ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) একটি গবেষণা প্রতিবেদন সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ওই গবেষণা সংস্থাটি নির্বাচনী ব্যবস্থা, বহুদলীয় অবস্থান, সরকারের সক্রিয়তা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও নাগরিক অধিকারের বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করে। তাদের গবেষণায় জানা গেল, সর্বশেষ গণতন্ত্র সূচকে ৫ দশমিক ৮৮ স্কোর নিয়ে আট ধাপ এগিয়ে ৮০তম স্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। গত দেড় দশকে বাংলাদেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির সড়ক অনেকটা চওড়া হয়েছে, তা সত্য বটে। কিন্তু শুধু উন্নয়নই গণতন্ত্র বিকাশের একমাত্র মাপকাঠি কিনা- এ নিয়ে কথা উঠতেই পারে। পাশাপাশি এ কথা তো অসত্য নয় যে, কোনো অভিমত কিংবা গবেষণা-জরিপই একেবারে প্রশ্নমুক্ত নয়।

ইআইইউর প্রতিবেদন নিয়েও তর্ক চলতে পারে। অনেকেই এর সঙ্গে ভিন্নমতও প্রকাশ করতে পারেন। এও তো গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিরই চর্চা। কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা হিসেবে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাই অনেকাংশে উত্তম- অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরই এই অভিমত। আমি মনে করি, গণতন্ত্র পুষ্ট হয় সম্মান ও আত্মসম্মানের ভিত্তিতে। গণতন্ত্রের প্রধান শত্রু হলো সংকীর্ণতা। সংকীর্ণ সমাজ, সংকীর্ণ মন। এ কথাও অস্বীকার করা যাবে না যে, রাজনীতি সবসময় ক্ষমতার সঙ্গে সম্পৃক্ত। একই সঙ্গে জাতীয় সংস্কৃতি মস্ত বড় জাতীয় সম্পদ। গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার অন্যতম শর্ত হচ্ছে ভিন্নমতের মর্যাদা অর্থাৎ পরমতসহিষুষ্ণতা। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির আকাল কখনও কখনও প্রকটভাবেই দেখা গেছে। স্বাধীন বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকারের নামে স্বেচ্ছাচারিতাও এরই মধ্যে কম পরিলক্ষিত হয়নি। ক্ষতও কম সৃষ্টি হয়নি। বর্তমানে বাংলাদেশের অনেক কিছু বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনুসরণ করা হচ্ছে- এ কথা বলা হয়। নানা সূচকে, নানা ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রগতিও হচ্ছে, তা-ও অসত্য নয়। কিন্তু তার পরও প্রশ্ন আছে।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক হলেও বৈষম্যচিত্রও কম প্রকট নয়। উন্নয়ন-অগ্রগতির নানা দৃষ্টান্ত আমাদের সামনে রয়েছে। পদ্মা সেতুর মতো অনেক বড় কর্মযজ্ঞ চলছে আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে। বাংলাদেশ মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ পাঠিয়ে বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে অগ্রগতির জানান দিয়েছে। গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা আছে বলেই উন্নয়ন-অগ্রগতির চাকা ঘুরছে- এমন ব্যাখ্যাও শুনে থাকি। জঙ্গিবাদ-উগ্রবাদ আমাদের সমাজদেহে অনেক ক্ষত সৃষ্টি করেছে। এর রাশ টেনে ধরা অনেকটাই সম্ভব হলেও একেবারে নির্মূলে যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও কার্যক্রম দরকার, সে ক্ষেত্রে এখনও আশানুরূপ অগ্রগতি নেই- এ অভিযোগ অসত্য নয়। এ দেশের সাধারণ মানুষ বরাবরই গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করে আসছে। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমৃদ্ধকরণে তাদের অবদান অবশ্যই স্মরণযোগ্য। গণতন্ত্রবিরোধী শক্তি এখনও যথেষ্ট ক্রিয়াশীল। প্রগতিবাদী ও শুভবোধসম্পন্ন সব শক্তি যদি আরও যূথবদ্ধ হতে না পারে, তাহলে গণতন্ত্রের পথ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় মসৃণ করা যাবে না। একই সঙ্গে ভিন্নমতের প্রকাশ হতে হবে বাধাহীন। অধিকারের ক্ষেত্রে সাম্য প্রতিষ্ঠা জরুরি। এসব ক্ষেত্রে এখনও ঘাটতি আছে।

গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে চিৎকার করলেই তো আর গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র্র কিংবা সমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় না। এর জন্য করণীয় আছে অনেক কিছু। স্বাধীন বাংলাদেশে গণতন্ত্রের অভিজ্ঞতা, যারা গণতান্ত্রিক-অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্র চালিয়েছেন তাদের যেমন আছে, তেমনি যারা চালিত আর শাসিত হয়েছেন, সেই জনগণেরও আছে। অভিজ্ঞতা কি একই? জনগণের একটি বড় অংশেরই অভিজ্ঞতা জানার উপায় প্রায় নেই বললেই চলে। তারা ভাষণ-বক্তৃতা শোনে বটে; কিন্তু ভাষণ-বক্তৃতা দেয় না। তারা খবরের কাগজে লেখে না, বেশিরভাগ পড়েও না। তারা টেলিভিশনের পর্দায় মুখ দেখাতে বা মুখ খুলতেও পারে না- বড়জোর এসব দেখেশুনে নয়ন ও শ্রবণ সার্থক করে। তারা কেমন জীবনযাপন করছে, কেমন গণতন্ত্র ভোগ করছে, তাদের হয়ে আমরাই বয়ান করে থাকি। একদিকে শাসক, অন্যদিকে শাসিত জনসাধারণ; মাঝখানে আমরা মাঝারি-বিত্তশ্রেণি ছাড়া জনগণের আর কে আছে! গণতন্ত্র নিয়ে যারা উদ্বাহু নৃত্য করব, উচ্ছ্বাস করব, সে-ও করব আমরাই। না, একটু ভুল হলো; শাসকরাও তাতে অংশ নেবে। তবে সেসব করার জন্য তাদের ব্যবস্থা আলাদা, ঢাকঢোল তাদের নিজস্ব। যেটুকু নিন্দা-মন্দ করতে হবে, শাসন-শোষণ নিয়ে ছড়া কাটতে হবে, সেটা করতে হবে আমাদের। মোট কথা, জনগণের কথা বলার জন্য জনগণ নেই। আছি আমরা। জনগণ সুপ্ত আগ্নেয়গিরি, সময় হলেই জাগবে। জেগেছেও বহুবার এই জনপদেই- এ দৃষ্টান্তও তো আছে।

গণতন্ত্রের শাসনকাল কেমন কাটছে, এ প্রশ্নের উত্তরও সরল নয়। নানা পরিসংখ্যান, খতিয়ান, সূচক, অগ্রগতি, পশ্চাদ্‌গতি, ডানে হেলা, বাঁয়ে হেলা, কিছু ভালো, কিছু মন্দ! ভারসাম্য রাখার জন্য মন্দগুলোর উল্লেখ আবার বাড়াবাড়ি না হয়ে যায় সে জন্য কিছু ভালো-মন্দের বিশেষ উল্লেখ- এসব চলতেই থাকবে। মানুষের হতাশা, হত্যা, ধর্ষণ, দুর্নীতির চিত্র এখনও চোখে পড়ে। অস্বীকার করা যাবে না, সবই অব্যাহত চলছে; ধর্ষণ যেন একদিনের জন্যও থামেনি। সন্ত্রাস, শিশুহত্যা, নারীহত্যা, সংখ্যালঘু নিপীড়ন- এসব এখনও বন্ধ হয়নি। আদিবাসীরা এখনও নানারকম বঞ্চনাক্রান্ত। স্বাধীন দেশে দীর্ঘদিন আমরা কাটিয়েছি অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায়। তখন থেকেই শুভবোধ-কল্যাণবোধের মূলে নানাভাবে কুঠারাঘাত হয়েছে স্বার্থান্বেষীদের হীনস্বার্থ চরিতার্থকরণে।

সমাজের মাঝখানের আমাদের মতো মানুষের তো রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের অনেক খবরই তেমন জানা নেই। তবু এই সমাজের মানুষেরই দায় বেশি। বিবেক ধোয়ার জন্য দায়। টিকে থাকার জন্যও বটে। বড় বড় গণতান্ত্রিক দেশের সুবিশাল মধ্যশ্রেণির মানুষের মতোই আমাদের বাংলাদেশের ছোট মধ্যশ্রেণিকেই শিল্প-সাহিত্য, সংগীত, দর্শন, সংস্কৃতি গড়ে তোলার দায় নিতে হয়েছে। রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি- সব বিষয়েই আমাদের কথা বলতে হয়। আর এ কথা বলার কাজটুকু করার জন্য নিজেদের সংকীর্ণ স্বার্থগণ্ডি পেরিয়ে- তা রাষ্ট্রনীতি হোক, রাজনীতি হোক, অর্থনীতি হোক- কোনো কিছুরই তলা পর্যন্ত ঘাঁটাঘাঁটি করার দরকার পড়ে না।

এখন পর্যন্ত কত তন্ত্রেই না রাষ্ট্র চলেছে, তার হিসাবে কূল পাওয়াই মুশকিল! শেষ পর্যন্ত পৌঁছে গেছি গণতন্ত্রে। আমরা বলি, সর্বশ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রব্যবস্থা। কিন্তু আমাদের তো আরও দু-এক ধাপ এগোনোর কথা ছিল। সমাজতন্ত্র, সাম্যতন্ত্র। শেষ পর্যন্ত সমাজতন্ত্র, সাম্যতন্ত্রীদের গলা টিপে ধরতে পেরেছে পুঁজিওয়ালা গণতন্ত্রীরা। সুদীর্ঘকাল সংগ্রাম করে ইউরোপ, আমেরিকা এই মহার্ঘ্য বস্তু অর্জন করেছে। অতীতে যা-ই ঘটুক, অন্তত গত ৬০-৭০ বছরে সারা পৃথিবীর দেশে দেশে এই বস্তু অকাতরে তারা সরবরাহ করেছে। পৃথিবীতে গণতন্ত্রের অভিভাবকত্বের মূল দায়িত্ব স্বেচ্ছায় এখন ঘাড়ে তুলে নিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কোনো দেশে গণতন্ত্র চলছে কিনা, তারাই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দিতে পারে; ঠিকমতো গণতন্ত্র না চললে শাস্তিও দিতে পারে। বাঘে-গরুতে একঘাটে পানি খাওয়ানোর মতোই গণতন্ত্র, সাম্রাজ্যবাদ, মৌলবাদ- সব তন্ত্রেরই কুৎসিত সহবাস-সহাবস্থান ঘটিয়ে দিতে পারে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর তার সাঙাতেরাই আজকের দুনিয়ায় গণতন্ত্রের প্রকৃত সংজ্ঞাসূত্র ভুলিয়ে ছেড়েছে। বর্তমান জমানায় গণতন্ত্রের একই অঙ্গে এত রূপ! মূল রূপ আদৌ কিছু আছে কিনা কিংবা কত পদের গণতন্ত্র সম্ভব- এসব জরুরি প্রশ্ন যেন তালগোল পাকিয়ে গেছে। পৃথিবীতে এখন গণতন্ত্রের বহুরূপী চেহারা দেখতে পাচ্ছি। শেষ অভীষ্ট গণতন্ত্র, সর্বরোগের মহৌষধ। তারপরও গণতন্ত্রকে বিদ্রূপ করে কী হবে? নিতান্ত তিক্ত অভিজ্ঞতায় এত কথা বলা। সত্যিই তো, আমরা ভয়ের সাগর, মারের সাগর পেরিয়ে এসেছিলাম। কূল মিলেছিল বাংলাদেশে। হাজার বছরের টালমাটাল ইতিহাসের চিহ্নে ভরা সব জনপদ আর তার লোহা-রঙের মানুষরা কতদিন পরে, এই প্রথমবার পেল একটি দেশ। আকাঙ্ক্ষার পরিমাপ ছিল না, গণতন্ত্র ছিল নিম্নতম আকাঙ্ক্ষার লক্ষ্য, তার নিচে চোখ নামেনি। বরং নজর উঠেছিল আরও উঁচুতে, সমাজতন্ত্রে। কিছুই কি তখন বোঝা গিয়েছিল যে, সমাজতন্ত্র নির্মাণ করতে পারলে গণতন্ত্রের আলাদা আর কোনো প্রয়োজন থাকে কিনা, কেন দুটিকেই চাইতে হবে, দুটির মধ্যে কী বিরোধ আছে? সমাজতন্ত্রের কোন সম্পূর্ণতার জন্য দরকার পড়বে গণতন্ত্রের কিংবা গণতন্ত্রের কোন অভাব পূরণের জন্য সমাজতন্ত্র? গণতন্ত্রে যদি পৌঁছাতেই পারা যায়, তাহলে আলাদা করে ধর্মনিরপেক্ষতা, জাতীয়তাবাদেরই-বা কী দরকার? মনে হয়েছিল আকাঙ্ক্ষার কমতি থাকা উচিত নয়। একসঙ্গে সব মিলিয়ে নেওয়া যাবে। তারপর আমাদের অভিজ্ঞতা কী? স্বাধীনতা অর্জনের চার বছর পুরো হতে না হতে, নৃশংসতম হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে, দেশের মেরুদণ্ড ভেঙে গণতন্ত্র বিপর্যয়ের মুখে পড়ল। তারপর টানা দেড় দশকের বেশি বাংলাদেশের মানুষের দিন-মাস-বছর কেটেছে যে শাসনের মধ্য দিয়ে, সংবিধান থেকে খসে পড়েছে একের পর এক স্তম্ভ। এত বিষয়ে কথা হচ্ছে, কিন্তু এই যে মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকারযুক্ত স্তম্ভগুলো সংবিধান থেকে খসে পড়ল, সেসব পুনঃস্থাপনে উদ্যোগ নেই। দেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা, নির্বাচন পদ্ধতি, জনঅধিকারের মতো নানা বিষয়ে কথা আছে। এসব নিয়ে মাঠ গরম হয়। কিন্তু আমাদের সেই মূল স্তম্ভগুলো সংবিধানে পুনঃস্থাপনে কথা নেই। আমরা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উৎকর্ষ দাবি করছি বটে। এর পরও প্রশ্ন কিন্তু উঠছেই; প্রশ্ন জিইয়ে আছেই।

তারপরও বলব, রাজনীতি হোক জনকল্যাণে। আমাদের রাজনীতি অবশ্যই দোষত্রুটিমুক্ত নয়; কিন্তু এই রাজনীতির অর্জনও কম নয়। বিদ্যমান রাজনীতির দোষত্রুটির নিরসন ঘটাতে হবে রাজনীতির মধ্য দিয়েই, অন্য কোনো পথে নয়। শুদ্ধ, দায়বদ্ধ রাজনীতি ভিন্ন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যাবে না। চাই জনগণের শাসন। প্রকৃতপক্ষেই জনগণের আরও ক্ষমতায়ন। মনে রাখতে হবে, সবকিছুর শেষ থাকলেও মানুষের অধিকারের শেষ নেই। কথাটা প্রায় স্লোগানের মতো হয়তো হয়ে গেল। তবু বুঝতে হবে, স্লোগানেও শক্তি থাকে।

শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক