সড়ক পরিবহন আইনে ছাড় আরও 'কিছুদিন'

প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০১৯     আপডেট: ১৭ নভেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ

সমকাল প্রতিবেদক

ফাইল ছবি

ফাইল ছবি

বহুল আলোচিত সড়ক পরিবহন আইন কার্যকরে দুই দফা সময় বাড়ানোর শেষ দিন আজ রোববার। তবে আইন ভঙ্গে আজ থেকে মামলা হচ্ছে না। সরকারের তরফে নতুন কোনো ঘোষণা না এলেও আইনটি বাস্তবায়নে আরও কিছুদিন সময় লাগবে। বর্ধিত জেল-জরিমানা কার্যকর করা হলে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে, পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা গাড়ি বন্ধ করে দিতে পারেন, পেঁয়াজসহ জরুরি খাদ্যপণ্য সরববরাহ বিঘ্নিত হতে পারে- এসব বিষয় মাথায় রেখে ধীরে চলার নীতি নিয়েছে সরকার। সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

নতুন আইনে কারাদণ্ড দেওয়া হচ্ছে, ফিটনেসবিহীন গাড়ি ধরা পড়লে ২৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হচ্ছে- এসব গুজবে গতকাল শনিবার বগুড়ার ছয়টি রুটে বাস চলাচল বন্ধ করে দেন পরিবহন শ্রমিকরা।

আইনে ত্রুটি থাকায় বাস্তবায়নেও রয়েছে বিপত্তি। আট বছর ধরে আলোচনা-পর্যালোচনা করে খসড়া প্রণয়ন, মন্ত্রিসভায় অনুমোদন, ভেটিং, স্থায়ী কমিটির যাচাই-বাছাই, সংসদে পাস, এরপর কার্যকরে গেজেট প্রকাশসহ সব ধাপ পেরিয়ে বাস্তবায়নের পর্যায়ে এসে আইনে কিছু ত্রুটি ধরা পড়েছে। বিধিমালা প্রণয়ন না করেই গত  ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর করা হয় গত বছর নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশব্যাপী নজিরবিহীন আন্দোলনে পাস হওয়া সড়ক পরিবহন আইন। এতে ট্রাফিক নিয়ম ভঙ্গে সাজা বেড়েছে বহুগুণ। জরিমানা বেড়েছে হাজার গুণ পর্যন্ত। জরিমানার ভয়ে কাগজপত্র হালনাগাদ করতে উপচেপড়া ভিড় বিআরটিএতে। পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা এ আইনে অসন্তুষ্ট। তারা আইনটিকে কঠোর আখ্যা দিয়ে সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন।

গত ১ নভেম্বর কার্যকর হলেও গাড়ির কাগজ হালনাগাদের সুযোগ দিতে আইন প্রয়োগে দুই সপ্তাহ ছাড় দেওয়া হয়। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ঘোষণা অনুযায়ী আজ থেকে নতুন আইন প্রয়োগ হওয়ার কথা। তবে ডিএমপি কমিশনার শফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেছেন, আইন বাস্তবায়নে আরও কিছু সময় লাগবে। তিনি জানিয়েছেন, আইন সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে এ সময় দেওয়া হচ্ছে।

আইন অনুযায়ী বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালত সড়ক পরিবহন আইন ভঙ্গে জেল-জরিমানা করবে। পুলিশের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মামলা করতে পারবেন। নতুন আইনে মামলা দিতে বাধা নেই পুলিশের। কিন্তু ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে আইন তফসিলভুক্ত করে প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে, তা এখনও হয়নি।

বিআরটিএর চেয়ারম্যান ড. কামরুল আহসান সমকালকে বলেন, আইন তফসিলভুক্ত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এখনও প্রজ্ঞাপন হয়নি। তবে চলতি সপ্তাহেই তা জারি হয়ে যাবে। এরপর নতুন আইনের বর্ধিত জেল-জরিমানা কার্যকর করা যাবে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে।

ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মফিজ উদ্দীন আহম্মেদ বলেন, নতুন আইনে মামলা করতে পুলিশ প্রস্তুত রয়েছে। তবে কবে থেকে মামলা দেওয়া হবে, তা নিশ্চিত করে বলেননি তিনি।

১ নভেম্বর থেকে কার্যকর করা হলেও ট্রাফিক পুলিশের সফটওয়্যারে নতুন আইনে ধার্য করা জরিমানার অঙ্ক ইনস্টল নেই। সফটওয়্যার আপডেট দিতে সময় লাগছে। নতুন আইনে মামলা দায়ের ও জরিমানা আদায়ে আপাতত ছাপানো ফরম তৈরি করা হয়েছে।

ডিএমপি ও বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, নতুন আইনে লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান থাকলেও প্রথম অপরাধের ক্ষেত্রে পাঁচ হাজার এবং পরবর্তী সময়ে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। আইনে ৭২ ধারায় রেজিস্ট্রেশন ছাড়া গাড়ি চালালে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে পুলিশের মামলার ফরম অনুযায়ী এ ধারায় প্রথম অপরাধের ক্ষেত্রে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। ৭৫ ধারা অনুযায়ী, গাড়ির ফিটনেস না থাকলে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালালে গুনতে হবে আড়াই হাজার টাকা জরিমানা।

কিন্তু আইন কার্যকর করতে গিয়ে দেখা দিয়েছে বিপত্তি। মোটরযানের বীমা করা বাধ্যতামূলক হলেও বীমা না করলে কী সাজা হবে, তা বলা নেই। ৬০(২) ধারায় বলা হয়েছে, 'মোটরযানের মালিক বা প্রতিষ্ঠান উহার অধীনে পরিচালিত মোটরযানের বীমা করিবেন এবং মোটরযানের ক্ষতি বা নষ্ট হওয়ার বিষয়টি বীমার আওতাভুক্ত থাকবে এবং বীমাকারী কর্তৃক উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ পাইবার অধিকারী হবেন।'

আইনের একাদশ অধ্যায়ে ৬৬ থেকে ১০৬ ধারা পর্যন্ত আইন ভঙ্গে জরিমানা ও সাজার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। কিন্তু বীমা না করলে কী শাস্তি হবে, তা বলা নেই। নতুন আইন কার্যকরের পর রহিত হওয়া মোটরযান অধ্যাদেশ, ১৯৮৩ অনুযায়ী বীমা না করলে সর্বোচ্চ দুই হাজার টাকা জরিমানার বিধান ছিল।

বিআরটিএর একাধিক কর্মকর্তা সমকালকে নিশ্চিত করেছেন, ভুলবশত বীমা না করলে সাজার বিধান বাদ পড়েছে। শুধু বীমা নয়, রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস, ড্রাইভিং পরীক্ষার সিলেবাস, ট্রাফিক সাইন ও সিগন্যালের বর্ণনাসহ আইনের ছয়টি অসংগতি চিহ্নিত করা হয়েছে।

আইনের ২৫(১) ধারা অনুযায়ী ফিটনেস সনদ থাকা বাধ্যতামূলক। ফিটনেস সনদ ছাড়া বা মেয়াদোত্তীর্ণ সনদ ব্যবহার করে গাড়ি চালানো যাবে না। জরাজীর্ণ, রংচটা, রং পরিবর্তন করা গাড়িও চালানো যাবে না। রহিত হওয়া মোটরযান অধ্যাদেশের ৪৭(৩) উপধারায় ফিটনেসের মেয়াদের বিষয়টি উল্লেখ ছিল। এতে বলা হয়েছিল, সনদ গ্রহণের তারিখ থেকে এক বছর হবে ফিটনেসের মেয়াদ। নতুন আইনে উল্লেখ না থাকায় ফিটনেসের মেয়াদ কত দিন, তা স্পষ্ট নয়। মোটরযান অধ্যাদেশে রুট পারমিটের মেয়াদ তিন বছর নির্ধারণ করা হলেও সড়ক পরিবহন আইনে সময়সীমা উল্লেখ নেই।

এসব বিষয়ে বিআরটিএ চেয়ারম্যান বলেছেন, বিধিমালা প্রণয়নে অতিরিক্ত সচিব আবদুল মালেকের নেতৃত্বে কমিটি কাজ করছে। আইনে যেসব ছোটখাটো বিষয় বাদ পড়েছে, তা বিধিমালায় স্পষ্ট করা হবে। নতুন বিধিমালা না হওয়া পর্যন্ত মোটরযান বিধিমালা, ১৯৮৪ কার্যকর থাকবে বলে আইনে বলা হয়েছে।

বিআরটিএ চেয়ারম্যান বিধিমালার মাধ্যমে ত্রুটি সংশোধনের কথা বললেও সংস্থাটির একাধিক কর্মকর্তা সমকালকে বলেছেন, আইনে যা নেই, তা বিধিমালা দিয়ে নির্ধারণ করা যায় না। ত্রুটি দূর করতে আইন সংশোধন করতে হবে। আইন সংশোধনের একমাত্র ক্ষমতা সংসদের।