যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা-৬

ওসি বাবার থানার অস্ত্র লুট করেন জুয়েল

প্রকাশ: ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

আবু সালেহ রনি

মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই টাঙ্গাইলের বিভিন্ন থানায় বাঙালিদের ওপর নৃংশস গণহত্যা শুরু করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। মধুপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ছিলেন আবদুল মালেক। যুদ্ধ করার জন্য এই কর্মকর্তার কাছেই থানার সব অস্ত্র চেয়ে বসেন তার দ্বিতীয় ছেলে মাহমুদ পারভেজ জুয়েল। বাবা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন, 'যুদ্ধ তো এখনও শুরু হয়নি। কী হয় আগে দেখো।' কিন্তু নাছোড়বান্দা জুয়েল বাবাকে স্পষ্ট জানিয়ে দেন, থানা লুট করবেন তার বন্ধুরা। এরপর মধুপুর থানা লুট করে পাওয়া ১৭টি থ্রি নট থ্রি রাইফেল নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন তারা।

শুধু জুয়েল নন, আবদুল মালেকের অন্য দুই ছেলে মাসুদ পারভেজ (চিত্রনায়ক সোহেল রানা) ও কামাল পারভেজও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। তবে যুদ্ধে গুরুতর আহত হন জুয়েল। পাকিস্তানি বাহিনীর গুলি তার ডানহাতের কবজির নিচ দিয়ে হাড় ভেঙে, মুখ দিয়ে ঢুকে, বাঁ গালের হাড় উড়িয়ে দিয়ে বেরিয়ে যায়। মাহমুদ পারভেজ জুয়েলের গ্রামের বাড়ি বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার দেহেরগতি গ্রামে। তার জন্ম ১৯৫২ সালের ১ মার্চ টাঙ্গাইলের গোপালপুরে। মা দিলারা বেগম ছিলেন গৃহিণী। পাঁচ ভাই, এক বোনের মধ্যে জুয়েল তৃতীয়। একাত্তরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকাবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের (অনার্স) শিক্ষার্থী ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার প্রেক্ষাপট বলতে গিয়ে মাহমুদ পারভেজ বলেন, 'বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সংগঠন ছাত্রলীগ করার কারণেই মূলত রাজনীতি সম্পর্কে এই সচেতনতা এসেছিল। তখন আমি ফজলুল হক মুসলিম হলের ছাত্রলীগের স্পোর্টস সেক্রেটারি। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণ শুনতে আমরা বন্ধুরা সবাই মিলে রেসকোর্সে গিয়েছিলাম। ভাষণ শোনার পর থেকেই আমরা আন্দোলন-সংগ্রামের প্রস্তুতি নিতে শুরু করি। বড় ভাই সোহেল রানাও ছাত্রলীগ করতেন। তাই আমাদের নিয়ে বাবা-মা দুশ্চিন্তা করতেন। এমন পরিস্থিতিতে ১৭ মার্চ আমাকে মধুপুরে বাবা-মায়ের কাছে চলে যেতে হয়। পরে সেখান থেকেই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম।'

একাত্তরের ২৫ মার্চ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গণহত্যা শুরু করে পাকিস্তানি বাহিনী। পরদিন রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের তিন পুলিশ সদস্য টাঙ্গাইলের মধুপুরে আসেন। তাদের কাছ থেকে রাজধানীতে পাকিস্তানিদের গণহত্যা ও নৃশংসতা সম্পর্কে জানতে পারেন জুয়েল ও তার বন্ধুরা। সঙ্গে সঙ্গে তারা যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রয়োজনীয় অস্ত্র সংগ্রহের উদ্যোগ নেন। তার সহযোদ্ধাদের মধ্যে ছিলেন রানী ভবানী হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মহেন্দ্র বর্মণ, শেখর, বাচ্চু, মজিদ, রাজ্জাক, জীবন, আক্তারসহ আরও অনেকে। মধুপুর বাজারে তারা বৈঠক করেন। তখনই কথা ওঠে, মধুপুর থানায় অস্ত্র আছে, নিয়ে নিতে হবে।

এ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে মাহমুদ পারভেজ বলেন, 'বাবার কাছে সরাসরি অস্ত্র চেয়েছিলাম। তিনি পেশাগত কারণে তাৎক্ষণিকভাবে রাজি হননি; কিন্তু বাধাও দেননি। বরং ১ এপ্রিল (সম্ভবত) আমরা যখন মধুপুর থানার আশপাশে ঘোরাফেরা শুরু করি, তখন বাবা কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে নিয়ে রুটিন অপারেশনের জন্য অন্যখানে চলে যান। আর এ সুযোগেই থানা থেকে অস্ত্রগুলো লুট করি আমরা। এই অস্ত্র দিয়ে জলছত্র ও টেংরিবাড়ী পাহাড়ে আমরা প্রশিক্ষণ নিই। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের হাবিলদার মনসুর আলী আমাদের ৩৪ জনের প্রশিক্ষক ছিলেন।'

একাত্তরের ১১ নম্বর সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধ করেন জুয়েল। প্রশিক্ষণের পর তিনি ও তার টোআইসি আলম একদিন অপারেশন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে টাঙ্গাইল থেকে ১২ মাইল দূরে ময়মনসিংহ সড়কের ষোলাগুড়া ব্রিজের পাংড়া গ্রামের কাছে রেকি করতে যান। এ সময় জামায়াতে ইসলামী ও মুসলিম লীগের সদস্যরা ধরে ফেলে তাদের। তারপর সকাল থেকে প্রায় সন্ধ্যা পর্যন্ত তাদের আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়। কিন্তু ওই নির্যাতনের পরও দমে যাননি জুয়েল। এর পরপরই প্রথম অপারেশন করেন টাঙ্গাইলের মধুপুর বাজার ও কালিহাতীতে। এ সময়েই পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে আহত হন তিনি।

এ প্রসঙ্গে জুয়েল বলেন, 'দিনটি ছিল ১৮ এপ্রিল। আমরা তখনও মধুপুরে। সিদ্ধান্ত হয় টাঙ্গাইলে যাব। তখনই খবর আসে, পাকিস্তানি সেনারা টাঙ্গাইল থেকে গাড়ি নিয়ে হামিদপুর হয়ে কালিহাতী ব্রিজে আসছে। আমরা তার আগেই কালিহাতী ব্রিজের চারপাশে অ্যামবুশ করার জন্য ছোট ছোট অনেক দলে ভাগ হয়ে আশপাশে অবস্থান নিই। একসঙ্গে দুইশ'র মতো মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম আমরা। রাস্তার বাঁ দিকে, হাটবাজারে উঁচু জায়গার পাশে বসে ছিলাম। সামনে কোনো প্রটেকশনও ছিল না। দুপুর ১টার দিকে পাকিস্তানি সেনারা ব্রিজের ওপরে আসে। তখন ফায়ার ওপেন করি। সঙ্গে সঙ্গে বেশ কিছু পাকিস্তানি সেনা লুটিয়ে পড়ে। এ ঘটনায় ওরা মরিয়া হয়ে একের পর এক হেভি মেশিনগান ও এলএমজির গুলি চালাতে থাকে। ঘণ্টাখানেক এই গোলাগুলি চলে। পরে বেইজ ক্যাম্প থেকে ওরা আর্টিলারিও ছুড়তে থাকে। এতে আশপাশের মাটিসহ আমাদের শরীর পর্যন্ত কেঁপে ওঠে। তখন নিচু জমির পথ দিয়ে গ্রামের দিকে সরে পড়ার চেষ্টা করি।'

জুয়েল বলেন, 'খানিকটা পথ এগোতেই সহযোদ্ধা মজিদের আর্তচিৎকার শুনতে পাই। তাকিয়ে দেখি গুলি খেয়ে সে দূরে পড়ে আছে। তাকে তুলে আনতে হাবিলদার মনসুর ও আমি ক্রলিং করে এগিয়ে যাই। মজিদের কাছে পৌঁছতে না পৌঁছতেই আমারও গুলি লাগে। প্রথম মনে হলো, শরীরটা যেন হালকা হয়ে গেছে। যেন আকাশে উড়ছি। তারপর হঠাৎ অনুভব করলাম, ডানহাতের কবজির নিচে চিনচিন করছে। তাকিয়ে দেখি, গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে। কী করব বুঝতে পারছিলাম না। তখনও বুঝিনি, মুখেও গুলি লেগেছে। ব্যথার তীব্রতা বাড়তে থাকে। তখন খেয়াল করে দেখি, গুলিটি হাতে লেগে মুখের ভেতর হয়ে গালটাকে রক্তাক্ত করে বেরিয়ে গেছে। সহযোদ্ধারা আমাকে নিয়ে যায় গোপালপুরে। সেখানে আমজাদ ডাক্তার প্রাথমিক চিকিৎসা করেন।'

স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সরকার মাহমুদ পারভেজ জুয়েলকে উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকারি খরচে পোল্যান্ড পাঠায়। কারণ এরই মধ্যে তার হাতের ভেতরটা গ্যাংগ্রিন হয়ে পচে গিয়েছিল। তবে দীর্ঘমেয়াদি উন্নত চিকিৎসার পর সেটি রক্ষা পায়। হাতটি কাটা না পড়লেও সেটি বেঁকে গিয়ে প্রায় তিন ইঞ্চি ছোট হয়ে গেছে। দেশে ফেরার পর ১৯৭২ সালে মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টে চাকরি হয় তার। ২০১৩ সালের ১ মার্চ তিনি মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের মহাব্যবস্থাপক হিসেবে অবসর নেন। অবসর জীবনযাপন প্রসঙ্গে জুয়েল বলেন, 'ডান হাতটি প্রায় অক্ষম। তবে কাটা পড়েনি, এটাই অনেক বড় ব্যাপার। এখন শহীদ, যুদ্ধাহত ও মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসনের জন্য একটি সমিতির মাধ্যমে কাজ করছি।'

দুই ছেলে ও এক মেয়ের জনক মাহমুদ পারভেজ জুয়েল তরুণ প্রজন্মের কাছে তার প্রত্যাশাও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, 'তোমরাই এ দেশের ভবিষ্যৎ। প্রতেকেরই উচিত, এ দেশের জন্মের সঠিক ইতিহাস জানা। আর সেজন্য বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধকে জানতে হবে। তবেই সত্য-মিথ্যা নির্ণয় করা যাবে।' স্বাধীন বাংলাদেশের কাছে প্রত্যাশার কথা জানাতে গিয়ে এই যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা বলেন, 'একটি স্বপ্নই দেখি- সেটা মৃত্যুর পরে হলেও যেন বাস্তবায়ন হয়; আর তা হলো, দেশের সরকারি ও বিরোধী সব দলই হবে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের দল। তবেই বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ গড়ে তোলা যাবে। বর্তমান সরকারেরই উচিত, ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য এমন একটি প্লাটফর্ম তৈরি করে দেওয়া।'