দূতাবাসে এসপি পদায়নে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের 'না'

৪০টি পদ চেয়েছিল পুলিশ সদর দপ্তর, নতুন করে প্রস্তাব দেওয়ার চিন্তাভাবনা

প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০১৯     আপডেট: ০৩ ডিসেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

আতাউর রহমান

ফাইল ছবি

বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ৪০টিতে লিয়াজোঁ অফিসার হিসেবে পুলিশ সুপারদের (এসপি) পদায়ন চায় পুলিশ সদর দপ্তর। এর যৌক্তিকতা তুলে ধরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবও পাঠানো হয়। যাচাইয়ের পর মতামতের জন্য সেই প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রস্তাবটি 'বাস্তবসম্মত নয়' জানিয়ে তা নাকচ করে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠিয়েছে। অবশ্য পুলিশ সদর দপ্তর আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর একই বিষয়ে নতুন করে প্রস্তাব পাঠানোর চিন্তা করছে। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে এসব তথ্য মিলেছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা সমকালকে জানিয়েছেন, বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোতে নিয়োগ পেতে কয়েক বছর ধরেই পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি তোলা হচ্ছিল। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মতবিনিময় সভায়ও পুলিশের এক কর্মকর্তা দূতাবাসে প্রেষণে পুলিশ কর্মকর্তাদের পদায়নের যুক্তি তুলে ধরেছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ওই প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল।

গত শুক্রবার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারীও দূতাবাসগুলোতে প্রেষণে পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়োগের যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, 'মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আমাদের নারী শ্রমিকরা ফিরে আসছে। সেসব দেশে নিরাপত্তার জন্য দূতাবাসগুলোতে পুলিশ কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হলে সেখানে আমাদের নারীদের সুরক্ষায় সচেষ্ট হতে পারব।'

অবশ্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পুলিশ ও এনটিএমসি) নুরুল ইসলাম সমকালকে বলেছেন, পুলিশ সদর দপ্তরের প্রস্তাবটি যাচাই করে মতামতের জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছিল। সেখান থেকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। এখন ওই প্রস্তাবটি ফের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে।

পুলিশ সদর দপ্তরের অর্গানাইজেশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট শাখার অতিরিক্ত ডিআইজি এস এম আক্তারুজ্জামান বলেন, তারা বাস্তবতার নিরিখে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব দিয়েছিলেন। প্রস্তাবটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সংশ্নিষ্ট হওয়ায় তাদের মতামত ছাড়া কিছু করা সম্ভব নয়।

পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রস্তাবটি অনুমোদন হলে পুলিশ সদর দপ্তরের সাংগঠনিক কাঠামোতে একজন অতিরিক্ত আইজিপি, দু'জন ডিআইজি ও ৪০টি এসপির পদসহ বিভিন্ন পদবির সহায়ক ১৪১টি নতুন পদ সৃষ্টি করতে হতো। এতে এসপি পদে পদোন্নতি জটিলতাও কেটে যেত।

যে কারণে দূতাবাসে পদ চায় পুলিশ: আইজিপি ডিএনসিসির অনুষ্ঠানে বক্তব্যে শুধু প্রবাসী নারীদের নিরাপত্তায় দূতাবাসগুলোতে পুলিশ নিয়োগের বিষয়ে আলোকপাত করেন। অবশ্য পুলিশ সদর দপ্তরের প্রস্তাবনায় দূতাবাসে পুলিশ নিয়োগের যৌক্তিকতা বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। এতে বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স আহরণের কথা উল্লেখ করে বলা হয়- মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ভারত, কানাডা, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, জাপানসহ বিভিন্ন দেশে বিপথগামী কিছু প্রবাসী আইনশৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে। এতে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণসহ বৈদেশিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রতি নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে পুলিশ কর্মকর্তা পদায়ন করা হলে ওই সব দেশে অবস্থিত বাংলাদেশি প্রবাসীদের নিরাপত্তা প্রদান, পাসপোর্ট, অভিবাসনসহ বিভিন্ন সেবা দিতে পুলিশ কর্মকর্তা পদায়ন খুবই যৌক্তিক। প্রস্তাবনায় আরও বলা হয়, বাংলাদেশে অপরাধ করে অনেকে বিদেশে পালিয়ে থাকে। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোতে পুলিশ কর্মকর্তার পদ থাকলে ওই কর্মকর্তা এসব বিষয়ে সরাসরি সংশ্নিষ্ট দেশের পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন। প্রস্তাবনায় এও উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশের শ্রমিক ও প্রবাসীরা অনেক ক্ষেত্রে বিদেশে যাওয়ার পর সংশ্নিষ্ট দেশের পুলিশি প্রক্রিয়ার সম্মুখীন হন। সে ক্ষেত্রে দূতাবাসের পুলিশ লিয়াজোঁ অফিসারের মাধ্যমে সংশ্নিষ্ট দেশের পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে সহজে সমাধান করা যাবে। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলা, যুদ্ধাপরাধী মামলা এবং জেলহত্যা মামলার অনেক আসামি বিদেশে পালিয়ে রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ১৯টি রেড নোটিশ জারি থাকলেও ইন্টারপোল কোনো দেশকে অপরাধী প্রত্যাবর্তনে বাধ্য করতে পারে না। তাই দূতাবাসে পুলিশ কর্মকর্তা অবস্থান করলে সংশ্নিষ্ট দেশগুলোর পুলিশ বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ, আসামি গ্রেপ্তার ও প্রত্যাবর্তনে সুবিধা হবে।

প্রস্তাবনার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে পুলিশের একজন কর্মকর্তা বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অপরাধের ধরন বদলানোর কারণে ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম সংঘটিত হচ্ছে। সাইবার অপরাধ, মানব পাচার, যুদ্ধাপরাধ, মানি লন্ডারিং এবং মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান চক্রের বিভিন্ন অপরাধ নির্মূল করার লক্ষ্যে দূতাবাসগুলোতে পুলিশের একজন লিয়াজোঁ অফিসারের পদ সৃষ্টি করা যুক্তিযুক্ত।

ওই কর্মকর্তা বলেন, বিদেশে বাংলাদেশি পাসপোর্ট ইস্যুর ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন বা পুলিশ ক্লিয়ারেন্স দরকার হয়। প্রবাসে পাসপোর্টের আবেদন করা হলে তা তদন্তের জন্য দূতাবাস থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আসে। সেখান থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আসার পর তা পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চে (এসবি) পাঠানো হয়। এতে সময়ক্ষেপণের পাশাপাশি প্রবাসীরা হয়রানির শিকার হন। দূতাবাসে পুলিশ লিয়াজোঁ অফিসারের পদ থাকলে পুলিশ কর্মকর্তা সরাসরি তা ঢাকায় এসবির কাছে পাঠাতে পারবেন। এতে প্রবাসীদের পাসপোর্ট-সংক্রান্ত জটিলতাও কমে আসবে।

যে ৪০ দেশের দূতাবাসে পদ চাওয়া হয়: পুলিশ সদর দপ্তরের প্রস্তাবনায় দেখা যায়, কুয়েত, সৌদি আরব, ওমান, কাতার, মিসর, বাহরাইন, আরব আমিরাত, ব্রুনাই, ভারত, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, ভিয়েতনাম, নেপাল, জর্ডান, ইরাক, আফগানিস্তান, যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া, নেদারল্যান্ডস, দক্ষিণ আফ্রিকা, তুরস্ক, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, গ্রিস, স্পেন, মরিশাস, সুইডেন, লিবিয়া ও মরক্কো- এ দেশগুলোতে পদ চাওয়া হয়েছে।

যে কারণে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের না: পুলিশের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে পরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে স্বরাষ্ট্রে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, বিদেশের মাটিতে বসে পুলিশি কার্যক্রম চালানো বাস্তবসম্মত নয়। প্রবাসীদের পাসপোর্ট তদন্ত সহজীকরণের বিষয়ে পুলিশের বিশেষ শাখার সক্রিয়তা ও সমন্বয় জরুরি বলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মত দিয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কেউ কথা বলতে রাজি না হলেও সংশ্নিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দূতাবাস বা মিশনে পুলিশের জন্য লিয়াজোঁ অফিসারের কোনো পদ নেই। পুলিশ যে প্রস্তাব দিয়েছে, তা বাস্তবতার নিরিখে হয়নি। বিদেশে পলাতক খুনি ও আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য লিয়াজোঁ অফিসার থাকাও বাস্তবসম্মত নয়। কারণ, সরকারের বিধি অনুযায়ী বিদেশ থেকে যে কোনো অপরাধীকে ফেরত আনার বিষয়ে কূটনৈতিক তৎপরতাসহ যাবতীয় কার্যসম্পাদনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দায়িত্বপ্রাপ্ত।

অবশ্য পুলিশ সদর দপ্তরের অর্গানাইজেশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট শাখার অতিরিক্ত ডিআইজি এস এম আক্তারুজ্জামান বলেছেন, ঢাকায় বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে পুলিশ দায়িত্ব পালন করছে। কিন্তু বাংলাদেশ দূতাবাসে ওই ধরনের পদ না থাকায় তাদের দেওয়া প্রস্তাবটি একেবারেই নতুন। এ জন্য এটি হয়তো হঠাৎ করেই হবে না। প্রস্তাবটির বিষয়ে নতুন করে চিন্তাভাবনা করা হবে।