ছয় প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে আগামী মাসেই চার্জশিট

অর্থ পাচার মামলা

প্রকাশ: ১৮ নভেম্বর ২০১৯     আপডেট: ১৮ নভেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সাহাদাত হোসেন পরশ

'শুদ্ধি' অভিযানে গ্রেপ্তার ছয় প্রভাবশালীর অবৈধ সম্পদের ব্যাপারে তদন্ত প্রায় শেষ। তাদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে চার্জশিট দাখিল করবে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এরপর তাদের অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করবে সরকার। প্রথম ধাপে যে ছয়জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হচ্ছে তারা হলেন- জি কে বিল্ডার্সের কর্ণধার জি কে শামীম, যুবলীগ দক্ষিণের বহিস্কৃত সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, কাউন্সিলর মিজানুর রহমান ওরফে পাগলা মিজান, অনলাইন ক্যাসিনো ব্যবসায়ী সেলিম প্রধান, ক্যাসিনোকাণ্ডের হোতা দুই ভাই আওয়ামী  লীগ নেতা এনামুল হক ওরফে এনু ভূঁইয়া ও রুপন ভূঁইয়া। সিআইডির একটি দায়িত্বশীল সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে সিআইডির ডিআইজি ইমতিয়াজ আহমেদ গতকাল রোববার সমকালকে বলেন, ডিসেম্বরের মধ্যে মানি লন্ডারিং আইনে ছয়জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেওয়া হবে। এ ছাড়া আরও যে কয়েকজনের ব্যাপারে অনুসন্ধান চলছে, তথ্য-উপাত্ত পেলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল সারওয়ার-বিন কাশেম বলেন, সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে স্পষ্টভাবে বলা হচ্ছে অভিযান বন্ধ হয়নি। এ অভিযান চলবে। এরই মধ্যে তিনটি মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে তদন্ত শেষ করে বাকি মামলার চার্জশিট দেওয়া হবে।

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা গত ৭ সেপ্টেম্বর দলের যৌথ সভায় দলের ভেতরে শুদ্ধি অভিযান চালানোর নির্দেশনা দেন। এরপর ওই সভায় যুবলীগের দুই নেতার সমালোচনা করা হয়। এর পাঁচ দিনের মাথায় ১৮ সেপ্টেম্বর প্রথম গ্রেপ্তার হন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। এরপর তাকে সংগঠন থেকে বহিস্কার করা হয়। অভিযান শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ৩০টি ক্লাব ও বারে অভিযান চালানো হয়েছে। তবে কিছুদিন ধরে অভিযানে ধীরগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

সংশ্নিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কয়েকটি কারণে অভিযানের গতি কিছুটা কমেছে। এর অন্যতম হচ্ছে, অভিযানে যারা গ্রেপ্তার হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করতে চায় তদন্ত সংস্থা। তবে কিছুটা গুছিয়ে নিয়ে অচিরেই জোরালো অভিযান চালানো হবে।

দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা জানান, যেসব প্রেক্ষাপট সামনে রেখে অভিযান শুরু হয়েছে, তা চলমান থাকবে। শুধু ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী নন, অভিযানের গতিপ্রকৃতি মাঝেমধ্যে পাল্টাতে পারে। রাজধানীতে ক্যাসিনো ঘিরে অভিযান শুরু হলেও পরে তা নানা দিকে বিস্তৃত হয়। এরই মধ্য গ্রেপ্তার হয়েছেন বেশ কয়েকজন কাউন্সিলর। তদন্ত চলছে আরও কয়েকজন রাঘববোয়ালের বিষয়ে।

র‌্যাব সূত্রে জানা গেছে, ক্যাসিনো-সংক্রান্ত অভিযানের পর ৩২টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে র‌্যাবের কাছে তদন্তাধীন রয়েছে ৯টি। র‌্যাব আরও দুটি মামলা তদন্তের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছে। ক্যাসিনো-সংক্রান্ত তিনটি মামলার চার্জশিট দাখিল করেছে র‌্যাব। প্রভাবশালীদের মধ্যে সাবেক যুবলীগ নেতা খালেদের বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলার চার্জশিট হয়েছে। তদন্তাধীন রয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ও মানি লন্ডারিং আইনের মামলা। জি কে শামীমের বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলার চার্জশিট হয়েছে। তার বিরুদ্ধে তদন্তাধীন রয়েছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ও মানি লন্ডারিং আইনের মামলা। কলাবাগান ক্রীড়া চক্রের সভাপতি শফিকুল ইসলাম ফিরোজের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ও অস্ত্র আইনে দায়ের করা মামলার তদন্ত করছে র‌্যাব। ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের এনামুল হক এনু ও রুপন ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইন ও মানি লন্ডারিং আইনে মামলার তদন্ত চলমান। অনলাইন ক্যাসিনো কারবারি সেলিম প্রধানের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ ও মানি লন্ডারিং আইনে দায়ের করা মামলারও তদন্ত চলছে।

সাবেক যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে দায়ের করা মামলার চার্জশিট দাখিল করা হয়েছে। মোহাম্মদপুরের কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান ওরফে পাগলা মিজানের বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে মামলার তদন্ত চলমান। এ ছাড়া কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীবের বিরুদ্ধে দায়ের করা অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দায়ের করা মামলার তদন্ত র‌্যাবের কাছে ন্যস্ত করতে আবেদন করা হয়েছে। আরেক কাউন্সিলর ময়নুল হক মনজুর বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দায়ের করা মামলার তদন্ত চলছে। এ ছাড়া জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে মাদক ও অস্ত্র আইনে দায়ের করা মামলার তদন্ত চলছে। জানা গেছে, শুদ্ধি অভিযানে যারা গ্রেপ্তার হয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচারকাজও শুরু হবে।

শুদ্ধি অভিযান শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত র‌্যাবের হাতে ২৩৬ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। দেশি-বিদেশি মুদ্রাসহ আট কোটি ৪৫ লাখ টাকা জব্দ করা হয়েছে। উদ্ধার করা হয়েছে ১৬৬ কোটি ২৭ লাখ টাকার এফডিআর, ১৩২টি বিভিন্ন ব্যাংকের চেকবই ও ছয় কোটি ৭৭ লাখ টাকার চেক। আরও জব্দ করা হয় আট কেজি স্বর্ণ। এখন পর্যন্ত বৈধ-অবৈধ মিলিয়ে ২৫টি অস্ত্র জব্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক ইয়াবা, বিদেশি মদ ও অন্যান্য মাদক আটক করা হয়।

সূত্র জানায়, আগামী মাসের শেষ দিকে অভিযান আরও জোরালো হবে। দুর্নীতিবাজ যারা গা-ঢাকা দিয়েছে, তাদের খুঁজে বের করা হবে। এ ছাড়া নতুন নতুন দুর্নীতিবাজদের ব্যাপারে তদন্ত চলবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক) এদের বিরুদ্ধে আরও সক্রিয় হবে। ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের দুর্নীতিবাজ নেতাদের বাইরেও বিভিন্ন সরকারি পদে থেকে যারা কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন, তাদের ব্যাপারেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।