ঢাকা সোমবার, ২০ মে ২০২৪

ভয়ংকর আগস্ট, ডেঙ্গুতে রেকর্ড মৃত্যু

ভয়ংকর আগস্ট, ডেঙ্গুতে রেকর্ড মৃত্যু

তবিবুর রহমান

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০

দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর দিক থেকে এ বছর এখন পর্যন্ত ‘ভয়ংকর মাস’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রইল আগস্ট। ২২ বছরের ইতিহাসে গেল আগস্টে দেশে ডেঙ্গুতে মৃত্যু সবচেয়ে বেশি। মাসটির ৩১ দিনে ডেঙ্গু কেড়েছে ৩৪২ প্রাণ। এর আগে এক মাসে এই রোগে এত মৃত্যু দেখেনি বাংলাদেশ। এই হিসাব গত ২৪ ঘণ্টায় (বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) প্রাণ হারানো ১৭ জনকে নিয়ে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২০০০ সাল থেকে ডেঙ্গুতে মৃত্যু ও আক্রান্তের তথ্য সংরক্ষণ করছে। এর আগে মশাবাহিত এই রোগটি জনস্বাস্থ্যের জন্য তেমন হুমকি ছিল না বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। এর পর থেকে প্রতিবছর দেশের বহু মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন এবং মারা যাচ্ছেন। ২০১৯ সালে এ রোগ মারাত্মক আকার ধারণ করে। ওই বছর এক লাখের বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন, মৃত্যু হয় ১৭৯ জনের। এর মধ্যে আগস্টে মারা যান সবচেয়ে বেশি ৮৩ জন। আর চলতি বছরের আগস্টেই প্রাণ হারালেন ৩৪২ জন।

২০২০ সালে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ কিছুটা কম ছিল। ওই বছর এ রোগে আক্রান্ত হন ১ হাজার ৪০৫ জন এবং মৃত্যু হয় সাতজনের। বছরের কোন মাসে মৃত্যু সবচেয়ে বেশি, সে তথ্য নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যভাণ্ডারে। পরের বছর অর্থাৎ ২০২১ সালের আগস্ট মাসে ডেঙ্গু মারাত্মক রূপ নেয়। ওই বছর মৃত্যু হয় ১০৫ জনের।
এর মধ্যে আগস্টে মারা যান ৩৪ জন, যা মাসভিত্তিক হিসাবে ওই বছরে সবচেয়ে বেশি। বছরটিতে সারাদেশে আক্রান্ত হয়েছিলেন ২৮ হাজার ৪২৯ জন। ২০২২ সালে দেশে ডেঙ্গুতে প্রাণ হারান ২৮১ জন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১১৩ জন মারা যান নভেম্বরে। সে বছর আক্রান্ত ছিলেন ৬২ হাজার ৩৮২ জন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গত মঙ্গলবার প্রকাশিত ‘ডেঙ্গু সিচুয়েশন রিপোর্ট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলেছে, এবার বাংলাদেশে ডেঙ্গু আক্রান্তদের মৃত্যু বেশি শক সিনড্রোমে। শকে চলে যাওয়া ব্যক্তির রক্তচাপ অতিদ্রুত কমে যায়, রক্তে অণুচক্রিকার পরিমাণ কমে এবং পরিস্থিতি দ্রুত খারাপ হয়। অনেক ক্ষেত্রে রোগী অজ্ঞান হয়ে যায়। চলতি বছর মোট মৃত্যুর ৬৪ শতাংশ শক সিনড্রোমে বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এ ছাড়া অন্য কারণের মধ্যে রয়েছে– এক্সপান্ডেড ডেঙ্গু সিনড্রোম, ২৩ শতাংশ; হেমোরোজিক ফিভার, ৯ শতাংশ ও কোমরবিডিটি, ৪ শতাংশ। 

ডব্লিউএইচওর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, শক সিনড্রোমে বেশি মৃত্যু ঢাকার বাইরে, ৭৩ শতাংশ। এর আগে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলমও বলেছিলেন, এবার ডেঙ্গুর শক সিনড্রোমে মৃত্যু হচ্ছে বেশি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ছয়জন। এই সংখ্যা– ফেব্রুয়ারিতে তিন, এপ্রিলে দুই, মে মাসে দুই, জুনে ৩৪ ও জুলাইয়ে ২০৪ জন। মার্চে ডেঙ্গুতে কারও মৃত্যু হয়নি। আর আক্রান্ত হয়েছেন জানুয়ারিতে ৫৬৬ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১৬৬, মার্চে ১১১, এপ্রিলে ১৪৩, মে মাসে ১ হাজার ৩৬, জুনে ৫ হাজার ৯৫৬, জুলাইয়ে ৪৩ হাজার ৮৫৪ এবং আগস্টে ৭১ হাজার ৯৭৬ জন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডেঙ্গু এখন আর শুধু বর্ষা মৌসুমের আতঙ্ক নয়। রোগটির ব্যাপকতা অনেক বেড়েছে। তাই এটি মোকাবিলায় দায়িত্বশীলদের তৎপরতার পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে হবে। সাম্প্রতিক জরিপে ঢাকা ও আশপাশের চার জেলায় এডিস মশার ব্যাপক উপস্থিতির তথ্যকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলছেন বিশেষজ্ঞরা। এ কারণে সামনে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন তারা।

প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, ‘ডেঙ্গু আর সিজনাল নেই, সারা বছরই হচ্ছে। গত বছরের জুনে ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হলেও চলতি বছরের মে মাসেই আক্রান্ত বেড়ে গেছে।’ তাঁর মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে পরিকল্পিতভাবে মশা নিধন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। জ্বর হলে অবশ্যই পরীক্ষা করাতে হবে। কোনো পরিস্থিতিতেই অবহেলা করা ঠিক হবে না।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন মশা নিধনে নানা উদ্যোগ নিলেও কীটতত্ত্ববিদ ড. মনজুর চৌধুরী বলছেন, ‘মশা নিধনে শুধু জেল-জরিমানা বা সচেতনতা বাড়িয়ে কাজ হবে না। সঠিকভাবে জরিপ চালিয়ে দক্ষ জনবল দিয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। বছরজুড়ে মশা নিধন কার্যক্রম চালাতে হবে।’ গতানুগতিক পদ্ধতিতে মশা নিধন আর কার্যকর নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আরও ১৭ জনের মৃত্যু

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় (বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত) ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা সিটির ১৬ জন। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ৩০৮ জন। এর মধ্যে ঢাকায় ৮৭৫ জন এবং ঢাকার বাইরে ১ হাজার ৪৩৩ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ২৩ হাজার ৮০৮ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ৫৯৩ জনের। এর মধ্যে ঢাকায় মারা গেছেন ৪৩৮ জন এবং ঢাকার বাইরে ১৫৫ জন।   



আরও পড়ুন

×