রাঙ্গাঁর দায় নেবে না জাপা

অর্বাচীনকে ক্ষমা চাইতে হবে: সরকারি দল

প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০১৯     আপডেট: ১৩ নভেম্বর ২০১৯      

সমকাল প্রতিবেদক

মসিউর রহমান রাঙ্গাঁ -ফাইল ছবি

নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের শহীদ নূর হোসেনকে কটাক্ষ করে জাতীয় পার্টির এমপি ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মসিউর রহমান রাঙ্গাঁর দেওয়া বক্তব্যের জের ধরে সংসদে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। সরকারি দল আওয়ামী লীগ ও তার একাধিক শরিক দলের পক্ষ থেকে এই বক্তব্য প্রত্যাহার ও রাঙ্গাঁকে নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার দাবি ওঠে।

মঙ্গলবার সংসদের বৈঠকে এসব দাবি জানানো হয়। যদিও এ সময় রাঙ্গাঁ সংসদের উপস্থিত ছিলেন না। তবে রাঙ্গাঁর নিজ দল জাতীয় পার্টির সদস্যরাও তুলাধুনা করেছেন রাঙ্গাঁকে। তারা বলেছেন, এটা তার ব্যক্তিগত বক্তব্য। তার এই বক্তব্যের দায় জাপা নেবে না।

১০ নভেম্বর নূর হোসেনের শহীদ দিবসে দলীয় এক আলোচনা সভায় জাপার মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গাঁ বিরূপ মন্তব্য করেন নূর হোসেনের পাশাপাশি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়েও।

আওয়ামী লীগদলীয় সদস্য তাহজীব আলম সিদ্দিকী অনির্ধারিত আলোচনার শুরু করে রাঙ্গাঁকে 'অর্বাচীন' হিসেবে মন্তব্য করে তাকে সংসদের দাঁড়িয়ে ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান। এরপর সরকারি দলের সিনিয়র সদস্য আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, শেখ ফজলুল করিম সেলিম, শরিক দল তরীকত ফেডারেশনের নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারি ও গণফোরামের সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ বক্তব্য দেন। এরপর জাতীয় পার্টির সদস্য মুজিবুল হক চুন্নু ও কাজী ফিরোজ রশীদ রাঙ্গাঁকে সমালোচনা করে বক্তব্য দেন।

আমির হোসেন আমু ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, তার এই বক্তব্য শাক দিয়ে মাছ ঢাকার মতো। এইচ এম এরশাদের কুকীর্তি ঢাকতে মসিউর রহমান অবান্তর কথা বলেছেন। নূর হোসেনকে যখন হত্যা করা হয় তখন ফেনসিডিল, ইয়াবা- এসব শব্দের সঙ্গেও মানুষ পরিচিত ছিল না। প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে রাঙ্গাঁর বক্তব্যের সমালোচনা করে আমু বলেন, যার নেতৃত্বে প্রতিমন্ত্রী ছিলেন তার বিরুদ্ধে এতবড় ধৃষ্টতা দেখাতে পারেন না। তাকে ক্ষমা চাইতে হবে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

তোফায়েল আহমেদ বলেন, রাঙ্গাঁর বক্তব্য কুৎসিত। তাকে ক্ষমা চাইতে হবে। তিনি বাংলার মানুষের হৃদয়ে ব্যথা দিয়েছেন। তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বক্তব্য দিয়েছেন, জাতির কাছে তার ক্ষমা চাওয়া উচিত। আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটভুক্ত না থাকলে রাঙ্গাঁ সংসদ সদস্যও হতে পারতেন না বলে স্মরণ করিয়ে দেন তোফায়েল আহমেদ।

গণফোরামের সুলতান মনসুর বলেন, রাঙ্গাঁ সংসদকে অবমাননা করেছেন। স্বৈরাচারের পতন না হলে রাঙ্গাঁ সাংসদ হতে পারতেন না। রাঙ্গাঁর এ বক্তব্যের মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে- স্বৈরাচারের পতন হলে তাদের চরিত্র, স্বৈরাচারের প্রেতাত্মা পরিবর্তন হয়নি। রাঙ্গাঁকে অবশ্যই সংসদে ক্ষমা চাইতে হবে।

জাতীয় পার্টির মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, রাঙ্গাঁর বক্তব্য জাতীয় পার্টি ধারণ করে না। এটা তার ব্যক্তিগত মন্তব্য। 'শহীদ নূর হোসেন' সম্পর্কে জাতীয় পার্টির দলীয় অবস্থান তুলে ধরে চুন্নু বলেন, তৎকালীন চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ব্যক্তিগতভাবে নূর হোসেনের বাড়ি গিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন, ক্ষমা চেয়েছেন, পরিবারকে সাহায্য করেছেন। এটাই জাতীয় পার্টির দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি। তিনি আরও বলেন, জাপার অনেক দোষ আছে। তবে '৯৬ সাল থেকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য জাপা সহযোগিতা করে আসছে আওয়ামী লীগকে। এটা তো ঠিক, ২০১৪ সালে যখন অগণতান্ত্রিক সরকার আসার চিন্তাভাবনা করেছিল, তখন জাতীয় পার্টি সরকারের সঙ্গে মিলে গণতন্ত্রের ধারা অব্যাহত রাখতে সহযোগিতা করেছে। এটা কিন্তু মনে রাখতে হবে।

জাপার আরেক সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, রাঙ্গাঁর এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে গেছে। তার বক্তব্য জাপার নয়। কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি এ ধরনের বক্তব্য দিতে পারে না। এ জন্য জাপা লজ্জিত, দুঃখিত ও অপমানিত অনুভব করছে। দশম সংসদের মেয়াদে আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভায় রাঙ্গাঁকে স্থান দেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরে কাজী ফিরোজ রশীদ বলেন, 'বান্দরকে লাই দিলে মাথায় ওঠে... জাপা তাকে প্রশ্রয় দেয়নি। এ সংসদ তাকে লাই দিয়েছে। যার ব্যাকগ্রাউন্ড নেই, কিছু নেই, হঠাৎ করে এনে মন্ত্রী করা হয়েছে। যুবদল করেছে সে, বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে এমন কথা বলার দুঃসাহস কোথায় পায়।'

রাঙ্গাঁর বক্তব্য ঘৃণাভাবে প্রত্যাখ্যানের কথা জানিয়ে ফিরোজ রশীদ বলেন, 'তার দায় দল নেবে না। যে লেখাপড়া করে নাই, পরিবহনের নৈরাজ্য সৃষ্টি করে বাড়িগাড়ি করেছে, তার জবাব দিতে আমাদের আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে। আজ লজ্জিত আমরা।' তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সমর্থন না দিলে জাপা সদস্যদের সংসদ সদস্য হওয়া কঠিন হয়ে যেত। আওয়ামী লীগ যদি না থাকত রংপুরে থাকতে পারতেন না রাঙ্গাঁ।