প্রশান্ত যেন টাকার সাগর

হাজার কোটি টাকা লোপাটের প্রমাণ পেয়েছে দুদক

প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

হকিকত জাহান হকি

এক প্রশান্তের টাকায়ই যেন মহাসাগর ভরে যাবে। প্রশান্ত মহাসাগর হয়ে যাবে টাকার সাগর। অদৃশ্য এক শক্তির আশ্রয়-প্রশ্রয়ে একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থেকে নানা কৌশলে লুটপাট করে এই টাকার সাগর বানিয়েছেন তিনি। প্রতিষ্ঠিত এক বিজনেস ম্যাগনেটের আশীর্বাদও ছিল তার মাথায়। এই সুযোগে একাই রিলায়েন্স ফাইন্যান্সসহ একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে তিন হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়েছেন এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংক ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্স লিমিটেডের সাবেক এমডি প্রশান্ত কুমার হালদার।


দুদকের বেআইনি ক্যাসিনো ও মেগা দুর্নীতিবিরোধী টিম প্রশান্ত কুমারের লাগামহীন দুর্নীতির তথ্যপ্রমাণ নিয়ে কাজ শুরু করেছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে থেকে ঢালাওভাবে অর্থ লুটের অভিযোগের পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে পরোক্ষভাবে ক্যাসিনো বা বিভিন্ন জুয়াড়ি গ্রুপের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে। দুদকের অনুরোধে গত ২৩ অক্টোবর প্রশান্ত কুমারের বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞার পর তিনি প্রভাবশালী এক ব্যক্তির সহায়তায় কৌশলে দেশত্যাগের চেষ্টাও করছেন। প্রশান্তের বিরুদ্ধে অভিযোগটি অনুসন্ধান করছেন দুদকের ক্যাসিনোবিরোধী টিমের সদস্য ও উপপরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান।

এরই মধ্যে দুদকে প্রশান্ত কুমারের বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ জমা পড়েছে। অভিযোগটির প্রাথমিক অনুসন্ধানে একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে তার অর্থ লোপাটের যথেষ্ট তথ্যপ্রমাণ মিলেছে।

দুদক সূত্র জানাচ্ছে, এমডির দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ব্যাংক-বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতের মাফিয়া ডন হয়ে উঠেছিলেন প্রশান্ত। তিনি পরোক্ষভাবে পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসে নানা কাজের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সেখানে লুটপাটের স্বর্গরাজ্য কায়েম করেছিলেন। ২০১৫ থেকে চলতি বছরের প্রথম দিকের মধ্যে তিনি প্রভাব খাটিয়ে পিপলস লিজিংসহ একাধিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে তিন হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন।

দুর্নীতির টাকায় প্রশান্ত বাড়ি, গাড়ি, ফ্ল্যাট, প্লট ছাড়াও বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার কিনেছেন, ব্যাংকে এফডিআরসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করেছেন। তার বিরুদ্ধে অর্থ পাচারেরও অভিযোগ উঠেছে। এক প্রশান্তের নামেই তিন হাজার কোটি টাকার সম্পদ- বিষয়টি রীতিমতো বিস্ময়কর অনুসন্ধানকারীদের কাছে। পিপলস লিজিংয়ের আমানতকারীদের কাছ থেকে অর্থ উত্তোলন, স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বিক্রি, কোম্পানির পোর্টফোলিও থেকে গ্রাহকদের মার্জিন লোনের বিপরীতে শেয়ার বিক্রি ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহের নামে এ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়।

এ ব্যাপারে তথ্য জানতে পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের বর্তমান এমডির কাছে চিঠি পাঠিয়েছে দুদক। আগামী ১৩ নভেম্বরের মধ্যে ঢাকায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে এসব তথ্য জমা দিতে বলা হয়েছে। অর্থ আত্মসাৎ বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য আগামী ১৪ নভেম্বর সকাল সাড়ে ৯টায় প্রশান্ত কুমার হালদারকে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে তলব করা হয়েছে।

পিপলস লিজিংয়ের এমডির কাছে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ সদস্যদের নাম ও বিস্তারিত তথ্যাদি, ২০১৫ থেকে ২০১৯ পর্যন্ত আমানতকারীদের কাছ থেকে উত্তোলন করা অর্থের পরিমাণ, বিনিয়োগ করা টাকার পরিমাণ, প্রতিষ্ঠানের কাছে বর্তমানে জমা টাকা, প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকে অ্যাকাউন্টের স্টেটমেন্টসহ যাবতীয় তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া ২০১৫ থেকে চলতি বছর পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের কত টাকার স্থাবর সম্পদ এবং কোম্পানির শেয়ার পোর্টফোলিও থেকে গ্রাহকদের মার্জিন লোনের বিপরীতে কত টাকার শেয়ার বিক্রি করা হয়েছে, এই অর্থ দিয়ে কী করা হয়েছে বা কোথায় বিনিয়োগ করা হয়েছে, অ্যাকাউন্ট স্টেটমেন্টসহ প্রয়োজনীয় তথ্য/রেকর্ডপত্রাদিও চাওয়া হয়েছে। গ্রাহক ছাড়া আর কোন কোন প্রতিষ্ঠানের কত টাকা আমানত হিসেবে নেওয়া হয়েছিল বা কত টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে, তার বিস্তারিত তথ্যাদি, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসের কাছ থেকে কত টাকা আমানত হিসেবে নেওয়া হয়েছিল, পরে কত টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে- সেসব তথ্যও দিতে বলা হয়েছে।

প্রশান্তের দুর্নীতি অনুসন্ধানে তথ্য চেয়ে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা গুলশান আনোয়ার ব্যাংক এশিয়া, ডাচ্‌-বাংলাসহ আটটি ব্যাংকে আলাদা আলাদ চিঠি পাঠিয়েছেন।

রিলায়েন্স ফাইন্যান্সের সাবেক এমডি প্রশান্ত কুমার হালদার এই প্রতিষ্ঠানের এমডি থাকার সময় তার আত্মীয়স্বজনকে আরও বেশ কয়েকটি লিজিং কোম্পানিতে ইনডিপেন্ডেন্ট পরিচালক নিযুক্ত করেছিলেন। পিপলস লিজিংয়ে আমানতকারীদের তিন হাজার কোটি টাকা নানা কৌশলে আত্মসাৎ করে কোম্পানিটিকে অচল করে দেওয়া হয়েছে।