জাতিসংঘ মিশন

সালামাদের ভরসার নাম বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী

প্রকাশ: ১০ ডিসেম্বর ২০১৯     আপডেট: ১০ ডিসেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ

সাহাদাত হোসেন পরশ, ডিআর কঙ্গোর রোই থেকে

কঙ্গোর রোই এলাকায় আইডিপি ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া জনগোষ্ঠীর পাশে রয়েছেন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা। ছবিতে ক্যাপ্টেন সায়েম বিন সুলতানের সঙ্গে সালামাসহ শিশুরা- প্রতিবেদক

কঙ্গোর রোই এলাকায় আইডিপি ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া জনগোষ্ঠীর পাশে রয়েছেন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা। ছবিতে ক্যাপ্টেন সায়েম বিন সুলতানের সঙ্গে সালামাসহ শিশুরা- প্রতিবেদক

ডিআর কঙ্গো নিয়ে একটি কথা প্রচলিত আছে। তা হলো- পেটে ক্ষুধা থাকলেও কঙ্গোর শিশুরা কাঁদে না। কয়েকদিন মধ্য আফ্রিকার দরিদ্রতম এ দেশটির নানা প্রান্তে ঘুরে এমন দৃশ্যই দেখা গেল। শহর বা প্রত্যন্ত গ্রামের পথ ধরে হাঁটলেই শত শত শিশু চোখে পড়বে। রাস্তার পাশেই তারা খেলাধুলা করছে। অধিকাংশের পরনে ভালো কাপড় নেই। সংবাদকর্মী হিসেবে ছবি তুলতে গেলেই অধিকাংশ শিশু সানন্দে ঘিরে ধরে। হাসিমুখে ছবি তুলতে পারাই যেন ওদের সবচেয়ে বড় বিনোদন। কোনো শিশুকে কাঁদতেও দেখিনি। যদিও তারা তিনবেলা তো দূরের কথা, একবেলাও ঠিকমতো পেট ভরে খেতে পারে না। ওরা জন্ম থেকেই শিখছে- প্রতিকূল পরিবেশ কীভাবে মোকাবিলা করতে হয়। পেটে ক্ষুধা নিয়ে যে দেশের অধিকাংশ শিশুর মুখে হাসির আভা লেগে থাকে সেখানেও ব্যতিক্রম দু'চারজন রয়েছে। তাদেরই একজন ছোট্ট সালামা। ওর বয়স তিন বছর। ডিআর কঙ্গোর ইতুরি প্রদেশের জুগুর রোই এলাকায় সালামার পরিবারের বসবাস।

৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ থেকে আসা গণমাধ্যম প্রতিনিধি দলের সদস্যদের নেওয়া হয় রোই এলাকায়। সেখানে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের একটি ক্যাম্প রয়েছে। ওই ক্যাম্পের অদূরেই স্থানীয় ২১ হাজারের বেশি বাস্তুচ্যুত কঙ্গোলিজ বসবাস করছে। বসতভিটা হারিয়ে বাস্তুচ্যুত হওয়া এসব মানুষ স্থানীয় হেমা সম্প্রদায়ের সদস্য। দীর্ঘদিন ধরে হেমাদের সঙ্গে স্থানীয় লেন্দু জনগোষ্ঠীর জাতিগত রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলে আসছে। চলতি বছরই জাতিগত সংঘাতে নিহত হয়েছে কয়েকশ' মানুষ, যাদের অধিকাংশ হেমা সম্প্রদায়ের। লেন্দুদের হামলার শিকার হয়ে ওই ২১ হাজার হেমা বাস্তুচ্যুত হয়ে নিরাপদ জায়গা হিসেবে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের ক্যাম্পের অদূরে অবস্থান নিয়েছে। ইউএনএইচসিআর বাস্তুচ্যুত এ জনগোষ্ঠীর জন্য ছোট্ট ছোট্ট ঘর তৈরি করে দিয়েছে।

হেমা-লেন্দু জাতিগত সংঘাতের শিকার হয়েছে শত শত শিশু। তাদের অনেকেই এরই মধ্যে মা-বাবা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের হারিয়েছে। হতভাগ্য সেসব শিশুর দলে সালামা। বাংলাদেশি গণমাধ্যম কর্মীদের হাতে ক্যামেরা দেখে রোই এলাকার ইন্টারনাল ডিসপ্লেস পিপল (আইডিপি) ক্যাম্পের অধিকাংশ শিশু হাস্যোজ্জ্বল মুখে ছবি তুলছিল। ব্যতিক্রম ছিল সালামা। ক্যামেরার অসংখ্য ফ্ল্যাশ তার মুখে হাসি ফোটাতে পারেনি। ওর হাতে খাবার তুলে দেওয়ার পরও মলিন মুখ। বুকের ওপর দুই হাত রাখা সালামার যেন কোনো কিছুতেই ভ্রূক্ষেপ নেই! পরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, সালামার চোখের সামনে তার বাবাকে গলা কেটে হত্যা করে লেন্দু সম্প্রদায়ের অস্ত্রধারীরা। এরপর তার মা মামারোজের ওপর বর্বর নির্যাতন চালানো হয়। শিশু সালামা তার পর থেকে বাকরুদ্ধ। চোখের সামনে এত রক্তপাত ও নির্যাতন দেখে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে শিশুটি। এরপর থেকে হাসতে ভুলে গেছে সালামা। তার মতো আরও অনেক শিশুর জীবনের গল্প একই। রোই এলাকায় আইডিপি ক্যাম্পের পাশেই একটি ছোট্ট আলাদা ঘর। স্বামীকে হারিয়ে প্রায় ৮ ফুট প্রস্থ আর ১২ ফুট দৈর্ঘ্যের ওই ছোট্ট মাটির ঘরেই এখন পাঁচ সন্তানকে নিয়ে বসবাস করেন সালামার মা। রোই এলাকায় নিয়োজিত বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা এখন সেখানকার আইডিপি ক্যাম্পে শত শত সালামা ও তাদের পরিবারের জন্য একমাত্র নির্ভরতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশি ক্যাম্পের পাশে ছোট্ট ঘরে তারা নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারবে- এটা বিশ্বাস করে। তাই বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী দেখলেই নিজ দেশে বাস্তুচ্যুত হাজার হাজার ডিআর কঙ্গোর মানুষ বাংলায় বলে ওঠেন- 'বন্ধু তোমরা ভালো থেকো। আমরা এখন ভালো আছি।' বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের কেউ কেউ আবার স্থানীয় সোয়াহিলি ভাষায় তাদের কাছে জানতে চান- 'আবারি।' এর অর্থ কেমন আছো। ওরা জবাব দেয়- 'মোজুরি'। যার অর্থ 'ভালো আছি।'

বাস্তুচ্যুত হাজার হাজার জনগোষ্ঠীর খাদ্য, চিকিৎসা, স্যানিটেশনসহ অন্যান্য জরুরি প্রয়োজনের ব্যাপারে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা-সংক্রান্ত সংস্থাগুলোকে অবহিত করেন বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা। এর ফলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এরই মধ্যে এগিয়ে এসেছে। এখন ডিআর কঙ্গোর ভাসমান বিরাট এই জনগোষ্ঠীর মানুষ তাদের ভাগ্য বদলের জন্য বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের আশা-ভরসার প্রতীক মনে করছে।

আইডিপি ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া কিশোর ইব্রাহিম জানান, জাতিগত সংঘাতে সে বাবা-মা হারিয়েছে। এরপর দাদার সঙ্গে এসে আইডিপি ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রাণে বেঁচে থাকবে- এ বিশ্বাস তার ছিল না। তবে অন্যান্য গ্রামবাসীর সঙ্গে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের ক্যাম্পের পাশে আশ্রয় নিতে পেরে এখন সে ভরসা পাচ্ছে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ডিআর কঙ্গোতে এখন সবচেয়ে বড় সংকট হেমা-লেন্দুদের মধ্যে জাতিগত সংঘাত। ইতুরি প্রদেশে হেমা সম্প্রদায়ের লোকসংখ্যা প্রায় ১০ লাখ আর লেন্দু প্রায় আট লাখ। ঔপনিবেশিক আমল থেকে কিছুটা সুবিধা পেয়ে আসছিল হেমারা। তুলনামূলকভাবে তারা লেন্দুদের চেয়ে অবস্থাসম্পন্ন। বহুকাল ধরে লেন্দুরা বিশ্বাস করে আসছে, ভূমির অধিকারসহ নানাভাবে তারা হেমাদের মাধ্যমে ক্ষতির শিকার। ভূমির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ নেই। এসব ক্ষোভের জের ধরে লেন্দুরা হেমাদের শত শত ঘর-বাড়ি পুড়িয়ে দিচ্ছে। লুট করে নিচ্ছে হেমাদের সম্পদ।

ডিআর কঙ্গোয় নিযুক্ত র‌্যাপিডলি ডেপ্লয়অ্যাবল ব্যাটালিয়নের (ব্যানআরডিবি) কন্টিনজেন্ট কমান্ডার কর্নেল ইমতাজ উদ্দিন জানান, রোই ক্যাম্প স্থাপনের পর থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের তুলনায় অনেক ভালো। বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের উপস্থিতির কারণে অস্ত্রধারী গ্রুপগুলোর মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। জাতিসংঘের ম্যান্ডেট অনুযায়ী সাধারণ মানুষের নিরাপত্তায় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে প্রস্তুত। ডিআর কঙ্গোয় তারা জীবনও দিয়েছেন।

রোইয়ের বাংলাদেশি ক্যাম্পের কমান্ডার মেজর জুভেন ওয়াহিদ বলেন, হেমা ও লেন্দুদের মধ্যে সংঘাতের পর এখন পর্যন্ত তিন লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। জাতিগত এমন সংঘাতের যারা শিকার হয়েছে, তাদের নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তায় হাত বাড়িয়েছেন বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা। রোই ক্যাম্পে এখন পর্যন্ত তিনবার হামলা চালিয়েছে অস্ত্রধারীরা। তবে প্রতিবারই সফলতার সঙ্গে তা প্রতিহত করা হয়েছে।

রোই ক্যাম্পে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে মেজর মেহেদী হাসান সিদ্দিকীর। তিনি বলেন, হেমা ও লেন্দুদের গ্রামের মাঝামাঝি জায়গায় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের ক্যাম্প। এ অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত রাখা হচ্ছে। এ ধরনের সংঘাতে জড়ালে কীভাবে জাতিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সে ব্যাপারে উভয় সম্প্রদায়কে সচেতন করা হচ্ছে।

আইডিপি ক্যাম্পের প্রেসিডেন্ট বাহেমুকা সমকালকে বলেন, বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীরা তাদের কাছে আশীর্বাদ। রোই ক্যাম্পের কারণে হাজার হাজার কঙ্গোলিজ সেখানে নিরাপদে বসবাস করতে পারছে। মিলিশিয়ারা এখন বড় ধরনের সংঘাতে জড়াতে ভয় পাচ্ছে।