শান্তিচুক্তির ২২ বছর

পাহাড়ে শান্তি অধরা

আঞ্চলিক দল-উপদলের কোন্দলে ঝরছে রক্ত

প্রকাশ: ০২ ডিসেম্বর ২০১৯     আপডেট: ০২ ডিসেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

হাসনাইন ইমতিয়াজ, বান্দরবান থেকে ফিরে

ফাইল ছবি

বান্দরবানের নীলগিরিতে রাত্রিযাপন শেষে ফিরছি বান্দরবান শহরে। পথে চিম্বুক পাহাড়ে যাত্রাবিরতি। পর্যটকদের জন্য গড়ে ওঠা কয়েকটি খাবার আর তাঁতের কাপড়ের দোকান রয়েছে পাহাড়ের পাদদেশে। রাচিং মারমা নামে এক নারীর দোকান থেকে একটি চাদর কেনার পর পাশের দোকানে চা খেতে বসলাম। এ সময় সেই কাপড় বিক্রেতা পাহাড়ি নারীটি চায়ের দোকানদারকে ডাকল- 'রফিক কাকা এক কাপ লাল চা দাও।' ডাকের মধ্যে একটা আন্তরিকতা ছিল। ছিল সম্প্রীতির ছোঁয়া, যা পাহাড়ে বিরল। এমন সম্প্রীতি ও সৌহার্দের পরিবেশের জন্যই ২২ বছর আগে সংঘাতময় পার্বত্য চট্টগ্রামে সম্পাদিত হয়েছিল শান্তিচুক্তি। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত শান্তি পাহাড়ে আজও অধরা। প্রতিনিয়ত রক্তাক্ত হচ্ছে পাহাড়। গত ছয় বছরে বিভিন্ন আঞ্চলিক দল ও উপদলের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার এবং রাজনৈতিক ও জাতিগত বিরোধে খুন হয়েছেন ৩২১ জন। সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, শান্তিচুক্তির অধিকাংশ ধারা বাস্তবায়িত হয়েছে। কিন্তু পাহাড়ের আঞ্চলিক দলগুলোর বিরোধিতা ও অসহযোগিতা, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার ও চাঁদাবাজির কারণে চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। বিপরীতে তিন পার্বত্য জেলায় তৎপর আঞ্চলিক দলগুলোর দাবি, সরকার চুক্তি করলেও তা বাস্তবায়নে আন্তরিক নয়। প্রয়োজনীয় বিধিবিধান প্রণয়ন ও স্থানীয় প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর ক্ষেত্রে গড়িমসি করছে। এতে পাহাড়ের অধিবাসীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। শান্ত হচ্ছে না পরিবেশ। পার্বত্য জেলায় বসবাসরত বাঙালিদের দাবি, তারা নূ্যনতম নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। শিক্ষা-দীক্ষা, চাকরি ও ব্যবসার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সুযোগ মিলছে না। শান্তিচুক্তির পর সরকার রাস্তাঘাটের উন্নয়ন,  স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবার সম্প্রসারণ, শিক্ষাব্যবস্থার প্রসার ও ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলোর স্বতন্ত্র সংস্কৃতি রক্ষায় নানা উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু পরিবেশ শান্ত না হওয়ায় এর সুফল মিলছে না। পর্যটনের সম্ভাবনা বাড়ছে না বরং দিন দিন কমছে। পরিবর্তন আসছে না সাধারণ পাহাড়ি ও বাঙালিদের জীবনে। সম্প্রতি বান্দরবান ঘুরে এমন চিত্র চোখে পড়েছে।

বান্দরবান শহর থেকে রুমা যাওয়ার পথে ওয়াইজংশন নামে একটি স্থানে গাড়ি থামিয়ে স্বাদ নেই পাহাড়ের সুমিষ্ট কলা ও পেঁপের। ফল খেতে খেতে কথা হয় বিক্রেতা তংচং মুরংয়ের সঙ্গে। তিনি বলেন, তার দুই সন্তান ঢাকায় পড়াশোনা করছে। শান্তিচুক্তির পর এ ধরনের সুযোগ বেড়েছে। কিন্তু সাধারণ জনগণের জীবনযাত্রার মানের খুব বেশি পরিবর্তন আসেনি। এর পেছনে রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা দায়ী। পাশেই জুমের সবজি বিক্রি করতে আসা একজন হতদরিদ্র বৃদ্ধা যিনি চাকমা সম্প্রদায়ের। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, পাহাড়ে চাঁদা একটি বড় সমস্যা। যে কোনো কাজের জন্য চাঁদা দিতে হয়। কারা এই চাঁদা তোলে- এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে চাননি এই পাহাড়ি বাসিন্দা। তবে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সুফল পাহাড়ের আনাচে-কানাচে যে পৌঁছেছে তা চোখে পড়েছিল বছর দুয়েক আগে বান্দরবানের থানচি উপজেলার দুর্গম থুসাইপাড়ায় গিয়ে। থানচি সদর থেকে নদী ও পাহাড়ি পথে থুসাইপাড়া যেতে লেগেছে প্রায় ছয় ঘণ্টা। এত দুর্গম অঞ্চলেও সোলার ও মোবাইল নেটওয়ার্ক চোখে পড়েছিল সেই সময়।

শান্তিচুক্তির পর কেমন আছেন- জানতে চাইলে বান্দরবান জেলার আওয়ামী লীগের সদস্য সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী মো. মজিবর রহমান বলেন, আঞ্চলিক পাহাড়ি দলগুলোর চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের কারণে তারা ভালো নেই। রেশন ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে বাঙালিরা সরকারের তেমন সহযোগিতা পান না। ফলে শিক্ষাদীক্ষা ও কর্মসংস্থানে তারা পিছিয়ে পড়ছে।

বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ক্য শৈ হ্লা বলেন, পাহাড়ে বড় সমস্যা অবৈধ অস্ত্র ও ভূমি জটিলতা। পাহাড়ের বিভিন্ন গোষ্ঠী নিজেদের আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির জন্য অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার করছে। তারা অপরাধী। শান্তিচুক্তি হলেও সংগঠনগুলো এখনও অস্ত্র জমা দেয়নি। বান্দরবান জেলা আওয়ামী লীগের এই সভাপতি বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের শান্তির জন্য অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করা উচিত।

গোয়েন্দা সূত্রগুলোর দাবি, পার্বত্য চারটি আঞ্চলিক সংগঠন- জনসংহতি সমিতি (জেএএসএস-মূল), ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ-মূল), জেএসএস (সংস্কার) ও ইউপিডিএফের (গণতান্ত্রিক) কাছে চার হাজারের বেশি অস্ত্র রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ৫৪টি রকেট লঞ্চার, ৬৪১টি এসএমজি ও বিভিন্ন ধরনের রাইফেল ৫৯৪টি ও চার শতাধিক দেশি পিস্তল ও বন্দুক। এ ছাড়া হাত বোমা ও মর্টার শেল রয়েছে কয়েকশ'। গোয়েন্দাদের দাবি জেএসএস (মূল) এবং ইউপিডিএফের (মূল) কাছে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র রয়েছে। এ সংগঠনগুলো বছরে ৪০০ কোটি টাকার ওপরে চাঁদা তোলে। ঠিকাদারি ব্যবসা, জিপ চালানো, নৌকা, ট্রলার, বনের কাঠ, পাথর উত্তোলন থেকে শুরু করে সব ধরনের ব্যবসা ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম থেকে চাঁদা তোলা হয়। পাহাড়ে বিভিন্ন সংঘাতে গত ছয় বছরে ৩২১ জন খুন হয়েছেন। এর মধ্যে ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীর ২০৭ জন এবং বাঙালি ১১৪ জন। এর মধ্যে ২০১৪ সালে ৫৪ জন, ২০১৫ সালে ৬৯ জন, ২০১৬ সালে ৪১ জন, ২০১৭ সালে ৩৩ জন, ২০১৮ সালে ৬৮ জন এবং ২০১৯ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ৫৬ জন খুন হয়েছেন। সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে ২০১৮ সালে। সে বছরের ৩ মে ইউপিডিএফের (মূল) হামলায় জেএসএস (সংস্কার) সমর্থক নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমা নিহত হন। একদিন পর শক্তিমান চাকমার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে ইউপিডিএফ (মূল) হামলা চালিয়ে ইউপিডিএফের (গণতান্ত্রিক) প্রধান তপন জ্যোতি চাকমাসহ পাঁচজনকে হত্যা করে।

এ বিষয়ে বান্দরবান জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জাকির হোসেন মজুমদার বলেন, তিন পার্বত্য জেলার তুলনায় বান্দরবান শান্তিপূর্ণ হলেও পাহাড়ি আঞ্চলিক কিছু সংগঠনের কারণে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হচ্ছে। বিশেষ করে জাতীয় রাজনীতির বিরোধিতা, চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে সংঘাত হচ্ছে। খুনের ঘটনা ঘটছে। আঞ্চলিক দলগুলো নিজেদের বিরোধে গত তিন মাসে প্রায় আটজন নিহত হয়েছেন।

ইউপিডিএফের (গণতান্ত্রিক) প্রধান শ্যামল কান্তি চাকমা সমকালকে বলেন, তাদের কাছে অস্ত্র নেই। শান্তিচুক্তির পর কারও কাছে অস্ত্র থাকার কথা নয়। কিন্তু জেএসএস ও ইউপিডিএফের (মূল) কাছে ভারী অস্ত্র রয়েছে। তার পরও আমরা সাধারণ পাহাড়ি জনগণকে সঙ্গে নিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করে যাচ্ছি। পাহাড়ি বাঙালি ভাই ভাই। সবাই মিলে পাহাড়ের উন্নয়নে কাজ করতে চাই। তিনি বলেন, সরকার শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে আন্তরিক। কিন্তু সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর বাধায় পারছে না।

জানতে চাইলে জেএসএসের (মূল) জয়েন সেক্রেটারি কেএস মং মারমা মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। বান্দরবান সার্কেল চিফ বোমাং রাজা উ চ প্রু চৌধুরীর সঙ্গে দেখা করতে তার বান্দরবানের বাসভবনে একাধিকবার গেলেও দেখা মেলেনি।

তবে মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল সমকালকে বলেন, পাহাড়ে যে অস্থিরতা চলছে, তার জন্য সরকার দায়ী। তারা সময়মতো শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না করায় পাহাড়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। সরকার শান্তিচুক্তির বাস্তবায়ন নিয়ে নানা কৌশল অবলম্বন করছে। এতে পাহাড়ের জনগণের মনে আস্থা ফিরছে না। সুলতানা কামাল বলেন, মূলত তিনটি কারণে শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন আটকে আছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে- ভূমি কমিশনের অকার্যকারিতা, পাহাড়ের সামরিক উপস্থিতি কমিয়ে না আনা এবং স্থানীয় সরকার নির্বাচন করতে না পারা।

তবে স্থানীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা বলছেন, আঞ্চলিক দলগুলোর অসহযোগিতার কারণে জেলা পরিষদগুলোতে নির্বাচন হচ্ছে না। সূত্র বলছে, আঞ্চলিক দলগুলো মূলধারার রাজনৈতিক দল যেমন- আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে অংশ নিতে দিচ্ছে না স্থানীয় পাহাড়ি জনগণকে। গত কয়েক মাসে আওয়ামী লীগের অনেক পদধারী নেতাকে খুন করেছে পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠনগুলো। এ ছাড়া তাদের হুমকিতে বিভিন্ন পর্যায়ের শতাধিক আওয়ামী লীগ নেতা দল থেকে পদত্যাগ করেছেন।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং সমকালকে বলেন, শান্তিচুক্তি হলেও এই আইন বাস্তবায়নে যেসব বিধিমালা করা দরকার, সেসব প্রণয়ন করা হচ্ছে না। ফলে স্থানীয় সরকার কাঠামো, আঞ্চলিক পরিষদ, ভূমি কমিশনসহ বিভিন্ন উদ্যোগ কার্যকর হচ্ছে না। তিনি বলেন, পাহাড়ে যেসব বাঙালি রয়েছে, তাদের অধিকাংশ মানবেতর জীবনযাপন করছে। এ বিষয়ে সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। তারাও এ দেশের নাগরিক। তাদের সম্মানের সঙ্গে বাঁচার অধিকার রয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘ দুই দশক ধরে চলা সংঘাত নিরসনে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত হয় শান্তিচুক্তি। জাতীয় সংসদের তৎকালীন চিফ হুইপ আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ ও জেএসএস সভাপতি সন্তু লারমা চুক্তিতে সই করেছিলেন। রাজধানীতে স্বাক্ষরিত ওই চুক্তিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও উপস্থিত ছিলেন। এই চুক্তির বিরোধিতা করে পাহাড়ে স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে ১৯৯৮ সালে গড়ে ওঠে আঞ্চলিক দল ইউপিডিএফ। এই দু'দল ভেঙে গড়ে উঠেছে ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক (২০১৭ সালে) এবং জেএসএস-সংস্কার (২০০৭ সালে)।