জাবি উপাচার্যের অপসারণ দাবি

প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০১৯      

জাবি প্রতিনিধি

সমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছেন আনু মুহাম্মদ -সমকাল

দু’দিনের বিরতির পর আবারও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফারজানা ইসলামের অপসারণ দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগ ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বরোচিত হামলার ‘মদদদাতা’ দাবি করে মঙ্গলবার পটচিত্র প্রদর্শন ও সংহতি সমাবেশ করেছেন আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। 

আন্দোলনকে ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর করা হয়েছে। সকালে প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হলেও আন্দোলনকারীদের বাধারমুখে তা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এদিকে দুপুর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন প্রবেশ পথে শিক্ষার্থী ছাড়া কাউকেই প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। 

‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে জাহাঙ্গীরনগর’ ব্যানারে বিকেল চারটা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন প্রশাসনিক ভবনের সামনে স্থাপিত ‘উপাচার্য অপসারণ মঞ্চে’ সংহতি সমাবেশ শুরু হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের অপসারণ দাবি ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর বর্বরোচিত হামলার বিচার দাবি করেন অংশগ্রহণকারীরা। 

সমাবেশে বক্তারা উপাচার্যের নানা সমালোচনা করে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তারা মনে করেন আন্দোলনকারীদের আন্দোলন যৌক্তিক। এ আন্দোলনকে দেশবাসীর কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করতে জামায়েত-শিবির বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তারা। তারা দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে এ ক্ষোভ ছড়ানোর আগেই উপাচার্যকে পদত্যাগের আহ্বান জানান। 

সমাবেশে ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী বলেন, ‘শিক্ষকদের মদদে ছাত্র-শিক্ষকের ওপর যে হামলা হয়েছে, এরপর আর এই উপাচার্য পদে থাকতে পারেন না। উপাচার্য থাকবেন কি থাকবেন না, এখানে প্রধানমন্ত্রী কোনো কথা বলতে পারেন কিনা তা দেশের সংবিধানের কথায় লেখা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে যেভাবে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে তাতে আমাদের সোচ্চার থাকতে হবে।’

বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম বলেন, ‘আপনারা যে দাবি তুলেছেন সেটি ন্যায়ের দাবি, আমাদের সকলের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সমর্থন থাকবে। ১৯৫২ সাল থেকে ১৯৭১ সাল বাংলাদেশের ছাত্র সমাজের ঐতিহ্য হিমালয় তুল্য। এখন সেই ঐতিহ্য ভূলুন্ঠিত হচ্ছে। শুধু জাহাঙ্গীরনর বিশ্ববিদ্যালয়ে নয়, সারা দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সকল স্থানে দখলদারিত্ব চলছে।’ 

তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী একটি পক্ষ নিয়েছেন। উনি বলেছেন দুর্নীতির প্রমাণ দিতে হবে। তার কথা মতো ছাত্ররা যে তথ্য উপাত্ত দিয়েছে। এবার আপনি সেটি যাচাই বাছাই করুন। আর আন্দোলনকারীরা সকলে ঐক্যবদ্ধ থাকুন। এই ঐক্যই আপানাদের বিজয় নিশ্চিত করবে।’

এ সময় বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দলের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং তার প্রশাসন পরাজয় মেনে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছে। যদি তাদের দাবি যৌক্তিক ও ন্যায়ের পথে থাকতো তাহলে এমন করে ক্যাম্পাস বন্ধ করতো না।’ 

তিনি বলেন, ‘যেখানে গবেষণার জন্য বরাদ্দ মাত্র ৪ কোটি টাকা সেখানে ছাত্রলীগ দাবি করেছে ৮৬ কোটি টাকা। আগামী চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে দয়া করে পদত্যাগ করেন। সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিক। না হলে সারা দেশের ছাত্র সমাজ ফুঁসে উঠবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিয় ছাত্র সংসদের সহসভাপতি নূরুল হক নূর বলেন, ‘ছাত্রলীগ শুধু জাহাঙ্গীনগরের শিক্ষার্থীদের ওপরই হামলা চালাচ্ছে না। ছাত্রলীগের হামলা সারা দেশেই চলছে। রাষ্ট্রের কোন প্রতিষ্ঠানই স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে না। সব ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনাই তা প্রমাণ করে। যখনই কোন আন্দোলন হচ্ছে তখনই সেখানে বিএনপি-জামাতের তকমা দেওয়া হচ্ছে। অথচ সে আন্দোলনগুলোতে জনগণ স্বতস্ফূর্তভাবে অংশ নিচ্ছে। আর এটাই প্রমাণ করে আনাদোলনগুলো যৌক্তিক।’

উপাচার্যকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘নিজের বিরুদ্ধে আন্দোলন ঠেকাতে আপনি বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করেছেন। আপনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসে তাদের দাবি শুনে ব্যবস্থা নিতে পারতেন। কিন্তু আপনি তা করেননি। আপনার বিভিন্ন সময়ের বক্তব্যই প্রমাণ করে আপনি দুর্নীতিবাজ।’ 

আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্য নূর বলেন, ‘এ আন্দোলন শুধু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের পতনের আন্দোলন নয়। এটা অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন। এ আন্দোলন ঠিকই ৯০’র গণ অভ্যুত্থানে রুপ নেবে।’

সমাবেশে অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এখন খুবই দুঃখজনক পরিস্থিতির মধ্যে আছে। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ, হল বন্ধ, ক্লাস বন্ধ, অনেকগুলো পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ছিল, সেগুলোও বন্ধ। শিক্ষার্থীদের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এরকম একটি পরিস্থিতি তৈরি হলো, এর জন্য কে দায়ি? আমরা সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সবাই জানি, এর জন্য দায়ি বর্তমান উপচার্য।’

সংহতি সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন বাসদের কেন্দ্রীয় বর্ধিত কমিটির সদস্য বজলুর রশীদ ফিরোজ ও জহিরুল ইসলাম, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট (মার্ক্সবাদী) সভাপতি মাসুদ রানা, ছাত্রফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন প্রিন্স, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য মোহাব্বত হোসেন খান, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক অনিক রায়, ছাত্র ফেডারেশনের সভাপতি গোলাম মোস্তফা, রাখাল রাহা (রাষ্ট্রচিন্তা), গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি প্রমুখ।