যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা-২

লাঙল ছেড়ে অস্ত্র হাতে কেয়ামউদ্দিন মোল্লা

প্রকাশ: ০২ ডিসেম্বর ২০১৯     আপডেট: ০২ ডিসেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

আবু সালেহ রনি

১৮ বছরের টগবগে যুবক, সাত ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় মো. কেয়ামউদ্দিন মোল্লা। একাত্তরের ফেব্রুয়ারিতেও পাবনা সদর থানার (বর্তমানে উপজেলা) দীঘিগোয়েল এলাকায় পদ্মার চরে বাবার সঙ্গে লাঙল দিয়ে চাষাবাদ করতেন তিনি। মাঠে মই দিতেন। কিন্তু এই কিশোরও উত্তাল একাত্তরের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে আরও অনেকের মতো জড়িয়ে পড়েন সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে।

দেশ স্বাধীন করতে গিয়ে ডান হাতে গুলি লেগে পঙ্গু হয়ে গেছেন কেয়ামউদ্দিন। তবুও জীবনযুদ্ধে হতাশ নন তিনি। তার বড় প্রাপ্তি লাল-সবুজের এ বাংলাদেশ। কেয়ামউদ্দিনের মতে, দেশ স্বাধীন হলেও যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি। তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযোদ্ধাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

কেয়ামউদ্দিন মোল্লার জন্ম ১৯৫৩ সালের ১০ জানুয়ারি পাবনা সদরের দীঘিগোয়েল গ্রামে। বাবা ইসারত মোল্লা কৃষক ও মা খোদেজা খাতুন গৃহিণী। তাদের ছয় ছেলে, এক মেয়ের মধ্যে কেয়ামউদ্দিন সবার বড়। চর এলাকায় কোনো স্কুল না থাকায় তিনি পড়াশোনা করেননি। তবে ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় থেকেই নিয়মিত রেডিওতে খবর ও ঘটনাপ্রবাহ শুনতেন কিশোর কেয়ামউদ্দিন। মুরব্বিদের আলোচনা থেকেও বাঙালিদের প্রতি পাকিস্তান সরকারের বৈষম্যমূলক আচরণ সম্পর্কে জানতে পারেন। ১৯৭০-এর প্রাদেশিক নির্বাচনের কিছুদিন আগে বিয়ে করেন তিনি।

কেয়ামউদ্দিন মোল্লা সমকালকে বলেন, 'গ্রামের মুরব্বিদের সঙ্গে রেডিওতে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ শুনেছিলাম। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, 'প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো।' 'এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।' এসব শুনে আমরা গ্রামের তরুণরাও বুঝতে পারি, সামনে কঠিন দিন আসছে। লড়াই করতে হবে। কয়েকদিন পরেই ২৫ মার্চ গণহত্যা শুরু করে পাকিস্তানি বাহিনী। দুগুলিয়া বাজারে ক্যাম্প বসায় রাজাকাররা। ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিল জব্বার। আর পাবনায় রাজাকারদের বড় নেতা ছিল জামায়াতে ইসলামীর নেতা মতিউর রহমান নিজামী। এই নিজামীই আলবদর বাহিনী গঠন করে গ্রামের পর গ্রামে হত্যাযজ্ঞ চালায়। পরে যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসি হয়েছে তার।'

একাত্তরের জুলাইয়ের শেষদিকে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে পাবনা ছাড়েন কেয়ামউদ্দিন। নতুন বধূ ও বৃদ্ধ মাকে কিছু না জানিয়েই যুদ্ধে যান তিনি। এ প্রসঙ্গে কেয়ামউদ্দিন বলেন, 'মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছুদিন পর পাবনায় আসে পাকিস্তানি বাহিনী। হত্যা, লুণ্ঠন ও ধর্ষণে মেতে ওঠে তারা। কিছুদিন পর দেখি, এলাকায় অনেক রাজাকার হয়েছে। আমাদের জমিতে হালচাষ করা এক কামলাও রাজাকার হয়ে গেল। আমরা কয়েকজন পোলাপান প্রতিদিন রাতে এসব নিয়ে আলাপ-আলোচনা করতাম। রাজাকাররা বেশি অত্যাচার চালাত বাঙালি হিন্দু এলাকায়। লুটপাট করত। তাদের মেয়েদের ধরে নিয়ে যেত পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে। চোখের সামনে এসব আর সহ্য করতে পারছিলাম না। বাড়িতে থেকে চাষাবাদ করতেও মন সায় দিচ্ছিল না। তখন আমরা কয়েকজন মিলে জুলাইয়ের শেষ দিকে একদিন খুব ভোরে রওনা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে রাতের মধ্যেই কুষ্টিয়া বর্ডারে চলে যাই। সঙ্গে ছিল ইয়াকুব আলী, সিদ্দিকসহ গ্রামের আরও চার-পাঁচজন। পরদিন সকালে আসি ভারতের কেচুয়াডাঙ্গা বাজারে। সেখানে মুক্তিবাহিনীতে নাম লেখাই। সেখান থেকে আমাদের পাঠানো হয় দোলঙ্গি হয়ে মালদহর গোরবাগানে। এখানে ১৩ দিন লেফট-রাইট করানো হয়। পরে সশস্ত্র যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে আমাদের মধ্য থেকে বাছাই করা কয়েকজনকে কয়েকটি টিমে ভাগ করে ট্রেনিংয়ের জন্য পাঠানো হয় শিলিগুড়ির পানিঘাটায়। আটাশ দিন এ প্রশিক্ষণ চলে। এরপর আমাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় তরঙ্গপুরের কালিয়াগঞ্জে। সেখানে আমাদের অস্ত্রও দেওয়া হয়। পরে তেত্রিশজনের একটি দলের হয়ে সীমান্ত পেরিয়ে দেশের ভেতর এসে যুদ্ধ করি। আমাদের দলের কমান্ডার ছিলেন রশিদ সরদার।'

পাবনার অন্যতম শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামী। একাত্তরে পাবনার বাউশগাড়ি, রূপসা ও ডোমরা গ্রামে নির্বিচারে হত্যা-ধর্ষণ এবং সাঁথিয়া থানার ধুলাউড়ি গ্রামে ৫২ জনকে হত্যার প্রমাণও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। একাত্তরে তার নেতৃত্বে গঠিত আলবদর বাহিনী দেশের বিভিন্ন স্থানে হত্যাযজ্ঞ চালায়। ২০১৬ সালের ১১ মে নিজামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। নিজামীর নৃশংসতার কথা জানাতে গিয়ে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা কেয়ামউদ্দিন বলেন, 'একদিন বিকেলে পাবনা শহরে অপারেশনের জন্য তথ্য সংগ্রহ (রেকি) করতে গিয়ে নিজামীকে দূর থেকে ভাষণ দিতে দেখি। এই নিজামীর নির্দেশেই আলবদর বাহিনীর হয়ে দুগুলিয়া বাজার, শ্রীকূলসহ অনেক এলাকায় হত্যাষজ্ঞ চালায় দায়েন মৌলভী। এমন সব ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ও ঘটনার পরও সাধারণ মানুষজন আমাদের সহযোগিতা করত। তথ্য সংগ্রহ বা অপারেশনের জন্য যখন যে এলাকায় যেতাম, স্থানীয়দের অনেকেই খাওয়াতেন। আশ্রয় দিতেন। তথ্য দিতেন। সেসবের ভিত্তিতেই অপারেশনগুলো করতাম। অ্যান্টি-ট্যাঙ্ক মাইন দিয়ে তখন কয়েকটি ব্রিজও গুঁড়িয়ে দিই, যাতে পাকিস্তানি সেনারা শহর থেকে গ্রামগুলোতে সরাসরি আর আসতে না পারে। এভাবেই অপারেশন করি সাত নম্বর সেক্টরের লালপুর, ভেড়ামারা, সুজানগর ও ঈশ্বরদীর বিভিন্ন এলাকায়। জীবনের মায়া না করে অপারেশন চালিয়েছি; কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটি অপারেশনে গিয়ে আজ এই পঙ্গুত্ব মেনে নিতে হয়েছে।'

সেদিনের সে ঘটনা বলতে গিয়ে কিছুটা হতবিহ্বল হয়ে যান কেয়ামউদ্দিন। তিনি দেখান- ডান হাতের কনুইয়ের নিচ দিয়ে কীভাবে গুলি লেগেছিল, যার ক্ষতচিহ্ন এখনও বয়ে বেড়াচ্ছেন। তিনি জানান, অপারেশন করে গুলি বের করা হলেও এখনও শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী উচ্চমাত্রার ব্যথা নিরোধক ওষুধ নিয়মিত খেতে হয় তাকে। দুঃসহ সেসব দিনের স্মৃতিচারণ করে কেয়ামউদ্দিন জানান, দিনটি ছিল একাত্তরের ৭ ডিসেম্বর। ওই দিন সন্ধ্যারাতে সুজানগর থানা অপারেশনের পরিকল্পনা করি আমরা। সেখানে ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও রাজাকারদের শক্তিশালী ঘাঁটি। কয়েকটি দলে আমরা তেত্রিশজন গেরিলা ছিলাম। পরিকল্পনা ছিল প্রথমে ফায়ার করবে পশ্চিম ও দক্ষিণের গ্রুপ। আমার গ্রুপ ছিল পশ্চিমে। পজিশনে যেতেই পাকিস্তানিদের নজরে পড়ে যাই। শুরু হয় গোলাগুলি। ওদের অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের কাছে টিকতে পারছিলাম না। ক্রলিং করে সামনে এগোই। পাশেই এলএমজি চালাচ্ছিলেন সহযোদ্ধা সেলিম। হঠাৎ 'চু' করে একটা শব্দ হয়। তাকিয়ে দেখি গুলি লেগেছে ওর মাথায়। শরীরে কয়েকটা ঝাঁকুনি তুলেই ও নিথর হয়ে যায়। একটু পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে পেছনে হটার নির্দেশ দেন কমান্ডার রশিদ সরদার। তখন গুলি চালিয়ে আমরা পশ্চাদপসরণ করতে থাকি। ঠিক এমন সময় দুটি গুলি এসে লাগে আমার শরীরে। একটি আমার সোয়েটারের ভেতর আটকে যায়। অন্যটি ডান হাতে ঢুকে পড়ে। হাত থেকে তিরতির করে রক্ত বেরোতে থাকে। হাত আর নাড়াতে পারছিলাম না। সহযোদ্ধারা আমাকে তুলে নিয়ে আসে। পরে গরুগাড়িতে করে নেওয়া হয় বাবুচরায়। সেখানে এক স্থানীয় চিকিৎসক গুলিটি বের করে হাত সেলাই করে দেন।'

মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধু সরকার কেয়ামউদ্দিনের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। পরে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টেও চাকরি দেন। দুই মেয়ে ও এক ছেলের জনক তিনি। ২০০৭ সালে তিনি মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট থেকে অবসরে যান। বর্তমানে নিয়মিত যুদ্ধাহত ভাতা পাচ্ছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের কাছে প্রত্যাশার কথা জানাতে গিয়ে কেয়ামউদ্দিন বলেন, 'বিভিন্ন সময় নিজের চোখে মুক্তিযোদ্ধাদের অপমানিত ও লাঞ্ছিত হতে দেখেছি। কিন্তু এখন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান দিয়েছে। যুদ্ধাহত ভাতা আগে ১৫ হাজার ছিল, সেটি এখন ৩০ হাজার করা হয়েছে। ছেলেমেয়েদের চাকরি হয়েছে। তয় শরীরে কষ্ট আছে। ছেলেমেয়েরা এ দেশে ভালো থাকুক, সম্মান পাক, মনে এর বেশি আর কোনো চাওয়া নাই।'