ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফ সিটি করপোরেশনকে স্বায়ত্তশাসিত করতে 'নগর সরকার' গঠনের দাবি তুলেছিলেন। চট্টগ্রামের মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীও একই দাবি জানিয়েছিলেন। নগরীতে সেবাদানকারী সব সংস্থাকে এবং আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে নগর সরকারের অধীনে আনার প্রস্তাব ছিল তাদের। কিন্তু সিটি করপোরেশনকে শক্তিশালী করার এ প্রস্তাব কখনই কেন্দ্রীয় সরকারের সমর্থন পায়নি

একসময় স্থানীয় সরকারের সব ক্ষমতাই ছিল। স্বৈরাচার আইয়ুব খান ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে নিজে টিকে থাকতে আমলাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর অনেক 'গণতান্ত্রিক শাসক' এলেও স্থানীয় সরকারকে সামান্য ক্ষমতা ছাড়েননি : সৈয়দ আবুল মকসুদ, লেখক ও কলামিস্ট

ঢাকার দুই মেয়রের চেয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান ও মফস্বলের পৌরসভা মেয়রের ক্ষমতা বেশি। ঢাকার মেয়ররা রাস্তার পাশের খুঁটিতে বাতি লাগাতে পারেন; কিন্তু খুঁটি ১ ইঞ্চিও সরাতে পারেন না : মোবাশ্বের হোসেন, স্থপতি ও নগরবিদ

ঢাকায় সিটি করপোরেশন নির্বাচন মানেই দেশের প্রধান দুই দলের তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতা। কিন্তু সিটি করপোরেশনের চেয়ার দখলের লড়াই যত তীব্রই হোক আর প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারীদের প্রতিশ্রুতির বহর যত লম্বাই হোক- প্রতিষ্ঠানটির ক্ষমতা সীমিতই। যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে নগরবাসীর ভোট নেন প্রার্থীরা, সেসবের বেশির ভাগ বাস্তবায়নের ক্ষমতা নেই করপোরেশনের।

স্থানীয় শাসন শিরোনামে সংবিধানের ৫৯(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের ওপর প্রজাতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার দেওয়া হবে। ৫৯(২) অনুচ্ছেদে জানানো হয়েছে যে স্থানীয় সরকারের দায়িত্ব হলো- প্রশাসন ও সরকারি কর্মচারীদের কাজ, জনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং জনসাধারণের কার্যক্রম ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্পর্কিত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংবিধান স্থানীয় শাসনের ভার স্থানীয় সরকারকে দিলেও আদতে তা নেই। বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার কখনই স্বায়ত্তশাসিত ছিল না, এখনও নয়। বরাবরই এটি কেন্দ্রীয় সরকারের মুখাপেক্ষী। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ক্ষমতা আরও কম।

সিটি করপোরেশন যে কেন্দ্রীয় সরকারের মুখাপেক্ষী, তা সিটি করপোরেশনের বাজেট পরিসংখ্যানে চোখ রাখলেই বোঝা যায়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) বাজেট ছিল এক হাজার ৮২২ কোটি টাকা। এর মধ্যে করপোরেশনের রাজস্ব আয় ছিল ৭৯৩ কোটি টাকা। সরকারের কাছ থেকে অনুদান ও প্রকল্প সহায়তা হিসেবে করপোরেশন পেয়েছে প্রায় ৭৬৩ কোটি টাকা।

ডিএনসিসির ২০১৯-২০ সালের বাজেটে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা তিন হাজার ৫৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩৬ শতাংশ, অর্থাৎ এক হাজার ১১৫ কোটি টাকা আয় করার লক্ষ্য রয়েছে রাজস্ব ও নিজস্ব সম্পদ থেকে। বাজেটের দু-তৃতীয়াংশই সংগ্রহ করা হবে সরকারের অনুদান ও প্রকল্প সহায়তা থেকে। ঢাকার বাইরের একজন মেয়র সমকালকে বলেন, সরকারি অনুদান না পেলে সিটি করপোরেশন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিতে পারবে না। কিন্তু আয় বাড়ানোর ক্ষমতা করপোরেশনের নেই।

ঢাকার প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফ সিটি করপোরেশনকে স্বায়ত্তশাসিত করতে 'নগর সরকার' গঠনের দাবি তুলেছিলেন। চট্টগ্রামের মেয়র মহিউদ্দিন চৌধুরীও একই দাবি জানিয়েছিলেন। নগরীতে সেবাদানকারী সব সংস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নগর সরকারের অধীনে আনার প্রস্তাব করেছিলেন তারা। কিন্তু সিটি করপোরেশনকে শক্তিশালী করার এ প্রস্তাব কখনই কেন্দ্রীয় সরকারের সমর্থন পায়নি; বরং সাত মন্ত্রণালয়ের ৫৪টি সংস্থা রাজধানীতে কাজ করছে, যাদের মধ্যে সমন্বয় নেই। তাদের ওপর সিটি করপোরেশনের আইনি কর্তৃত্বও নেই।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলামের প্রবন্ধের তথ্যানুযায়ী, ১৯৫৮ সালের আগে বিদ্যুৎ সরবরাহ, পানি সরবরাহ, নগরীর ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিভিন্ন দায়িত্ব ছিল পৌরসভার ওপর। সামরিক শাসন জারি করে ক্ষমতা দখলের পর আইয়ুব খান স্থানীয় সরকারের এ ক্ষমতা কেড়ে নেন। স্বাধীনতার পর গণতান্ত্রিক সরকারগুলোও এ ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়নি। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকার সঙ্গে সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে উন্নয়নের লক্ষ্যে তৎকালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী জিল্লুর রহমানের নেতৃত্বে কমিটি করেছিল। কিন্তু তাতে লাভ হয়েছে, এমন নজির নেই।

সিটি করপোরেশন আইন প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত ছিলেন লেখক ও কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ। তিনি বলেছেন, নাগরিক সমাজ যেসব সুপারিশ করেছিল, তার কিছুই রাখা হয়নি। সংবিধানে স্থানীয় সরকারকে স্বশাসিত বলা হয়েছে। কিন্তু সরকার স্থানীয় সরকারকে আমলাতন্ত্রের অধীন করেছে; গোঁজামিলে পরিণত করেছে। সিটি করপোরেশনের যে দুর্বল দশা, তাতে প্রতিষ্ঠানটি না থাকলেও কিছু যায়-আসে না।

তিনি বলেন, কলকাতা পৌর করপোরেশনের মেয়র নাগরিক সেবার যে কোনো কাজের জন্য ক্ষমতাবান। কিন্তু বাংলাদেশে মেয়র, কাউন্সিলরদের মন্ত্রণালয়ের কাছে ধরনা দেওয়া ছাড়া কোনো কাজ নেই। কেন্দ্রীয় সরকার সিটি করপোরেশনকে মন্ত্রণালয়ের কাঠপুতুলে পরিণত করেছে।

টাকার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি সিটি করপোরেশনের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকাকে প্রতিষ্ঠানের বড় দুর্বলতা মনে করেন সৈয়দ আবুল মকসুদ। তিনি বলেন, সারা দুনিয়ায় স্থানীয় সরকার তার আয়ের অংশ কেন্দ্রকে দেয়। বাংলাদেশে কেন্দ্রীয় সরকার অনুদান দেয় স্থানীয় সরকারকে। এভাবে চললে স্থানীয় সরকার কিছুই করতে পারবে না। অথচ একসময় স্থানীয় সরকারের সব ক্ষমতাই ছিল। স্বৈরাচার আইয়ুব খান ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে নিজে টিকে থাকতে আমলাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর অনেক 'গণতান্ত্রিক শাসক' এলেও স্থানীয় সরকারকে সামান্য ক্ষমতা ছাড়েননি। তার মতে, সিটি করপোরেশনকে 'গেঞ্জির বুকপকেট' হিসেবে রাখা হয়েছে, যা কোনো কাজে লাগে না।

স্থপতি ও নগরবিদ মোবাশ্বের হোসেন বলেন, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের মেয়রের চেয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান ও মফস্বলের পৌরসভার মেয়রের ক্ষমতা বেশি। ঢাকার মেয়ররা রাস্তার পাশের খুঁটিতে বাতি লাগাতে পারেন; কিন্তু খুঁটি এক ইঞ্চি সরাতে পারেন না। রাজধানীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও খুঁটির দায়িত্ব সরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলোর।

মোবাশ্বের হোসেন আরও বলেন, সাতটি মন্ত্রণালয়ের ৫৪টি প্রতিষ্ঠান রাজধানীতে কাজ করে। সাত ক্ষমতাশালী মন্ত্রণালয়ের চাপে নিষ্পেষিত হন মেয়র। ঢাকার দুই সিটির মেয়ররা ৫৪ লাখ মানুষের ভোট পেয়ে নির্বাচিত হলেও তাদের নির্বাচনী এলাকায় ১৬ জন এমপি রয়েছেন। মেয়রদের ক্ষমতায়ন করা গেলেই কেবল সিটি করপোরেশনের কাজ হবে।

সংবিধানের ৫৯(২) অনুচ্ছেদে স্থানীয় সরকারকে জনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হলেও তা পালনের ক্ষমতা দেওয়া হয়নি সিটি করপোরেশনকে। করপোরেশনের হাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা নেই। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা হয় ঢাকা মহানগর পুলিশ আইনে।

ঢাকার প্রধান সমস্যার মধ্যে রয়েছে- যানজট, জলাবদ্ধতা, পানি সংকট, দখল-দূষণ, মাদক-সন্ত্রাস, ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট, অপরিচ্ছন্নতা ও মশা। শেষের তিনটি সমস্যা সমাধানের আংশিক ক্ষমতা রয়েছে সিটি করপোরেশনের। বাকিগুলোতে কিছুই করার নেই। অথচ ৩০ জানুয়ারির নির্বাচনে অবতীর্ণ ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থীরা ভোটের প্রচারে যানজট দূর, জলাবদ্ধতা নিরসন, দূষণমুক্ত ও নিরাপদ শহর গড়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। অবশ্য তারা আনুষ্ঠানিক নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করেননি। তবে সত্য হলো, এসব কাজের জন্য রয়েছে সরকারের বিভিন্ন বিশেষায়িত সংস্থা। আইন বলছে, প্রার্থীরা যেসব প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, তা তাদের আওতার মধ্যে নেই এবং পূরণের ক্ষমতাও করপোরেশনের নেই। আবার আইন অনুযায়ী সিটি করপোরেশনের যেসব দায়দায়িত্ব রয়েছে, সে কাজ করতেও বিশেষায়িত সংস্থা রয়েছে। প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক একবার বলেছিলেন, সিটি করপোরেশন অনুমতি ছাড়া মশাও মারতে পারে না।

তৃতীয় তফসিলের ৮ ধারায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিস্কাশন সিটি করপোরেশনের কার্যাবলির মধ্যে পড়লেও ঢাকার দুই সিটির সেই ক্ষমতাও নেই। ১৯৯৫ সালে পানি ও পয়ঃনিস্কাশন কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী রাজধানীতে পানি সরবরাহের দায়িত্ব ওয়াসার। জলাবদ্ধতা নিরসনের দায়িত্বও এ সংস্থার। খাল ও পয়ঃনিস্কাশন নালা পরিচ্ছন্ন করারও দায়িত্ব ওয়াসার। রাজধানীতে ভবন নির্মাণে রাজউকের অনুমতি নিতে হয়। হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় হলেও তাতে সিটি করপোরেশনের ভূমিকা নেই।

স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯-এর ৪১ ধারায় সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব ও কার্যাবলি নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। আইনের ৪১(১) 'ক' উপধারায় বলা হয়েছে, 'করপোরেশনের তহবিলের সংগতি অনুযায়ী তৃতীয় তফসিলে বর্ণিত দায়িত্ব ও কার্যাবলি সম্পাদন করা।' ৪১(১)-এর বাকি দুই উপধারায় বলা হয়েছে, সরকার সময় সময় নির্দেশনা দিয়ে যে দায়িত্ব দেবে, তা পালন করবে সিটি করপোরেশন।

৪১(২) ধারায় মেয়রের ক্ষমতা সম্পর্কে বলা হয়েছে, মেয়র স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও কাউন্সিলররা এ আইনের বিধান অনুযায়ী জনস্বার্থে করপোরেশনের কার্য পরিচালনা করবেন এবং করপোরেশনের কাছে যৌথভাবে দায়ী থাকবেন। সিটি করপোরেশনের মেয়রের নির্বাহী ক্ষমতা নেই। করপোরেশনের সভা সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী।

আর সিটি করপোরেশন বিধিমালা, ২০১২ অনুযায়ী মৃতের উত্তরাধিকার, জাতীয়তা ও চারিত্রিক সনদ দেওয়া ছাড়া কাউন্সিলরদের অন্য কোনো ক্ষমতা নেই। বিধিমালার ৪ ধারায় কাউন্সিলের ১২টি দায়িত্ব নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনী এলাকায় জনসচেনতা সৃষ্টি, জনমত গঠন, জনগণকে উদ্বুদ্ধ করা ও উৎসাহ দেওয়া ছাড়া কোনো দায়িত্ব নেই কাউন্সিলরের। সন্ত্রাস, মাদক নিয়ন্ত্রণে জনমত সৃষ্টি করাই কাউন্সিলরের কাজ। ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা নেই তার হাতে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হাজি মোহাম্মদ সেলিম বলেন, অনেক প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচিত হলেও কাউন্সিলরের আসলে অলিগলি নির্মাণ, সংস্কার ও পরিচ্ছন্ন রাখা এবং বাসাবাড়ি থেকে ময়লা সংগ্রহ ছাড়া আর কোনো কাজ নেই। জন্ম-মৃত্যুসনদ দেওয়াসহ বাকি যেসব কাজ আছে সেগুলো দাপ্তরিক।

স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯-এর তৃতীয় তফসিলে সিটি করপোরেশনের কার্যাবলির বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে। এ তফসিল অনুযায়ী ২৮টি দায়িত্ব রয়েছে সিটি করপোরেশনের। তবে মোটাদাগে সিটি করপোরেশনের মূল কাজ সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, সড়কবাতি লাগানো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মশক নিধন ও সিটি এলাকার হাটবাজার নিয়ন্ত্রণ।

এ ছাড়া সিটি করপোরেশনের কার্যাবলিতে রয়েছে ভাঙাচোরা ভবন সংস্কারে মালিককে নোটিশ দেওয়া, নগরবাসীর জন্য শৌচাগার নির্মাণ, পার্ক, উদ্যান, খোলা জায়গা রক্ষা; জন্ম-মৃত্যু, বিয়ে-তালাক রেজিস্ট্রি, হাসপাতাল ও মাতৃসদন পরিচালনা, ড্রেন পরিস্কার, পুকুর ও সরকারি জলাধার রক্ষা, গোসল ও কাপড়চোপড় ধোয়ার স্থান নির্মাণ, খেয়া পারাপারে ঘাট নির্মাণ, বাজার ও কসাইখানা নির্মাণ, মৃত প্রাণিদেহ অপসারণ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে পারবে সিটি করপোরেশন। তবে তা হতে হবে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী।

নগরীর উন্নয়নে সিটি করপোরেশনের মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষমতা রয়েছে। এ পরিকল্পনা সরকারের অনুমোদন পেলে করপোরেশন ভূমি উন্নয়ন করে প্লট তৈরি করতে পারবে। নির্বাচনের প্রার্থীরাও ঢাকার জন্য উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা করার কথা বলছেন। যদিও বাস্তবে পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের কাজ করে রাজউক। ভূমি উন্নয়ন ও প্লট নির্মাণের কাজ করে রাজউক ও গণপূর্ত অধিদপ্তর।

নিরাপদ নগর গড়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও কার্যত এ ক্ষমতাও করপোরেশনের নেই। তৃতীয় তফসিলের ২০ ধারায় জননিরাপত্তা-সংক্রান্ত কার্যাবলিতে শুধু বলা হয়েছে, কোথাও আগুন লাগলে তা নেভাতে কেউ বাধা দিলে ব্যবস্থা নিতে পারবে সিটি করপোরেশন।

আইনের ৮২ ধারায় বলা হয়েছে, 'করপোরেশন সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে, প্রবিধান দ্বারা চতুর্থ তফসিলে বর্ণিত সকল অথবা যে কোনো কর, উপ-কর, রেইট, টোল ও ফিস ইত্যাদি আরোপ করতে পারবে।' চতুর্থ তফসিলে বলা হয়েছে, সিটি করপোরেশন ২৬ রকম কর ও রেইট আদায় করতে পারবে।

তফসিলের ১৯(১) ধারায় বলা হয়েছে, জনগণ যাতে নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে, সে জন্য সিটি করপোরেশন যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। কিন্তু সিটি করপোরেশনের হাতে রিকশা, ভ্যান ছাড়া অন্য কোনো যানবাহনের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষমতা নেই। লাইসেন্স দেয় সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)।

সড়কে থাকা ট্রাফিক বাতি সিটি করপোরেশনের হলেও তা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পুলিশের। যানজট নিরসনের কাজও পুলিশের। নগরীর অভ্যন্তরে রুটের কোন পথে কোন যানবাহন চলবে, তা নির্ধারণের ক্ষমতা আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির (আরটিসি)। তৃতীয় তফসিলে সিটি করপোরেশনকে যানবাহনের ভাড়া নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়া হলেও সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ আইনে এ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে বিআরটিএকে। আইনে বাড়ি ভাড়া নির্ধারণের দায়িত্ব সিটি করপোরেশনকে দেওয়া হলেও, তা প্রয়োগের ক্ষমতা নেই তাদের।

রংপুর সিটি মেয়র মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ক্ষমতা না দিলে নগরবাসীকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা সম্ভব নয় মেয়রের পক্ষে। তিনি জানান, প্রকল্প, বরাদ্দ, সেবামূলক কাজ সবকিছুর জন্যই কেন্দ্রীয় সরকারের সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয়। অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে হবে করপোরেশনকে।

সিটি করপোরেশন আইনানুযায়ী, রাস্তার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে সিটি করপোরেশনের। তবে শহরের ভেতরে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের রয়েছে, যা করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ঢাকার সাতটি ফ্লাইওভারের মাত্র দুটি সিটি করপোরেশনের অধীনে। অবশ্য ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে কারও অনুমতি ছাড়াই কাজ করতে পারে সিটি করপোরেশন।