বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে আকাশে উড়ছিল কপ্টার। ভাসমান যুদ্ধজাহাজ থেকে একের পর এক ছোড়া হচ্ছিল গোলা। আকাশে শত্রুবিমান লক্ষ্য করে নিক্ষেপ করা হচ্ছিল মিসাইল। যেন কোনো এক যুদ্ধক্ষেত্র বঙ্গোপসাগর। নৌ কমান্ডোরা মেটাল শার্ক নিয়ে ধেয়ে আসছিলেন। সত্যিকার অর্থে তা রণক্ষেত্র না হলেও শত্রুপক্ষ আক্রমণ করলে সমুদ্রসীমায় দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় করণীয় কী- গতকাল বুধবার সেটাই দেখালেন দেশের নৌ সেনারা। বিশাল জলরাশিতে লুকায়িত ব্লু ইকোনমি রক্ষায় নিজেদের সক্ষমতার প্রমাণ দিলেন তারা।

'এক্সারসাইজ সেফ গার্ড-২০১৯' নামে নৌবাহিনীর বার্ষিক সমুদ্র মহড়ার গতকাল সমাপনী দিনে শত্রুপক্ষের যুদ্ধজাহাজ আর বিমান ধ্বংসে ব্যবহূত মিসাইল সফলভাবে উৎক্ষেপণ করা হয়। আকাশে বাহিনীর হেলিকপ্টার আর মেরিটাইম প্যাট্রল এয়ারক্রাফট উড়িয়ে আর সমুদ্রের ঢেউ ভেঙে এগিয়ে চলা অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজগুলো দেখিয়ে দিল- শুধু পানিতে নয়, আকাশ থেকেও বহিঃশত্রুর আক্রমণ ঠেকাতে সক্ষম বাংলাদেশ নৌবাহিনী। এই মহড়া বুঝিয়ে দিল বহিঃশত্রুর আক্রমণ মোকাবিলা আর অভ্যন্তরীণ সামুদ্রিক সম্পদ রক্ষা ছাড়াও সমুদ্রের ব্লু ইকোনমি রক্ষায় নৌবাহিনী পুরোপুরিই প্রস্তুত রয়েছে।

১৮ দিনব্যাপী ওই মহড়ায় মেরিটাইম প্যাট্রল এয়ারক্রাফট ও হেলিপ্টার ছাড়াও নৌবাহিনীর ফ্রিগেট, করভেট, ওপিভি, মাইন সুইপার, প্যাট্রলক্রাফট, মিসাইল বোট অংশ নিয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ কোস্টগার্ড, সেনা ও বিমানবাহিনীসহ সংশ্নিষ্ট মেরিটাইম সংস্থাগুলো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই মহড়ায় অংশ নেয়। এবারের মহড়ার মূল প্রতিপাদ্য- সমুদ্র এলাকায় দেশের সার্বভৌমত্ব সংরক্ষণ, সমুদ্র সম্পদের হেফাজত, সমুদ্রপথের নিরাপত্তা বিধানসহ চোরাচালান রোধ, জলদস্যুতা দমন, উপকূলীয় এলাকায় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও সমুদ্র এলাকার প্রহরা নিশ্চিতকরণ।

গতকালের সমাপনী দিনে নৌবাহিনীর সর্বাধুনিক যুদ্ধজাহাজ 'বঙ্গবন্ধু' ছাড়াও অন্তত ৭০টি যুদ্ধজাহাজ অংশ নেয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে সমাপনী দিনের মহড়া প্রত্যক্ষ করেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। 'বানৌজা বঙ্গবন্ধু' জাহাজে অবস্থান করে তিনি মহড়া প্রত্যক্ষ করেন। ওই সময় মন্ত্রী বলেন, 'নৌবাহিনীর উন্নয়ন মানে দেশের উন্নয়ন। নৌবাহিনীর উন্নয়ন এবং আরও আধুনিকায়নে সরকারের ফোর্সেস গোল রয়েছে। বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্র এলাকায় মূল্যবান সম্পদ রয়েছে। এই ব্লু ইকোনমি কাজে লাগিয়ে দেশকে আরও এগিয়ে নিতে সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে।

ওই সময় নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল আওরঙ্গজেব চৌধুরী, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল মাসিহুজ্জামান সেরনিয়াবাত, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লে. জেনারেল মো. মাহফুজুর রহমানসহ ঊধ্বর্তন সামরিক কর্মকর্তা ও বেসামরিক ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে সকালে মন্ত্রী জাহাজে পৌঁছলে কমান্ডার বিএন ফ্লিট রিয়ার অ্যাডমিরাল এম নাজমুল হাসান ও বানৌজা বঙ্গবন্ধুর অধিনায়ক ক্যাপ্টেন কেইউএম আমানত উল্লাহ তাকে স্বাগত জানান। নৌবাহিনীর একটি সুসজ্জিত দল জাহাজে মন্ত্রীকে গার্ড অব অনার প্রদান করে।

১৮ দিনব্যাপী ওই মহড়ায় চার ধাপে নৌবহরের বিভিন্ন কলাকৌশল অনুশীলন, সমুদ্র এলাকায় পর্যবেক্ষণ, অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান, লজিস্টিক অপারেশন, ল্যান্ডিং অপারেশন ও উপকূলীয় এলাকার নৌ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তার বিষয়টি উঠে আসে। চট্টগ্রামে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ঘাঁটি ঈশা খাঁ থেকে ৪০ নটিক্যাল মাইল দূরে গভীর সমুদ্রে অনুষ্ঠিত দিনব্যাপী সমাপনী মহড়ায় দুটি জাহাজ থেকে দুটি সারফেস টু সারফেস মিসাইল (ক্ষেপণাস্ত্র) নিক্ষেপ করে পরীক্ষা করা হয়। কর্মকর্তারা প্রথমে বানৌজা দুর্জয় থেকে দূরপাল্লার সারফেস টু সারফেস ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেন। এরপর বানৌজা দুর্দান্ত থেকে আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। দুটি ক্ষেপণাস্ত্রই ১২ কিলোমিটার দূরে নিখুঁতভাবে লক্ষ্যভেদ করতে সক্ষম হয়েছে। মিসাইল উৎক্ষেপণ ছাড়াও মহড়ায় শোল্ডার লাঞ্চড স্যাম ফায়ারিং, অ্যান্টি এয়ার র‌্যাপিড ওপেন ফায়ার, আরডিসি ফায়ার, ডিবিএসএস/নৌকমান্ডো মহড়া ও নৌযুদ্ধের কলাকৌশল অনুশীলন করা হয়।

বিষয় : বার্ষিক সমুদ্র মহড়া

মন্তব্য করুন