ দিকে সেখানে জন্ম হয় আদিয়ানের। মা-বাবা খেয়াল করেন, জন্মের কয়েক মাস পার হলেও তাদের সন্তান নিজে থেকে মাথা তুলতে পারছে না। পরে স্বাস্থ্য পরীক্ষায় দেখা যায়, তার মস্তিস্কে হালকা পক্ষাঘাত আছে। চিকিৎসকদের ধারণা, জন্মের আগে কিংবা পরে স্ট্রোক থেকে তার এ সমস্যা হতে পারে।

আদিয়ানের বাবা মেহেদী হাসান বাংলাদেশ থেকে ডিগ্রি নেন। মাস্টার্স করেন দক্ষিণ কোরিয়ায়। ২০১৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার ডেয়াকিন ইউনিভার্সিটি থেকে প্রকৌশলবিদ্যায় পিএইচডি করেন। এরপর ভিক্টোরিয়া রাজ্য সরকার মেহেদী হাসানের স্থায়ী দক্ষ অভিবাসী ভিসার আবেদন মনোনয়ন দেয়। আদিয়ানের মা রেবেকা সুলতানা বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় চিকিৎসক হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তবে আদিয়ানকে কেন্দ্র করেই মেহেদী হাসানের ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়। পরিবারটি ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যানের বিরুদ্ধে পরে প্রশাসনিক আপিল ট্রাইব্যুনালে আবেদন করে। আড়াই বছর পর ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত বহাল রাখেন ট্রাইব্যুনাল। চলতি বছর আদিয়ানের স্বাস্থ্য পরীক্ষায় বলা হয়, তার কিছুটা শারীরিক অক্ষমতা রয়েছে, যা স্থায়ী হতে পারে। এর জন্য তার কমিউনিটি সেবা প্রয়োজন হতে পারে। স্কুলেও অতিরিক্ত সহায়তা লাগতে পারে।

ড. মেহেদী হাসান বলেন, বাঁ পাশে কিছুটা দুর্বলতা থাকায় কেন একটি শিশুর বিশেষ শিক্ষার প্রয়োজন হবে- বিষয়টি বুঝতে পারছি না। তিনি বলেন, বিশেষ শিক্ষা তাদের জন্যই দরকার, যারা মূলধারার স্কুলে যেতে সক্ষম নয়।

আদিয়ানের আরেকটি স্বাস্থ্য পরীক্ষার প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ছোট্ট এই শিশুটি নিজে নিজে চলাচল করতে পারে। কথাবার্তাও ভালো বলে। ফুটবল খেলা তার পছন্দ। প্রতিবন্ধিতার ক্ষেত্রেও বেশ কিছু উন্নতি করেছে সে। শুধু উঁচু-নিচু পথ চলার জন্য তার অন্যের সহায়তা লাগে। তাকে আগেভাগে স্কুলে পাঠানো এবং অস্ট্রেলিয়া কিংবা বাংলাদেশে নিয়মিত থেরাপি দেওয়ার সুপারিশ করেছেন চিকিৎসকরা।

আদিয়ানের বাবা আরও জানান, প্রতিদিন স্কুলে যাচ্ছে তার ছেলে। সবকিছু শিখছে। বাসায় শিশুদের ভিডিও দেখছে। পাশাপাশি তাকে থেরাপিও দেওয়া হচ্ছে। আদিয়ান এখন অনেক ভালো। দিন দিন ভালো হয়ে উঠছে। সে এখন বিভিন্ন জিনিস ধরতে পারে বলেও জানান তিনি।

আদিয়ানের পরিবার অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসের শেষ সুযোগ হিসেবে দেশটির অভিবাসনমন্ত্রী ডেভিড কোলম্যানের কাছে আবেদন জানিয়েছে। ভিসা মঞ্জুর এবং প্রত্যাখ্যানের ক্ষমতা তার রয়েছে। মন্ত্রীর কাছে আবেদনের ফলাফল জানার অপেক্ষায় রয়েছে পরিবারটি। এর আগে প্রায় একই পরিস্থিতির শিকার একাধিক পরিবারের ভিসা অনুমোদন দিয়েছিলেন দেশটির অভিবাসনবিষয়ক মন্ত্রী।

বর্তমানে 'ব্রিজিং ভিসা ই'-এর আওতায় দেশটিতে বাস করছে আদিয়ানের পরিবার। এ ধরনের ভিসার মেয়াদ মাত্র তিন মাস। এ প্রসঙ্গে মেহেদী হাসান বলেন, অনেক কঠিন সময় পার করছি। প্রতি তিন মাস পর ভিসার মেয়াদ বাড়াতে হচ্ছে। তিনি জানান, অন্য দেশে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত নন তিনি। তবে অস্ট্রেলিয়ায় থাকতে চান। এখানেই আদিয়ানকে লেখাপড়া করাতে চান।