সর্বত্র বুলবুলের ক্ষতচিহ্ন

১৫ জনের প্রাণহানি উপড়ে গেছে গাছ বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি

প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০১৯     আপডেট: ১২ নভেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সমকাল প্রতিবেদক

ফাইল ছবি

দেশের উপকূলীয় এলাকার প্রায় সর্বত্রই ক্ষতের ছাপ রেখে গেছে ঘূর্ণিঝড় বুলবুল। ঝড়ে গাছপালা, ঘরবাড়িসহ অন্যান্য স্থাপনার ব্যাপক ক্ষতি হলেও প্রাণহানি হয়েছে কম। পূর্ব সচেতনতার পাশাপাশি আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষ ঠাঁই নেওয়ায় ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব হয়েছে। মহাবিপর্যয় ঠেকাতে বরাবরের মতো সুন্দরবন বড় ভূমিকা রেখেছে এবারও। জনপদকে বাঁচাতে গিয়ে ম্যানগ্রোভ এই বনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের সময় বিভিন্ন স্থানে গাছ ও ঘরচাপা পড়ে এবং পানিতে ডুবে নারী-শিশুসহ ১৪ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এর বাইরে একজন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।

ঝড়ো হাওয়া ও টানা বৃষ্টিপাতে উপকূলীয় অনেক এলাকা এখনও পানিবন্দি হয়ে আছে। উপড়ে গেছে বহুসংখ্যক গাছ; ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাজার হাজার ঘরবাড়ি, সড়ক ও লাখ লাখ হেক্টর জমির ফসল, ভেসে গেছে মাছের বহু ঘের। বৈদ্যুতিক খুঁটি উপড়ে পড়ায় অসংখ্য মানুষ অন্ধকারে রয়েছেন। বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেছেন, ঝড় আঘাত হানার পর থেকে উপকূলীয় ৯টি জেলার অন্তত ২৫ লাখ গ্রাহকের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি গাছ পড়ে থাকায় ব্যাহত হচ্ছে ত্রাণ তৎপরতা।

এদিকে সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব গতকাল সোমবার পর্যন্ত সরকারি সংস্থাগুলো জানাতে না পারলেও তারা বলছে, সরকারের তরফ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি থাকায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেকটাই কম হয়েছে। তবে অনেক এলাকার লোকজন অভিযোগ করেছেন, দুর্যোগ-পরবর্তী তারা পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রীসহ অন্যান্য সহায়তা এখনও পাচ্ছেন না। ঝড়ের আগে স্থানীয় প্রশাসনের উদ্যোগে উপকূলীয় ২১ লাখ বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ায় প্রাণহানি হয়েছে অনেক কম।

খুলনা, শরীয়তপুর, বরগুনা, পিরোজপুর ও গোপালগঞ্জে দু'জন করে এবং পটুয়াখালী, ভোলা, মাদারীপুর, বরিশাল ও বাগেরহাটে একজন করে মারা গেছেন। বিভিন্ন এলাকায় আহত হয়েছেন ১৫ জন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম এবং সংশ্নিষ্ট এলাকার জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা (ইউএনও) এসব তথ্য জানিয়েছেন।

ঘূর্ণিঝড়ের সময় পটুয়াখালী ও বাগেরহাটে আশ্রয়কেন্দ্রে দুই শিশুর জন্ম হয়। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের রাতে জন্ম নেওয়ায় নাম রাখা হয় বুলবুলি।

ঝড়ে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জেলাগুলোতে চার থেকে পাঁচ হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান। অন্যদিকে, ফসলের ক্ষয়ক্ষতির সামগ্রিক তথ্য গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত জানাতে পারেনি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।

আবহাওয়া অফিস জানায়, গত শনিবার রাত ৯টায় ঘণ্টায় ১১৫ থেকে ১২৫ কিলোমিটার বেগের বাতাসের শক্তি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সাগরদ্বীপ উপকূলে আঘাত হানে বুলবুল। সুন্দরবনের বাধায় এর গতি ও শক্তি কমতে থাকে। ভোর ৫টায় সুন্দরবনের খুলনা উপকূলে আঘাত হানার সময় বাতাসের গতি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৯৩ কিলোমিটার ছিল বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক শামসুদ্দিন আহমেদ জানান, সুন্দরবনের প্রতিবন্ধকতা না থাকলে বুলবুলের আঘাত জোরালো হওয়ার আশঙ্কা ছিল। বরাবরের মতো এবারও প্রবল দুর্যোগ পরিস্থিতিতে বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই ম্যানগ্রোভ বনই রক্ষাকবচ হিসেবে বড় ভূমিকা রেখেছে। অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড়টি যেভাবে ধেয়ে আসছিল, সেটি অব্যাহত থাকলে বড় দুর্যোগ সৃষ্টি হতে পারত।

শনিবার সকাল থেকে উপকূলে আঘাত হানা পর্যন্ত দেশের সমুদ্রবন্দর এবং তৎসংলগ্ন উপকূলীয় জেলাগুলোতে ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত জারি করে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা, উদ্ধার তৎপরতা এবং জরুরি ত্রাণ কার্যক্রমের লক্ষ্যে সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেয় সরকার। শেষ পর্যন্ত অতি প্রবল থেকে প্রবল রূপ ধারণ করে বুলবুল। সুন্দরবন-সংলগ্ন উপকূলে আঘাত হানার পর আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে স্থল নিম্নচাপ হিসেবে বুলবুল বাংলাদেশ উপকূল অতিক্রম করে। ফলে রোববার সকালে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কতা সংকেত জারি করা হয়। পরে পরিস্থিতি আরও স্বাভাবিক হয়ে যায়।

প্রাণহানি ১৫, জেলায় জেলায় ক্ষতচিহ্ন: বুলবুলের তাণ্ডবে বিভিন্ন জেলায় প্রাণ হারান ১৫ জন। এ ছাড়া ঝড়ে উপড়ে গেছে বহু গাছ, বিধ্বস্ত হয়েছে ঘরবাড়ি, ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের ক্ষেত, লাখ লাখ গ্রাহক বিদ্যুৎহীন রয়েছে, ভেসে গেছে মাছের ঘের এবং পানিবন্দি হয়ে আছে অনেক এলাকা। এতে মানুষের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে।

বিস্তারিত ব্যুরো, নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরে-
বরিশাল ও বানারীপাড়া
: উজিরপুর পৌর শহরের ১ নম্বর ওয়ার্ডের মাদারশী এলাকায় ঘরের ওপর গাছ পড়ে আশালতা মজুমদার (৬৫) নামে এক নারী মারা যান। তিনি ওই এলাকার দিজেন্দ্রনাথ মজুমদারের স্ত্রী। এছাড়া রেকর্ডভাঙা বৃষ্টিতে নগরীর কমপক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। জেলা প্রশাসনের ক্ষয়ক্ষতির তালিকা অনুযায়ী, জেলার ১০ উপজেলায় ৩ হাজার ৫০টি কাঁচাবাড়ি, ১ লাখ হেক্টর জমির আমন ধান, ৬ হাজার হেক্টর রবিশস্য, ১ লাখ গাছপালা, ১২০ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক এবং ২২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গতকাল দুপুর নাগাদ নগরীর সড়কগুলো থেকে পানি সরে গেলেও এখনও নিচু আবাসিক এলাকার বাসিন্দারা পানিবন্দি। জেলায় ৫০টি প্রাথমিক ও ২০টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো বিধ্বস্ত হয়েছে। ৪৩৫টি ঘের ও পুকুর ডুবে মাছ ভেসে গেছে। বরিশাল নদীবন্দর কর্মকর্তা আজমল হুদা মিঠু সরকার জানান, তিন দিন বন্ধ থাকার পর সোমবার সকাল ১০টা থেকে বরিশালের সঙ্গে সারাদেশে নৌ যোগাযোগ স্বাভাবিক হয়েছে।

শরীয়তপুর: গাছচাপায় নড়িয়া উপজেলায় ভ্যানচালক আলীবক্স ছৈয়াল (৬৮) ও ডামুড্যা উপজেলার আলেয়া বেগমের (৪৫) মৃত্যু হয়েছে। আলেয়ার স্বামী আজগরও গুরুতর আহত হয়েছেন।

খুলনা: প্রায় ২৫ হাজার হেক্টর জমির রোপা আমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভেসে গেছে দুই হাজার ৭৭২টি চিংড়ি ঘের ও পুকুরের মাছ। উপড়ে পড়েছে হাজার হাজার গাছ। গাছ পড়ে ও বৈদ্যুতিক খুঁটি উপড়ে শনিবার ভোর থেকে বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন ছিল মহানগরীসহ জেলার আটটি উপজেলা। রোববার বিকেলে ও রাতে নগরীসহ ছয়টি উপজেলায় বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপন করা হয়। সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন ছিল দাকোপ, কয়রা ও বটিয়াঘাটা উপজেলার বেশিরভাগ এলাকা। গাছ চাপা পড়ে রোববার দাকোপ ও দিঘলিয়া উপজেলায় দু'জন নিহত হয়েছেন। তারা হলেন- দক্ষিণ দাকোপ গ্রামের সুভাষ ম লের স্ত্রী প্রমীলা ম ল ও দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটী কাটানিপাড়ার আলমগীর হোসেন। এ ছাড়া সুন্দরবনে পর্যটকদের প্রবেশ বন্ধ ঘোষণা করেছে বন বিভাগ। বনের ক্ষতি নিরূপণে গতকাল কাজ শুরু হয়েছে।

গোপালগঞ্জ: ঝড়ে গাছ চাপা পড়ে নিহতরা হলেন সদর উপজেলার খাটিয়াগড় গ্রামের মৃত বাবন কাজীর স্ত্রী মাঝু বিবি (৬৭) ও কোটালীপাড়া উপজেলার বান্ধাবাড়ি গ্রামের মৃত হাসান উদ্দিন হাওলাদারের ছেলে সেকেল হাওলাদার (৭০)। এ ছাড়া ঘরবাড়ি, বিদ্যুৎ, ফসলসহ অন্যান্য জিনিসের ক্ষতি হয়েছে।

মাদারীপুর: সদর উপ?জেলার ঘটমাঝিতে ঘরে আলমারির নিচে চাপা পড়ে সালেহা বেগম (৪৫) নামে গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। রাজৈর উপজেলায় গাছ চাপা পড়ে ছয়জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া ঘরবাড়ি ও ফসলের ক্ষতি হয়েছে।

বাগেরহাট ও মোংলা: জেলায় লক্ষাধিক গাছ উপড়ে পড়েছে। প্রায় ৫০ হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভেসে গেছে সাত হাজার মাছের ঘের। কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি রয়েছে। নিহত হয়েছেন ফকিরহাট উপজেলার মাসুম শেখের স্ত্রী হীরা বেগম এবং রামপাল উপজেলার বাবুল শেখের মেয়ে সামিয়া খাতুন। সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকার বিপুল গাছ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেছে একাধিক পরিবেশবাদী সংগঠন।

মোংলায় ঝড়ে বিধ্বস্ত হওয়া বাড়িঘর মেরামতের কাজ শুরু করে দিয়েছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। এখন পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন কোনো ত্রাণ বা সরকারি সাহায্য পাননি। চিলা ইউনিয়নে দুটি রাস্তা ভেঙে পশুর নদীর সঙ্গে বিলীন হয়ে গেছে। ঝড়ে বিপর্যস্ত হওয়া বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত মেরামত করা সম্ভব হয়নি। ফলে অধিকাংশ এলাকায় তিন দিন ধরে বিদ্যুৎ সরবরাহ নেই। এ ছাড়া দু'দিন বন্ধ থাকার পর সোমবার সকাল থেকে বন্দরের কাজ পুনরায় শুরু হয়েছে।

ঝালকাঠি ও রাজাপুর: জেলায় ১১ হাজার ৫০০ হেক্টর আমন এবং তিন হাজার ৬৫০ হেক্টর রোপা ধানের ক্ষতি হয়েছে। ৪১৫ কিলোমিটার কাঁচাপাকা রাস্তা, প্রায় তিন হাজার মাছের ঘের ও পুকুর তলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ৮১৭টি ঘরবাড়ি, পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ প্রায় দুই লাখ ৩৮ হাজার ৩৮৫ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

কেশবপুর (যশোর): কেশবপুরে প্রায় ৭০ হাজার গ্রাহক দু'দিন ধরে বিদ্যুৎ বঞ্চিত রয়েছেন। অন্যদিকে উঠতি আমন ধান, শাকসবজিসহ কৃষিতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতি হয়েছে কাঁচা ঘরবাড়ি ও মৎস্য ঘেরের অবকাঠামো।

বাউফল (পটুয়াখালী): বাউফলের বিভিন্ন স্থানে গাছপালা উপড়ে গেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি, আমন ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পল্লী বিদ্যুতের প্রায় ১৩টি খুঁটি ভেঙে সঞ্চালন বন্ধ হয়ে গেছে।

চাঁদপুর: জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এবিএম জাকির হোসেন বলেন, ৪৮৩টি বসতঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন রয়েছে অনেক এলাকা। চাঁদপুর বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী এস.এম. ইকবাল বলেন, বহু গাছপালা বিদ্যুৎ লাইনের ওপর পড়েছে। এসব গাছপালা কেটে অপসারণ করা হচ্ছে। লাইনগুলো সচল হলেই বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করা হবে। চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২-এর জিএম আবু তাহের বলেন, অন্তত ২০টি খুঁটি পড়ে গেছে। রাতের (সোমবার) মধ্যেই ৯০ ভাগ সমস্যা সমাধান করা হবে। আগামীকালের মধ্যে পুরোপুরি ঠিক করা সম্ভব হবে।

পিরোজপুর, মঠবাড়িয়া, ইন্দুরকানী, কাউখালী, স্বরূপকাঠি ও নাজিরপুর: জেলার বিভিন্ন স্থানে গাছ উপড়ে পড়ে ঘরবাড়ি, বিদ্যুতের লাইন বিধ্বস্ত হয়েছে। এতে পুরো জেলা বিদ্যুৎহীন রয়েছে। পিরোজপুর বিদ্যুৎ বিভাগের আবাসিক নির্বাহী প্রকৌশলী শামছুল ইসলাম খান জানান, পিরোজপুরের ৩৩ কেভি বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের ওপর বিভিন্ন স্থানে গাছ পড়ে লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া জেলা শহরের বিভিন্ন স্থানের বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইনেও গাছ পড়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এসব লাইন সংস্কার করে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে কয়েক দিন লাগবে। মঠবাড়িয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সূত্রে জানা যায়, পৌর শহর ও ১১টি ইউনিয়নে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত ও ২৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আংশিক বিধ্বস্তসহ ৫৬৪টি কাঁচাঘর সম্পূর্ণ ও এক হাজার আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও বেসরকারিভাবে ক্ষতির পরিমাণ আরও কয়েকগুণ বেশি। জলোচ্ছ্বাসের পানিতে ডুবে দুই বছর বয়সী মমিনুলের মৃত্যু হয়েছে। গতকাল উপজেলার তুষখালী ইউনিয়নের শাখারীকাঠী গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। শিশুটির বাবার নাম মাসুম হাওলাদার। ইন্দুরকানীতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ আট শতাধিক ঘর বিধ্বস্ত এবং গাছপালা, বিদ্যুৎ লাইনের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। শিশুসহ আহত হয়েছেন অন্তত ১০ জন। কাউখালীতে প্রচুর গাছপালা পড়ে শত শত আধাপাকা ও কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। ল ভ হয়ে গেছে বিদ্যুৎ লাইন। স্বরূপকাঠিতে ব্যাপক তা বে গাছপালা পড়ে বহু ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত ও তিনজন আহত হয়েছেন। নাজিরপুরে ৯টি ইউনিয়নে প্রায় ২০০ আধাপাকা ও কাঠের বসতঘর পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়েছে এবং প্রায় ৮০০ বসতঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গাছ চাপা পড়ে ননী গোপাল ম ল নামে এক বৃদ্ধ মারা গেছেন এবং সুমী ও নাসির নামে দুই শিশু গুরুতর আহত হয়েছে। ইউএনও রোজী আকতার জানান, যে ত্রাণসামগ্রী বরাদ্দ পাওয়া গেছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

ভোলা, লালমোহন ও চরফ্যাসন: লালমোহন ও চরফ্যাসনে দুই শতাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। ঘর ও গাছচাপা পড়ে আহত হয়েছেন কমপক্ষে ২০ জন। টানা বৃষ্টির কারণে চরম দুর্ভোগে পড়েছে গৃহহীন পরিবারগুলো। মাছের ঘের, গবাদি পশু ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এদিকে মেঘনার ইলিশা এলাকায় ট্রলারডুবিতে পাঁচ জেলে নিখোঁজ হন। পরে খোরশেদ নামে এক জেলের লাশ উদ্ধার করে কোস্টগার্ড। ঝড়ের পর থেকে জেলা শহরের বাইরে সব এলাকায় বিদ্যুৎ বন্ধ রয়েছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সাত উপজেলার ৩৩টি ইউনিয়নে ২৩১টি ওয়ার্ডে আঘাত হেনেছে বুলবুল। এতে প্রায় ২২ হাজার ৫শ' মানুষ কমবেশি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। ৬৫টি ঘর সম্পূর্ণ ও ২২২টি ঘর আংশিক বিধ্বস্ত হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষে গতকাল বিকেল থেকে লালমোহনের ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে দুই বান্ডিল করে টিন, নগদ ছয় হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এদিকে ভোলা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক উপমন্ত্রী আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব ব্যক্তিগত তহবিল থেকে অর্থ সহায়তা দেন। এছাড়া স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুর্গত এলাকায় চাল ও শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়।

ঈশ্বরদী (পাবনা): পাকশী বিভাগীয় রেলের ছয়টি ট্রেনের শিডিউল এলোমেলো হয়ে পড়েছে। খুলনা অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে ভেঙে পড়া গাছপালা রেললাইনের ওপর থেকে অপসারণ করতে যে সময়ক্ষেপণ হয়েছে, সে সময়ে এসব লাইনের বিভিন্ন ট্রেনকে আউটারে দাঁড় করিয়ে রাখতে হয়েছে। এই দেরির ফলে খুলনা থেকে ঈশ্বরদী হয়ে রাজশাহীগামী আন্তঃনগর কপোতাক্ষ ও গোয়ালন্দ থেকে ঈশ্বরদী হয়ে রাজশাহীগামী টুঙ্গিপাড়া এক্সপ্রেস ট্রেন দুটি গতকালও এক ঘণ্টা করে বিলম্বে চলাচল করেছে। এছাড়া ঢাকা-ঈশ্বরদী-খুলনাগামী সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেন দুই ঘণ্টা, রাজশাহী-ঈশ্বরদী বাইপাস-ঢাকা রুটের আন্তঃনগর ধূমকেতু ও একই রুটের আন্তঃনগর চিত্রা এক্সপ্রেস ট্রেন চলাচল করছে তিন ঘণ্টা বিলম্বে। খুলনা-ঈশ্বরদী-চিলাহাটি রুটে চলাচলরত আন্তঃনগর রূপসা এক্সপ্রেস ট্রেনও দুই ঘণ্টা বিলম্বে চলাচল করছে।

সাতক্ষীরা : জেলা প্রশাসন জানায়, শ্যামনগর, আশাশুনি, কালিগঞ্জসহ জেলার সাতটি উপজেলায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জেলায় প্রায় ১৭ হাজার ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। ৩৫টি বাড়িঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অসংখ্য গাছ উপড়ে গেছে। প্রায় ছয় হাজার হেক্টর চিংড়ি ঘের ও ২২শ' হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। সহায়তার জন্য ১৭ লাখ টাকা ও ৫০০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

নোয়াখালী: ১৫ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হয়েছে। সুবর্ণচর, হাতিয়া উপজেলার বিভিন্ন স্থানে প্রায় ৪০০ কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছে।

লক্ষ্মীপুর: সদর, রায়পুর, রামগতি ও কমলনগর উপজেলার প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমির আমন ধান ও তিন হাজার হেক্টর জমির শীতকালীন সবজির ক্ষতি হয়েছে। লক্ষ্মীপুর পৌরসভায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সদরের ভবানীগঞ্জ, টুমচর, কালীরচরসহ নিম্নাঞ্চল এলাকা।

পাথরঘাটা (বরগুনা): পাথরঘাটায় সহস্রাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। গাছ ও বিদ্যুতের লাইন, রাস্তাঘাট এবং ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এ সময় ঘরের নিচে চাপা পড়ে আহত হয়েছেন ৯ জন। পাথরঘাটা পল্লী বিদ্যুতের সহকারী প্রকৌশলী হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের ১৪টি খুঁটি উপড়ে পড়ে প্রায় ৩০০ কিলোমিটার লাইনের তার ছিঁড়ে গেছে। দু'দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ চালু করতে পারবেন বলে আশা করছেন তারা।