৭০% গ্যাস পাইপলাইন ঝুঁকিপূর্ণ

৫০ বছরের পুরোনো লাইনও আছে ঢাকায়

প্রকাশ: ১৮ নভেম্বর ২০১৯     আপডেট: ১৮ নভেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সমকাল প্রতিবেদক

ফাইল ছবি

ঘর থেকে পথ- সবখানেই মৃত্যুফাঁদ। গ্যাসের জরাজীর্ণ লাইন, অরক্ষিত ও ঝুঁকিপূর্ণ সংযোগের কারণে ঘটছে একের পর এক গ্যাস দুর্ঘটনা। ঝরছে জীবন। নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান সম্পদ। তথ্য বলছে, দেশের ৭০ শতাংশ গ্যাস বিতরণ লাইনই ঝুঁকিপূর্ণ। স্থাপিত লাইনের অর্ধেকের মেয়াদ পেরিয়েছে বহু আগে। হয় না নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অবৈধ  সংযোগ ও লাইন স্থাপন, যা গ্যাস নেটওয়ার্ককে করে তুলেছে অনিরাপদ। ফলে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ গতকাল চট্টগ্রামে এক মর্মান্তিক গ্যাস পাইপলাইনের বিস্ম্ফোরণে প্রাণ গিয়েছে সাতজনের।

সংশ্নিষ্টদের তথ্যমতে, ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে পাইপলাইনের সাহায্যে গ্যাস সরবরাহের মাধ্যমে ১৯৬০ সালে বাংলাদেশে প্রাকৃতিক গ্যাসের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ শুরু হয়। বাসাবাড়িতে গ্যাস সরবরাহ শুরু ১৯৬৭ সালের দিকে, ঢাকায়। এরপর দেশজুড়ে গ্যাসের নেটওয়ার্ক বৃদ্ধি পেয়েছে। সারাদেশে গ্যাস নেটওয়ার্কের পরিমাণ ২৪ হাজার ২৮৭ কিলোমিটার। এর মধ্যে বিতরণ ও সার্ভিস লাইন প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার। এই লাইনের ৭০ শতাংশই ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে ঢাকা, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের পাইপলাইনের অবস্থা শোচনীয়। ঢাকা বিভাগে গ্যাস সরবরাহের দায়িত্বে নিয়োজিত তিতাস গ্যাসের ১২ হাজার ২৫৩ কিলোমিটার পাইপলাইন রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় রয়েছে সাত হাজার কিলোমিটার। যার ৭০ শতাংশ অতিঝুঁকিপূর্ণ। এখানে ২০ বছর থেকে শুরু করে ৪০ বছরের পুরোনো বিতরণ লাইনও রয়েছে। মাঝে মাঝে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু লাইন পাল্টানো হলেও লাইনের রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম তেমন নেই। ঢাকা ছাড়াও নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুর, জামালপুর এবং কিশোরগঞ্জে তিতাসের পাইপলাইন আছে। এর মধ্যে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও নরসিংদীতে অবৈধ গ্যাস সংযোগের পরিমাণ বেশি। মূল লাইন থেকে ঝুঁকিপূর্ণভাবে সাধারণ পাইপে বাসাবাড়ি ও কারখানায় গ্যাস নেওয়া হয়। এসব অনিরাপদ সংযোগ থেকে প্রায়শই দুর্ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় রাস্তা সংস্কারের কারণে পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে দুর্ঘটনা ঘটে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে রাজধানীর কাঁঠালবাগান, জুরাইনের আইজি গেট এলাকা, ধানমন্ডির শুক্রাবাদে গ্যাসলাইনের লিকেজ থেকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া বাসাবাড়িতে অহরহ ঘটছে দুর্ঘটনা। অগিদগ্ধ হয়ে মারা যাচ্ছেন অনেকেই।

এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, 'ঢাকার গ্যাস পাইপলাইনের বেশিরভাগ ৩৫-৪০ বছরের পুরনো। এসবের সবগুলোই প্রায় জরাজীর্ণ হয়ে গেছে। এ শহরে ৫০ বছরের পুরোনো পাইপলাইনও রয়েছে।'

পেট্রোবাংলার সাবেক একজন চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তিতাসের ৭০ শতাংশ পাইপলাইনই ঝুঁকিপূর্ণ। এগুলোর অধিকাংশের মেয়াদ পেরিয়ে গেছে অনেক আগে। চট্টগ্রাম ও কুমিল্লার বিতরণ ব্যবস্থার অবস্থাও নাজুক। তিনি বলেন, গ্যাস পাইপলাইনের তেমন রক্ষণাবেক্ষণ করা হয় না। বিতরণ কোম্পানিগুলো তাকিয়ে থাকে প্রজেক্টের দিকে। এ ছাড়া ২০১০ সাল থেকে গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় বেড়েছে অবৈধ সংযোগের পরিমাণ। সরকারও বাসাবাড়িতে গ্যাস সংযোগকে নিরুৎসাহিত করছে। এসব কারণে দীর্ঘদিন থেকে বিতরণ নেটওয়ার্কের দিকে নজর কম। ফলে ঝুঁকি আরও বেড়েছে।

তিতাসের সাবেক একজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসারে গ্যাস পাইপলাইনে এক ধরনের গন্ধযুক্ত রাসায়নিক মেশানো হয়, যাতে কোথাও লিকেজ হলে গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে এবং সাবধান হওয়া যায়। এখন সম্ভবত এই কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। তিনি বলেন, কোথাও লিকেজ থেকে গ্যাস বেরিয়ে এসে যদি কোনো বদ্ধ জায়গায় জমা হতে হতে তার পরিমাণ বাতাসে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হয়, তাহলে আগুন ধরার পরিবর্তে বিকট শব্দে বিস্ম্ফোরণ ঘটে। এর পরিমাণ ২০ শতাংশ পেরোলে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। চট্টগ্রামে হয়তো প্রথম কারণে বিস্ম্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। ওই ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরও জানান, ঢাকায় চাইলেও ঝুঁকিপূর্ণ গ্যাসলাইন পুরোপুরি পাল্টানো খুবই দুরূহ কাজ। কারণ এত দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা সিস্টেম একবারে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। আবার অনেক এলাকায় স্থাপিত লাইনের ওপর রাস্তা কয়েকগুণ উঁচু হয়েছে। আর এই বিপুল পরিমাণ লাইন প্রতিস্থাপন অর্থনৈতিকভাবেও লাভজনক নয়।

জানতে চাইলে নসরুল হামিদ সমকালকে বলেন, 'দেশের গ্যাস লাইনগুলো জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। এগুলো পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিতাস ১২০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। এর মাধ্যমে রাজধানীতে দুই হাজার কিলোমিটার বিতরণ লাইন প্রতিস্থাপন করা হবে। এ ছাড়া অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা হয়েছে।'

বাসাবাড়িতে নিরাপদ গ্যাস নেটওয়ার্ক স্থাপনের ওপর জোর দিয়ে এ বিষয়ে জনগণকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।