প্রতারণার 'টোপ' যখন রিমান্ডের আসামিও

কান্নার ভুয়া রেকর্ড শুনিয়ে স্বজনের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিত প্রতারক জাভেদ

প্রকাশ: ২২ ডিসেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ

সাহাদাত হোসেন পরশ

মিরপুরের বৃন্দাবন এলাকার বাসিন্দা প্রসেনজিৎ। মোবাইল ফোন চুরি ও চোরাই মোবাইল ফোনসেট কেনাবেচার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করেছিল ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এরপর ছেলের খোঁজ নিতে প্রসেনজিতের বাবা সুখদেব হাজির হন মিন্টো রোডের ডিবি কার্যালয়ের সামনে। সেখানে যাওয়ার পর জাভেদ হোসেন নামে মধ্যবয়সী এক ব্যক্তি তার সঙ্গে আলাপ-পরিচয় জমিয়ে তোলে। কী কারণে ডিবির গেটে এলেন জানতে চায় তার কাছে। সুখদেব তাকে ছেলের ব্যাপারে জানান। একপর্যায়ে ওই ব্যক্তি বলে, তারও এক পরিচিত লোককে ধরে ভেতরে নেওয়া হয়েছে। তাকে ছাড়ানোর কথাবার্তা চলছে। কিছু সময় পর সে ভেতরে যাবে। ডিবিতে তার চেনাজানা অনেকে রয়েছেন। প্রসেনজিতকে ছাড়ানোর চেষ্টা করবে। এরপর কৌশলে সুখদেবের মোবাইল নম্বর নিয়ে নেয় জাভেদ। পরে তার নম্বরে ফোন করে জানায়, ছেলেকে ছাড়াতে হলে ৫০ হাজার টাকা লাগবে। ওই টাকা পেলেই আমিনবাজার এলাকায় ছেলেকে ছেড়ে আসবে ডিবি। এমন নিশ্চয়তা পেয়ে পালের একটি গাভি বিক্রি করে দুই দফায় জাভেদকে ৫০ হাজার টাকা দেন সুখদেব। এর পরও ছেলেকে ফেরত না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েন তারা। পরে আবারও সুখদেবকে ফোন করে আরও ৫০ হাজার টাকা দাবি করে জাভেদ। বিষয়টি নিয়ে পরিচিতজনদের সঙ্গে আলাপ করে প্রসেনজিতের পরিবার। একপর্যায়ে তারা ডিবির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানান। পরে ওই নম্বরের ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে ডিবি জানতে পারেন, প্রসেনজিতকে ছাড়ানোর কথা বলে প্রতারণা করে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে জাভেদ। শুরু হয় তাকে ধরতে অভিযান।

ওই ঘটনার সূত্র ধরে জাভেদের ব্যাপারে যে তথ্য উঠে আসে তা ভয়াবহ। পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারের পর জানা গেছে, ডিবির গেট ও ঢাকার বিভিন্ন থানার সামনে অপেক্ষমাণ আসামি এবং তাদের স্বজনদের সঙ্গে অভিনব প্রতারণা করে আসছিল জাভেদ। তিন বছর ধরে এভাবে তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে লাখ লাখ টাকা। চলতি বছরই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে তার অ্যাকাউন্টে ১৯ লাখ টাকা লেনদেনের তথ্য পায় ডিবি। শুধু আসামি বা অভিযুক্ত ব্যক্তি নয়, ডিবিসহ বিভিন্ন থানায় নানা অপরাধে জব্দ যানবাহন ছাড়ানোর কথা বলেও মালিকদের কাছ থেকে অনেক টাকা নিয়েছে সে। ডিবির গেটে বসে বছরের পর বছর যেভাবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে প্রতারণার জাল বুনেছে জাভেদ, তা ডিবিসহ সংশ্নিষ্টদের বিস্মিত করেছে। অবশেষে গত বৃহস্পতিবার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা সংলগ্ন ৩০০ ফুট থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। বর্তমানে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে দু'দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। ডিবির  হেফাজতে থাকা জাভেদ জানায়, পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারকৃতদের স্বজনদের ফাঁদে ফেলতে কিছু কৌশল নিত সে। তাকে দেখতে যাতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মনে হয়, তাই ছোট করে চুল কাটায়। তার মোবাইল ফোনে একটি অ্যাপ রয়েছে। তার মাধ্যমে কণ্ঠ নকল করে স্বজনকে ফোন করত সে। অনেক সময় সে নিজেই নারী পুলিশ কর্মকর্তার কণ্ঠ ধারণ করে কথা বলত। এ ছাড়া অ্যাপের মাধ্যমে রিমান্ডের কথিত আসামির কান্নাকাটির শব্দ শোনাত স্বজনদের। এরপর তাদের বলত, টাকা না দিলে রিমান্ডে শারীরিক নির্যাতন অব্যাহত থাকবে। অনেক সময় ক্রসফায়ারের হুমকি দিয়েও টাকা আদায় করত।

প্রতারক জাভেদ জানায়, টার্গেট করা ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা আদায়ের ক্ষেত্রে জীবনে একবারই সে ব্যর্থ হয়েছে। চলতি বছর এক জঙ্গির মাকে ফোন করে তার ছেলেকে ছাড়ানোর ব্যবস্থার কথা জানায়। পুলিশ হেফাজতে থাকা ওই ছেলের সঙ্গে কথা বলতে চান ওই মা। পরে কণ্ঠ নকল করে মাকে ফোন করে জাভেদ। তখন ওই ছেলের মা স্পষ্টভাবে জাভেদকে জানান, ওই কণ্ঠ তার ছেলের নয়। কেউ প্রতারণা করছে তা ধরে ফেলেন তিনি। ওই ঘটনার উদাহরণ দিয়ে জাভেদ জানায়, ওই এক ব্যর্থতা ছাড়া কেউ কখনও তার কৌশল ধরতে পারেনি।

ডিবি ও থানার গেটে যেসব স্বজন উপস্থিত হতেন, তাদের কাছ থেকে মোবাইল নম্বর আদায়ে ছিল তার অভিনব কৌশল। আলাপ-পরিচয় জমিয়ে তোলার পর তাদের সে বলত, একটি নম্বরে তার ফোন করা দরকার। তার ফোনে ব্যালান্স নেই। তখন কোনো স্বজনের কাছ থেকে মোবাইল ফোন নিয়ে জাভেদ তার নিজের নম্বরেই কল করত। তবে তার আগে নিজের মোবাইল ফোনের রিংটোন সুইচ বন্ধ করে রাখত। এভাবে আসামির স্বজনের নম্বর পাওয়ার পর পরবর্তী সময়ে ওই নম্বরে কল করে যোগাযোগ করত।

মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা তোলার ক্ষেত্রেও সে ছিল চতুর। কোনো পরিচিত মোবাইল ব্যাংকিংয়ের দোকানে সে যেত না। আবার একই দোকানে দ্বিতীয়বার যেত না। বিভিন্ন নম্বর থেকে বিভিন্ন স্বজনের সঙ্গে লেনদেন করত। একটি সিম একবার ব্যবহারের পর ভেঙে ফেলত। এ ছাড়া অধিকাংশ সময় বিকাশের যে নম্বরে আসামিদের স্বজনের কাছ থেকে টাকা নিয়েছে, সেটি ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে নিয়েছে জাভেদ।

জানা গেছে, প্রতারক জাভেদের গ্রামের বাড়ি গাজীপুরের জয়দেবপুরের পূর্ব দীঘিরপাড়। প্রতিদিনই কাউকে না কাউকে ফাঁসাতে নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে গাজীপুর থেকে ঢাকায় আসত সে। এরপর ডিবির গেট বা কোনো থানার সামনে ফাঁদ পেতে অপেক্ষা করত। প্রায় প্রতি মাসে গড়ে দুই লাখ টাকার বেশি এভাবে হাতিয়ে নিত সে।

জাভেদের প্রতারণার শিকার প্রসেনজিতের মা সুচিন্তা রানী সমকালকে বলেন, তাদের টানাপোড়েনের সংসার। তার মধ্যে ঈদুল আজহার কিছুদিন আগে ছেলে গ্রেপ্তার হলো। তাকে ছাড়ানোর নিশ্চয়তা পেয়ে গরু বিক্রি করে ৫০ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। পরে বুঝতে পারি প্রতারকের খপ্পরে পড়েছি। এক মাস পর স্বাভাবিক আইনি প্রক্রিয়ায় ছেলে জামিনে ছাড়া পায়।

জানা গেছে, বিভিন্ন থানা এলাকায় কোনো কারণে পুলিশ গাড়ি জব্দ করলে তার মালিকের সঙ্গে 'পুলিশের ঘনিষ্ঠ' লোক পরিচয়ে ফোন করত জাভেদ। এর পর ওই গাড়ি ছাড়ানোর কথা বলে তাদের কাছ থেকে টাকায় আদায় করত সে। চলতি বছরের ৪ ডিসেম্বর বিমানবন্দর এলাকায় জলঢাকা থেকে আব্দুল্লাহপুরগামী হৃদয় পরিবহনের একটি গাড়ি আটক করে পুলিশ। পরে গাড়ি ছাড়ানোর দেনদরবার করে জাভেদ। ওই গাড়ির সুপারভাইজার শাহিনুর রহমান জানান, গাড়ি ছাড়ানোর কথা বলে তার কাছ থেকে তিন হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে।

প্রতারক জাভেদের ব্যাংকিং হিসাব পর্যালোচনা করে পাওয়া গেছে, চলতি বছরই জাভেদ '০১৯৯৭৩৬৭২৫৩' নম্বরে অন্তত ১৯ লাখ টাকা নিয়েছে। এ ছাড়া আরও কিছু নম্বরে তার লেনদেন ছিল।

সম্প্রতি ডিবির হাতে জব্দ একটি গাড়ি ছাড়ানোর কথা বলে জাভেদ ওই গাড়ির মালিকের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা নেয়। এরপর গাড়ি ছাড়াতে না পারায় ওই মালিক বিষয়টি ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাকে জানান। তখন ধারণা করা হচ্ছিল, হয়তো ডিবির কোনো অসাধু সদস্য ওই অর্থ নিয়েছেন। পরে তদন্তে প্রতারক জাভেদের নাম বেরিয়ে আসে।

ডিবির উত্তর বিভাগের ডিসি মশিউর রহমান বলেন, আসামি গ্রেপ্তারের পর স্বাভাবিক কারণেই স্বজনরা ডিবি অফিসের আশপাশে থাকেন। ওষুধ, জামাকাপড় লাগলে তারা দিয়ে যান। অপেক্ষমাণ স্বজনকে ফাঁদে ফেলাই ছিল জাভেদের লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার উৎস। তাকে ধরতে ডিবির একাধিক টিম কয়েক মাস ধরে চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। শেষ পর্যন্ত তাকে গ্রেপ্তার করা গেছে। তার সঙ্গে আর কেউ রয়েছে কিনা, তা বের করার চেষ্টা চলছে।

ডিবির উত্তর বিভাগের এডিসি জুনায়েদ আলম সরকার বলেন, জাভেদকে গ্রেপ্তার করা না গেলে হয়তো অনেকেই ভাবতেন আসামি ছেড়ে দেওয়ার কথা বলে পুলিশই বুঝি টাকা নিচ্ছে।