ক্ষতিপূরণ পেতে এ কী কাণ্ড!

প্রকাশ: ০৫ ডিসেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

ইন্দ্রজিৎ সরকার

এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের জন্য রাজধানীর কিছু স্থানে রেললাইন-সংলগ্ন জমি অধিগ্রহণ করেছে সরকার। সেজন্য উপযুক্ত ক্ষতিপূরণও দেওয়া হয় জমি মালিকদের। বিপুল অঙ্কের এই ক্ষতিপূরণ পেতে অচিন্তনীয় কাণ্ড করে বসেছেন মগবাজারের পেয়ারাবাগ এলাকার দুই বাসিন্দা। তারা জাল দলিল তৈরি করে অন্যের জমি নিজের বলে দাবি করেন। ক্ষতিপূরণের টাকাও প্রায় পেয়ে যাচ্ছিলেন। শেষ মুহূর্তে মূল মালিক বিষয়টি জানতে পারেন। এ নিয়ে মামলা হলে তদন্তে জালিয়াতির বিষয়টি প্রমাণিত হয়। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের সদর রেকর্ডরুমে কর্মরত তিন কর্মকর্তাও এতে জড়িত বলে তদন্তে বেরিয়ে আসে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ঢাকা মহানগর উত্তরের পরিদর্শক কামাল হোসেন সমকালকে বলেন, আদালত পিবিআইকে মামলাটি তদন্তের নির্দেশ দেন। এ সময় বিতর্কিত দলিলটি যাচাই করতে গেলে রেজিস্ট্রি অফিসের সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা বালাম বই ও ইনডেক্স দেখাতে পারেননি। তাদের সহায়তায় জাল দলিল তৈরি হয় বলে তদন্তে প্রতীয়মান হয়েছে। দলিলে আঙুলের ছাপটিও (টিপসই) ভুয়া। তাই জমির মালিক দাবিকারী দু'জনসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে সম্প্রতি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।

তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা জানান, মামলার বাদী শাহানারা বেগমের মা মঞ্জু বেগম ১৯৯৬ সালে মেয়েকে দেড় কাঠা বা ২৪৭.৫০ অযুতাংশ জমি দান করেন। বড় মগবাজারের পেয়ারাবাগ এলাকার ৫৮৩ নম্বর হোল্ডিংয়ের ওই জমিতে এখনও বসবাস করছেন শাহানারা। ২০১১ সালে তিনি জানতে পারেন, রেকর্ডপত্রে তার মালিকানাধীন জমির মধ্যে ২০০ অযুতাংশের তথ্য থাকলেও ভুলবশত বাকিটা উল্লেখ করা হয়নি। ফলে বাকি জমির দখলস্বত্বের জন্য তিনি মামলা করেন। এর মধ্যে ২০১৭ সালে তার প্রতিবেশী শরীফ উদ্দিন ও সুলতানা বেগম একটি দলিল আদালতে উপস্থাপন করেন। তাতে শাহানারার জমির একাংশের মালিক হিসেবে তাদের নাম রয়েছে। ওই দলিলকে জাল আখ্যা দিয়ে শাহানারার পক্ষ থেকে মামলা করা হয়।

পিবিআইর তদন্তে দেখা যায়, মায়ের সূত্রে পাওয়া দেড় কাঠা জমি নামজারি করে নিয়মিত খাজনা পরিশোধ করে আসছেন শাহানারা।

এদিকে ঢাকা সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের টিআই বালাম বই নম্বর-১/৭৪-এর ৪০ নম্বর পৃষ্ঠায় ২৪৯ নম্বর দলিলে দাতা হিসেবে সবুরন নেছা বিবির টিপসই আছে। সই নেওয়ার তারিখ ১৯৭৪ সালের ২ জানুয়ারি। তবে টিপসইটি মূল বা প্রামাণ্য সইয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাছাড়া সেখানে সবুরন নেছাকে শনাক্তকারী হিসেবে জনৈক শহিদুল্লাহর স্বাক্ষর রয়েছে। তার স্বাক্ষরও সম্প্রতি নেওয়া হয়েছে বলে মত দেন সিআইডির বিশেষজ্ঞরা। অতএব, এটা প্রতীয়মান হয়, বিতর্কিত দলিলটির অস্তিত্ব না থাকা সত্ত্বেও বিবাদীরা শাহানারার জমি দখলের বিষয়টি ধামাচাপা দিতে জাল দলিলের সার্টিফায়েড কপি তৈরি করেন।

তদন্তে আরও জানা যায়, ওই জমির কিছু অংশ এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের জন্য হুকুম দখল হওয়ায় এবং ক্ষতিপূরণের টাকা শরীফ উদ্দিন ও তার মায়ের নামে বরাদ্দ হওয়ায় আপত্তি করেন বাদী। অন্যদিকে বিবাদীপক্ষ অনৈতিকভাবে ক্ষতিপূরণের টাকা পেতে জাল দলিলের সার্টিফায়েড কপি তৈরি করে জমির মালিকানা নিজেদের নামে দেখানোর চেষ্টা চালান।

মামলার বাদী শাহানারার স্বামী আবদুর রহিম জানান, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের জন্য ওই এলাকায় মোট ১০৫ অযুতাংশ জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এর ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৭৬ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয় সরকার। এর মধ্যে তার প্রাপ্য প্রায় ৩৬ লাখ টাকা। জাল দলিল দেখিয়ে সেই টাকা নেওয়ার পাঁয়তারা করেন শরীফ উদ্দিন। তবে পুলিশের তদন্তে তাদের জালিয়াতির বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে।

তদন্ত কর্মকর্তা জানান, সার্বিক তদন্তে বাদীর জমি দখলের উদ্দেশ্যে ভুয়া দলিলের সার্টিফায়েড কপি তৈরি এবং তা ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারি ক্ষতিপূরণের টাকা আত্মসাতের চেষ্টার প্রমাণ মিলেছে। বিবাদী শরীফ উদ্দিন ও সুলতানা বেগমকে এ অপকর্মে সহায়তা করেন তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের সদর রেকর্ডরুমের মোহরার মোশারফ হোসেন, নকলনবিশ শাহিনা খানম ও তুলনাকারী বীথি আক্তার।