৫০ লাখের নিচে ছিনতাইয়ের চিন্তাই করে না তারা

প্রকাশ: ১৮ নভেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

বকুল আহমেদ

বাঁ থেকে- জাকির, খলিল ও জুয়েল মৃধা

গায়ে ডিবির জ্যাকেট। কারও হাতে ওয়াকিটকি, কারও হাতে সিগন্যাল লাইট, কারও কোমরে পিস্তল। তাদের বহনকারী মাইক্রোবাসের সামনেও ডিবি লেখা স্টিকার। দেখে মনে হবে তারা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। কিন্তু না, তারা আসল নয়, ভুয়া ডিবি। ডিবি পুলিশ পরিচয়ে গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে রাজধানী ঢাকায় ছিনতাই করাই যাদের মূল পেশা। তাদের টার্গেট ব্যাংক থেকে মোটা দাগে টাকা উত্তোলন করে বের হওয়া ব্যক্তিরা। ৫০ লাখ টাকার নিচে ছিনতাই করে না তারা। তাই নিজেদের কোটি টাকার ছিনতাই চক্র পরিচয় দেয় এরা। সম্প্রতি গুলিস্তান এলাকায় ডিবি পরিচয়ে ৯৫ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় চার সদস্য গ্রেপ্তারের পর চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে।

ডিবির (পূর্ব) অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার জসীম উদ্দিন সমকালকে বলেন, 'ডিবি পুলিশ পরিচয়ে এই চক্র রাজধানীতে মানুষের কাছ থেকে টাকা লুট করে। তাদের নিজস্ব সোর্স রয়েছে। মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেলে চক্রের সদস্যরা ঘুরে বেড়ায়। সোর্সের কাছ থেকে তথ্য পেয়ে সুযোগ বুঝে টাকা লুট করে। চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য সদস্যদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।'

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এটি একটি বড় চক্র। এ চক্রে ২৭ জন সদস্য রয়েছে। এর মধ্যে তাদের নিয়োগকৃত সোর্স রয়েছে ১২ জন। এসব সোর্সকে দিনে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা করে হাজিরা দেওয়া হয়। এ ছাড়া ছিনতাই করা টাকা থেকেও একটি নির্দিষ্ট অংশ দেওয়া হয় তাদের। সোর্সরা বিভিন্ন ব্যাংক-বীমা, করপোরেট অফিস এবং তাঁতীবাজারের স্বর্ণের মার্কেটে অবস্থান করে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে কেউ কমপক্ষে ৫০ লাখ টাকা নিয়ে বের হলে, মোবাইল ফোনে চক্রের সদস্যদের জানিয়ে দেয়। যে গাড়িতে টাকা নেওয়া হচ্ছে, সেই গাড়ির রং ও নম্বরও জানিয়ে দেয় তারা। ৫০ লাখ টাকার নিচে ছিনতাই করে না তারা। চক্রের সদস্যরা ডিবি লেখা জ্যাকেট, সিগন্যাল লাইট, হাতকড়া ও পিস্তল নিয়ে দুটি মাইক্রোবাসে ভাগ হয়ে রাজধানীতে টহল দেয়। মোটরসাইকেলেও থাকে একটি দল। সোর্সের ফোন পেয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে টার্গেট ব্যক্তির গাড়ি অনুসরণ করে তারা। অনুসরণ করা ব্যক্তিদের কাছ থেকে তথ্য পেয়ে মাইক্রোবাসে ছুটে আসে অন্য সদস্যরা। এর পরই ডিবির জ্যাকেট পরে সিগন্যাল লাইট দিয়ে টার্গেট ব্যক্তির গাড়ি থামানোর সংকেত দেয়। গাড়ি থামলে ডিবি পরিচয়ে জোরপূর্বক গাড়িতে ওঠে। এ ছাড়া যানজটে আটকা পড়লেও টার্গেট ব্যক্তির গাড়িতে একইভাবে ৪-৫ জন ডিবির জ্যাকেট পরা ব্যক্তি উঠে যায়। বহন করা টাকার উৎস জানতে চায় তারা। একপর্যায়ে নানা ভয়ভীতি দেখিয়ে গ্রেপ্তারের হুমকি দেয়। পরে সুযোগ বুঝে টাকার ব্যাগ লুট করে পালিয়ে যায়।

সর্বশেষ গত ১০ অক্টোবর গুলিস্তান এলাকায় এক ব্যবসায়ীর ৯৫ লাখ টাকা ছিনতাই করে এই চক্র। এ ঘটনায় ব্যবসায়ী আব্দুল হান্নান পল্টন থানায় মামলা দায়ের করেন। তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নাম প্যানারোমা অ্যাপারেলস অ্যান্ড হোমটেক্স ও প্যানারোমা আইল্যান্ড লিমিটেড। পল্টন বক্সকালভার্ট রোডে অফিস। এজাহারে বলা হয়েছে, ১০ অক্টোবর বিকেলে বাদীর অফিস স্টাফ নাইমুর রহমান রাব্বি ও মাহবুবুর রহমান বিজয়নগরের একটি ব্যাংকের শাখা থেকে ৬০ লাখ টাকা তোলেন। টাকা নিয়ে মাইক্রোবাসে মতিঝিল গিয়ে আরও একটি ব্যাংক থেকে ২০ লাখ টাকা উত্তোলন করে চকবাজারে যান। সেখান থেকে আরও ১৫ লাখ টাকা নেন এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে। সন্ধ্যায় দুটি ব্যাগে মোট ৯৫ লাখ টাকা নিয়ে তারা মাইক্রোবাসে চকবাজার থেকে পল্টনের অফিসে ফিরছিলেন। গুলিস্তান এলাকায় মাইক্রোবাস পৌঁছলে ডিবি পরিচয়ে গাড়ি থামানো হয়। এর পরই ছয়জন জোরপূর্বক গাড়িতে উঠে পড়ে। ভয়ভীতি দেখিয়ে টাকার দুটি ব্যাগ ছিনিয়ে নেয়। অফিস স্টাফদের চিৎকারে ঘটনার অদূরে থাকা পুলিশ সদস্যরা ছুটে এলে তারা পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে টাকার একটি ব্যাগসহ চক্রের সদস্য সোহাগ মাঝিকে আটক করে পুলিশ। ওই ব্যাগে প্রায় ২৫ লাখ টাকা ছিল। বাকি টাকা নিয়ে অন্যরা পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা হয় ছিনতাই কাজে ব্যবহূত টয়োটা সুপারজেল গাড়িটি।

মামলাটি তদন্ত করছে ডিবির পূর্ব বিভাগের মতিঝিল জোনাল টিম। চক্রের তিন  সদস্য খলিল, জাকির ও জুয়েল মৃধাকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। জিজ্ঞাসাবাদে তারা ডিবিকে জানিয়েছে, ১০ অক্টোবরের ছিনতাইয়ের ঘটনায় তারা তিনজনসহ ১৫ জন অংশ নিয়েছিল। তাদের মধ্যে দু'জন নয়ন ও মোশারফ মোটরসাইকেল নিয়ে টাকা বহনকারী মাইক্রোবাসটি অনুসরণ করছিল। নয়ন মোবাইল ফোনে জাকিরকে গাড়িটি সম্পর্কে তথ্য দেয়। তাদের নিয়োগ করা ১২ জন সোর্স রয়েছে। এ ছাড়া তাঁতীবাজারের তিন ব্যবসায়ীও তাদের সোর্স হিসেবে কাজ করে বলে জানিয়েছে তারা।