আদালতে বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রতিবেদন

ওয়াসার পানিতে মলের জীবাণু

প্রকাশ: ০২ ডিসেম্বর ২০১৯     আপডেট: ০৩ ডিসেম্বর ২০১৯      

সমকাল প্রতিবেদক

ফাইল ছবি

'ওয়াসার পানি শতভাগ সুপেয় ও বিশুদ্ধ'- ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাকসিম এ খানের এমন দাবি সঠিক নয়। হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত চার সদস্যের বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াসার পানিতে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ও মলের জীবাণুর অস্তিত্ব মিলেছে। এ জন্য প্রতিবেদনে কয়েক দফা সুপারিশও তুলে ধরা হয়েছে।

সোমবার বিশেষজ্ঞ কমিটির পক্ষ থেকে অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে এই প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলম সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে এই প্রতিবেদন চলতি সপ্তাহে উপস্থাপন করা হবে। বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, সুপেয় পানি নিশ্চিতের জন্য ঢাকা ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

এটি হলে ওয়াসার লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ব্যাকটেরিয়া কিংবা জীবাণু পানিতে মিশতে পারবে না। সুপেয় পানির জন্য তৃতীয় পক্ষকে দিয়ে পুরো বিষয়টি নজরদারি করাতে হবে। সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো ও বাসাবাড়ির রিজার্ভ ট্যাঙ্ক নিয়মিত পরিস্কার রাখতে হবে। এছাড়াও ওয়াসার পানি সরবরাহের ক্ষেত্রে সব ধরনের অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার সুপারিশ করা হয়েছে।

হাইকোর্টের সংশ্নিষ্ট বেঞ্চের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নুর-উস-সাদিক এ বিষয়ে সাংবাদিকদের জানান, বিশেষজ্ঞ কমিটি তাদের প্রতিবেদনে চারটি সুপারিশ তুলে ধরেছে। প্রতিবেদনটি চলতি সপ্তাহে হাইকোর্টে উপস্থাপন করা হবে। এরপর কার্যতালিকা অনুসারে শুনানি হতে পারে। অন্যদিকে রিটকারী আইনজীবী তানভীর আহমেদ এ বিষয়ে সাংবাদিকদের বলেন, সারা বছরই এ রিট আবেদনটি চলমান থাকা উচিত। তাহলে সুপেয় পানি নিশ্চিতের সুযোগ তৈরি হবে।

এ বিষয়ে ওয়াসার এমডিকে পাইপলাইনের পানি দিয়ে শরবত পান করাতে গিয়ে আলোচনায় আসা জুরাইনের বাসিন্দা মিজানুর রহমান সোমবার সমকালকে বলেন, ওয়াসার পানির মান যে খারাপ এটা প্রমাণ করার জন্য বিশেষজ্ঞ কমিটি করার প্রয়োজন নেই। এটা ঢাকা শহরের সবাই জানেন। তারপরও বিশেষজ্ঞ কমিটির এই প্রতিবেদন ওয়াসার কানে গেলে তাদের যদি শুভবুদ্ধির উদয় হয়, সেটা ভালো। এ প্রসঙ্গে সোমবার ঢাকা ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খানের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।

রাজধানীবাসীর জন্য সুপেয় পানির একমাত্র জোগানদাতা ওয়াসা। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, তাদের সরবরাহ করা পানি সুপেয়। কিন্তু ২০১৮ সালের ১২ অক্টোবর 'অনিরাপদ পানি পান করছে সাড়ে সাত কোটি মানুষ' শিরোনামে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে ওই বছরের ১৪ অক্টোবর আদালতে রিট করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তানভীর আহমেদ। ওই বছরের ৬ নভেম্বর হাইকোর্ট রুল জারির নির্দেশ দেন এবং ওয়াসার পানির মান পরীক্ষায় চার সদস্যের কমিটি গঠন করতে বলেন। গত ১৮ এপ্রিল স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিবকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের কমিটি গঠন করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। কমিটিতে স্থানীয় সরকার প্রশাসন, বুয়েটের ব্যুরো অব রিসার্চ টেস্টিং অ্যান্ড কনসালটেশন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসি ও বায়োলজিক্যাল সায়েন্স বিভাগ ও আইসিডিডিআরবি'র প্রতিনিধিকে রাখা হয়। কমিটিকে দুই মাসের মধ্যে ঢাকা ওয়াসার পানির মান পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দিতে বলেন আদালত।

গত ৩১ জুলাই ওয়াসার পক্ষ থেকে আদালতে একটি প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। ওই প্রতিবেদনে ওয়াসা দাবি করে, যেসব এলাকায় খারাপ পানি প্রাপ্তির কথা বলা হয়েছে সেই মিরপুর ও পাতলা খান লেনের পানিতে ফিকেল কলিফর্ম ও ইকোলাই ব্যাক্টেরিয়া পাওয়া যায়নি।

এ অবস্থায় বিচারপতি জে বি এম হাসান ও বিচারপতি মো. খায়রুল আলমের বেঞ্চ পানির বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মতামত চান। ২০১৯ সালের ২৩ অক্টোবরের মধ্যে আদালতে বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন। ওই বিশেষজ্ঞ কমিটিতে বুয়েটের ব্যুরো অব রিসার্চ টেস্টিং অ্যান্ড কনসালটেশন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসি ও বায়োলজিক্যাল সায়েন্স বিভাগ ও আইসিডিডিআরবি'র প্রতিনিধিকে রাখা হয়। বিশেষজ্ঞ কমিটি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য একদফা সময় বাড়িয়ে গতকাল এ প্রতিবেদন আদালতে জমা দেয়।

এদিকে গত ১৭ এপ্রিল ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) 'ঢাকা ওয়াসা :সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়' শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। টিআইবি জানায়, ঢাকা ওয়াসার পানি নিম্নমানের হওয়ায় ৯৩ শতাংশ গ্রাহক বিভিন্ন পদ্ধতিতে পানি বিশুদ্ধ করে পানের উপযোগী করেন। এর মধ্যে ৯১ শতাংশ গ্রাহকই পানি ফুটিয়ে বা সিদ্ধ করে পান করেন। গৃহস্থালি পর্যায়ে পানি ফুটিয়ে পানের উপযোগী করতে প্রতিবছর ৩৩২ কোটি টাকার জ্বালানি গ্যাসের অপচয় হয়।

গত ২০ এপ্রিল ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাকসিম এ খান সংবাদ সম্মেলন করে টিআইবির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, 'ওয়াসার পানি শতভাগ সুপেয় ও বিশুদ্ধ। ওয়াসার পানি ফুটিয়ে খাওয়ার প্রয়োজন হয় না।' এছাড়া টিআইবির ওই প্রতিবেদনকে তিনি নিম্নমানের বলেও উল্লেখ করেন।

ওয়াসার এমডির এমন বক্তব্যের প্রতিবাদে গত ২৩ এপ্রিল জুরাইনের বাসিন্দা মিজানুর রহমান পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কারওয়ানবাজারে ওয়াসা ভবনে হাজির হন। তিনি এমডিকে ওয়াসার পানি দিয়ে শরবত বানিয়ে খাওয়ানোর জন্য ওয়াসা ভবনে হাজির হন। ওই সময় এমডি অফিসে ছিলেন না। মিজানুর রহমান বলেন, ওয়াসার পানি দিয়ে তৈরি শরবত খেতে হবে। অন্যথায় মিথ্যা বলার কারণে তাকে ক্ষমা চাইতে হবে। বিকেল পর্যন্ত এমডি অফিসে উপস্থিত না হলে তিনি হতাশ হয়ে ওয়াসা ভবন ছাড়েন। এ নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়।

গত ৭ জুলাই বিশেষজ্ঞ কমিটি আদালতে ঢাকা ওয়াসার ১০টি বিতরণ জোনের ৩৪টি নমুনার মধ্যে আটটি পানির নমুনায় মলের অস্তিত্ব ও ব্যাক্টেরিয়াজনিত দূষণ রয়েছে বলে উল্লেখ করে। এ অবস্থায় আদালত বিশেষজ্ঞ কমিটিকে আরও বৃহৎ পরিসরে নমুনা পরীক্ষা করে পৃথক প্রতিবেদন দেওয়ার কথা বলেন। গতকাল আদালতে বিশেষজ্ঞ কমিটির পক্ষ থেকে সেই প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়।