পদকের জন্য নির্বাচন

মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবে পুলিশে অসন্তোষ

প্রকাশ: ২৫ নভেম্বর ২০১৯     আপডেট: ২৫ নভেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ

সাহাদাত হোসেন পরশ

সাহসিকতা ও ভালো কাজের স্বীকৃতি হিসেবে প্রতি বছর পুলিশ সপ্তাহে দেওয়া হয় 'পুলিশ পদক'। এই পদক তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী। তবে এর আগে পদকধারীদের নির্বাচন করে থাকে পুলিশ সদর দপ্তর।

পদকধারীদের যোগ্যতা নিরূপণে পুলিশ মহাপরিদর্শক একটি কমিটি গঠন করেন। কারা পদক পাবেন, তা নির্বাচন করে পুলিশের ওই কমিটি। দীর্ঘদিন ধরে এই প্রক্রিয়ায় চালু ছিল পুলিশের পদকধারী নির্বাচন। তবে আসন্ন পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে পুলিশ পদকধারীদের চূড়ান্তভাবে নির্বাচন করতে চায় মন্ত্রণালয়। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে পদকধারীদের প্রাথমিকভাবে নির্বাচনের পর তা ফের যাচাই-বাছাই করবে তারা। পদক কারা পাবেন তা নির্ধারণ করবে মন্ত্রণালয়। এরই মধ্যে পদকধারী নির্বাচনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিবকে প্রধান করে ছয় সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। এবার পদকধারী নির্বাচনে নতুন এই পদ্ধতির কথা জানিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পুলিশ সদর দপ্তরে চিঠি  দেওয়া হয়েছে। একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক বলেন, 'পুলিশ পদকধারী নির্বাচনের এখতিয়ার পুলিশপ্রধানের। তিনি তালিকা তৈরি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠান। এটা দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্য নষ্ট হওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। এর আগেও একবার পদকধারী নির্বাচন কমিটিতে র‌্যাব, এসবি ও সিআইডির সদস্য রাখতে বলা হয়েছিল। তখনও পুলিশ ওই সিদ্ধান্ত ভালোভাবে নেয়নি। এবার মন্ত্রণালয় পদকধারী নির্বাচনে এমন সিদ্ধান্ত নিলে সেটা পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা ভালোভাবে নেবে না।'

পুলিশের চাকরিতে পুলিশ পদক খুবই সম্মানজনক বলে বিবেচনা করা হয়। পদক পাওয়া কর্মকর্তারা আর্থিক সুবিধা ও নামের শেষে উপাধি হিসেবে এই পদক ব্যবহার করতে পারেন। বর্তমানে বিপিএম (সাহসিকতা) পদকধারীরা এককালীন ১ লাখ ও প্রতি মাসের বেতনের সঙ্গে দেড় হাজার টাকা বাড়তি পেয়ে থাকেন। পিপিএম পদকধারীরা এককালীন ৭৫ হাজার ও প্রতি মাসে এক হাজার টাকা পান। বিপিএম (সেবা) পদকধারীরা এককালীন ৭৫ হাজার টাকা পান। পিপিএম (সেবা) পদকধারীরা এককালীন পান ৫০ হাজার টাকা।

এদিকে পুলিশ পদক নির্বাচনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এমন চিঠিতে পুলিশের অসন্তোষ রয়েছে। তারা বলছে, পুলিশের ভালোমন্দ কাজের জন্য পুরস্কার ও তিরস্কার প্রদানের বিষয়টি পুলিশপ্রধানের এখতিয়ার। বছরের পর বছর পুলিশ পদক নির্বাচনে আইজিপির মাধ্যমে গঠিত কমিটির মনোনয়ন ছিল চূড়ান্ত। সেই রেওয়াজ ভেঙে কেন মন্ত্রণালয় পদকধারীদের নির্বাচন করবে?

দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, জানুয়ারিতে পুলিশ সপ্তাহ অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিবারের মতো এবারও পুলিশ সপ্তাহ ঘিরে দেওয়া হবে বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম) ও রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক (পিপিএম)। পদকধারী নির্বাচনে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে একজন অতিরিক্ত আইজিপিকে প্রধান করে ১১ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। সাধারণত পদকধারী নির্বাচনে প্রাথমিকভাবে বিভিন্ন রেঞ্জ ও মহানগর পুলিশ কমিশনারের কাছে চিঠি পাঠানো হয়। নিজ নিজ ইউনিটের সাহসী ও বীরত্বপূর্ণ কাজে যারা নিয়োজিত ছিলেন তাদের তালিকা পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়। পরে পুলিশ সদর দপ্তরের কমিটি সারাদেশ থেকে আসা তালিকা যাচাই-বাছাই করে চূড়ান্তভাবে পদকধারীদের নির্বাচন করে। এরপর ওই তালিকা পাঠানো হয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তা অন্যান্য সংশ্নিষ্ট দপ্তরে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়। সেখানে অনুমোদনের পর গেজেট আকারে তা প্রকাশ পায়।

আসন্ন পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে পদক নির্বাচনের ব্যাপারে পুলিশের প্রাথমিক মনোনয়নপ্রাপ্তদের তালিকা এক মাস আগে পেতে চায় মন্ত্রণালয়। এরপর ওই তালিকা তারা যাচাই-বাছাই করবে। পরে চূড়ান্তভাবে তারা ঠিক করবে, কারা পদক পাবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশের একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার ভাষ্য, পুলিশ যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সারা বছর কাজ করে, তাতে মন্ত্রণালয়ের কমিটির পক্ষে পুলিশের মাঠ পর্যায়ের সদস্যদের যোগ্যতা নিরূপণ করা কষ্টসাধ্য হবে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, পদকধারী নির্বাচন ছাড়াও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার থেকে তদূর্ধ্ব কর্মকর্তাদের পদোন্নতির পর মন্ত্রণালয়ে যোগদান করতে বলা হয়েছে। এই ধরনের নজির অতীতে ছিল না বলে অভিমত তার।

সাহসিকতা ও সেবামূলক কাজের জন্য গত বছর রেকর্ডসংখ্যক ৩৪৯ পুলিশ কর্মকর্তাকে পদক দেওয়া হয়েছিল। ২০১৮ সালে পদক পেয়েছিলেন ১৮২ জন। তবে অনেক সময় পদকপ্রাপ্ত কাউকে কাউকে নিয়ে বিতর্ক ও অভিযোগ উঠেছিল। গত বছরে নিজেদের পেশায় অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বমূলক কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ৪০ সদস্যকে বাংলাদেশ পুলিশ পদক (বিপিএম), ৬২ জনকে রাষ্ট্রপতির পুলিশ পদক দেওয়া হয়েছিল।

এছাড়া গুরুত্বপূর্ণ মামলার রহস্য উদ্‌ঘাটন, অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, দক্ষতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, সততা ও শৃঙ্খলাপূর্ণ আচরণে প্রশংসনীয় অবদান রাখায় ১০৪ জনকে বিপিএম-সেবা ও ১৪৩ জনকে রাষ্ট্রপতি পুলিশ পদক পিপিএম-সেবা প্রদান করা হয়।

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার পুলিশ পদকধারীর সংখ্যা কম হবে। সব ধরনের যোগ্যতা ও কাজের চুলচেরা বিশ্নেষণ করে পদক দেওয়া হবে। পদকধারীদের ব্যাপারে যাতে বিতর্ক তৈরি না হয়, সে ব্যাপারে সতর্ক রয়েছেন পুলিশের কমিটির সদস্যরা।