মুখ দিয়ে লিখেই স্নাতকোত্তর ডিগ্রি

প্রকাশ: ১৪ জানুয়ারি ২০২০     আপডেট: ১৪ জানুয়ারি ২০২০      

জিনাত জান কবীর

জবির প্রথম সমাবর্তনে হাফিজুর রহমান- সমকাল

দৃঢ় মনোবল থাকলে কোনো কিছুই যেন মানুষকে হার মানাতে পারে না। যেমন পারেনি হাফিজুর রহমানকে। জন্ম থেকে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা বাধা হয়ে দাঁড়ালেও শিক্ষার আলোয় সেই প্রতিবন্ধকতাকে জয় করেছেন তিনি। গত ১১ জানুয়ারি হাফিজুর যোগ দিয়েছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) প্রথম সমাবর্তনে।

'হার না মানা সংগ্রামী' হাফিজুরের জন্ম বগুড়ার ধুনটের বেলকুচি গ্রামে। তার বাবা মফিজ উদ্দিন, মা ফিরোজা বেগম। মাতৃগর্ভ থেকেই তার দু'হাত অচল। আর পা দুটি খর্বকায়। হাঁটাচলা না করতে পারলেও পা দিয়ে এক সময় লিখতেন তিনি।

কৈশোরে এসে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন হাফিজুরের সাধ জাগে লেখাপড়া করার। বাবার কাছে বাংলা-ইংরেজি বর্ণমালা শেখেন। ছেলের পড়ালেখায় আগ্রহ দেখে বাবা তাকে ভর্তি করে দেন স্থানীয় ব্র্যাক স্কুলে। কিন্তু তার পক্ষে একা স্কুলে যাওয়া-আসা সম্ভব ছিল না। পরে সাইকেলের বিয়ারিং দিয়ে বাবা তাকে একটি ছোট্ট গাড়ি বানিয়ে দেন। সেটিতে রশি বেঁধে টেনে সহপাঠীরা তাকে আনা-নেওয়া করতো স্কুলে।

স্কুল আসা-যাওয়ার এই কষ্ট দেখে শিক্ষকরা তাকে বাড়িতে লেখাপড়া করার পরামর্শ দেন। শিক্ষকের কথা মতো হাফিজুর বাড়িতে বসে লেখাপড়া করেন। তবে মাঝে মাঝে স্কুলে যেতেন। এভাবে প্রাথমিক পর্যায় শেষ করে ভর্তি হন ধুনট এন.ইউ পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে।

সেখানকার শিক্ষকরাও তাকে পরামর্শ দিলেন বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করার। শুধু পরীক্ষার সময় স্কুলে যেতেন হাফিজুর। 

এমন সংগ্রাম করেই লেখাপড়া চালিয়ে যান তিনি। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় নতুন চিন্তা আসে হাফিজুরের মাথায়। পা দিয়ে লেখার পরিবর্তে মুখ দিয়ে কলম ধরতে থাকেন। এরপর মুখ দিয়ে কলম ধরে লিখেই ২০০৯ এসএসসিতে জিপিএ ৪.১৯ পেয়ে উত্তীর্ণ হন তিনি।

তারপর ভর্তি হন ধুনট ডিগ্রি কলেজে। সেখান থেকে ২০১১ সালে এইচএসসিতে জিপিএ ৩.৬০ পেয়ে উত্তীর্ণ হন হাফিজুর।

এররপর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখার সুযোগ পান তিনি। ভর্তি হন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে। চলে আসেন ঢাকায়। এ সময় তাকে সার্বক্ষণিক দেখাশোনা করেন তারই ভাতিজা একাদশ শ্রেণির ছাত্র মোহাম্মদ ইব্রাহিম। হুইল চেয়ার ঠেলে ইব্রাহিম তাকে ক্লাসে আনা নেওয়া করেন। ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক এবং ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন হাফিজুর। 

সমকাল অনলাইনকে হাফিজুর জানান, তিনি তার স্নাতকোত্তর ডিগ্রি উৎসর্গ করেছেন সদ্য প্রয়াত বাবা মফিজ উদ্দিনকে। এখন তার ইচ্ছা একটি গণপাঠাগার করার। এজন্য অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। নিজের খরচের পাশাপাশি পাঠাগার করার সেই অর্থ যোগার করতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় গেটে টি-শার্ট বিক্রি করছেন তিনি। 

হাফিজুর বলেন, 'এরই মধ্যে কম্পিউটার চালানো শিখেছি। চাকরির পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছি। তাই একটু বাড়তি লেখাপড়া করতে হচ্ছে।' 

ভিডিও দেখতে ক্লিক করুন: