চালকদের নির্দিষ্ট পোশাক চায় না মালিকপক্ষ

সড়ক পরিবহন আইন কার্যকরে বিধিমালা

প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০     আপডেট: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

শেখ আবদুল্লাহ

ছবি: ফাইল

ছবি: ফাইল

নতুন সড়ক আইন কার্যকরে যে বিধিমালা করা হচ্ছে, তাতে চালক (ড্রাইভার) ও চালকের সহকারীদের (হেলপার) ড্রেসকোড বা নির্দিষ্ট পোশাক রাখার প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। বিধিমালার আইনি দিক পর্যালোচনায় সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ গঠিত কমিটিও বিআরটিএর প্রস্তাবটি সমর্থন করেছে। কিন্তু পরিবহন মালিকরা জনসাধারণের মারধরের হাত থেকে ড্রাইভার ও হেলপারদের বাঁচাতে নির্দিষ্ট পোশাকের পক্ষে নন। তারা বলছেন, কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে ড্রাইভার, হেলপাররাই সবচেয়ে বেশি জনরোষে পড়ে থাকে। ফলে নির্দিষ্ট পোশাক থাকলে তারা (ড্রাইভার, হেলপার) বেশি সমস্যায় পড়বে। এজন্য মালিকপক্ষ বিধিমালার এ ধারাটি বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে।

গত বছর সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ পাস করেছে সরকার। ওই বছরের ২২ অক্টোবর এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে গত ১ নভেম্বর থেকে নতুন এ আইন কার্যকর করা হয়েছে। যদিও নতুন আইনের প্রয়োগ শুরু হয়নি এখনও। এরই মধ্যে দ্রুত বিধিমালা তৈরির কাজ চলছে। বিধিমালার একটি খসড়াও তৈরি করেছে বিআরটিএ। এরপর সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) আব্দুল মালেকের নেতৃত্বে গঠিত ১০ সদস্যের একটি কমিটি বিআরটিএর তৈরি করা বিধিমালার আইনগত দিক যাচাই-বাছাই করে খসড়া বিধিমালাটি দাখিল করেছে। ওই খসড়া চূড়ান্ত করতে গত ২১ জানুয়ারি সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব নজরুল ইসলামের সভাপতিত্বে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ড্রাইভার-হেলপারদের ড্রেসকোডসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতামত দেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ, বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রুস্তম আলীসহ বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা। এ সময় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য, আইনে সব বিষয়ে বিস্তারিত বলা থাকে না। এজন্য আইন কার্যকরে বিধিমালা করা হয়ে থাকে। এ বিষয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মো. নজরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, 'একটি খসড়া বিধিমালা তৈরি করা হয়েছে। তার ওপর আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা হয়েছে। এক সপ্তাহের মধ্যে মতামত চাওয়া হয়েছে সংশ্নিষ্ট সবার। এসব মতামতের পরিপ্রেক্ষিতে খসড়া চূড়ান্ত করে ভেটিংয়ের জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। দ্রুত বিধিমালা পাস করার চেষ্টা চলছে।'

সংশ্নিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আইনের ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের ওপর এই বিধিমালা করা হয়েছে। এতে বিআরটিএর দৈনন্দিন কাজ ঠিকভাবে করা যাবে। যেসব বিষয়ে বিধিমালা করা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে- মোটরযানের শ্রেণি, পরিবহন চালানো, লাইসেন্স, নবায়ন ও লাইসেন্স অযোগ্য ঘোষণা বা বাতিল। এ ছাড়া চালক ও কন্ডাক্টর নিয়োগের শর্ত, নিবন্ধন, অস্থায়ী নিবন্ধনের আবেদন, মালিকানা পরিবর্তন নিয়েও বিধিমালা করা হয়েছে। কিস্তিতে মূল্য পরিশোধ, রুট পারমিট, বিদেশি নাগরিকদের আনা মোটরযান ও সেগুলোর রুট পারমিট, মোটরযান ড্রাইভিং স্কুলের নিবন্ধন, প্রশিক্ষকদের লাইসেন্স ও মোটরযান মেরামত কারখানার লাইসেন্স বিষয়ে বিধিমালা করা হয়েছে। তবে আইনে থাকা ট্রাস্টি বোর্ডের  ব্যবস্থাপনা, দুর্ঘটনার ক্ষতিপূরণ, চিকিৎসা, আর্থিক সহায়তা তহবিল, যাত্রী ও মোটরযানের বীমার মতো নতুন বিষয় এবং ওজন নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ দূষণ, আপিল ও সালিশের বিধিমালা করা হয়নি। এ বিষয়গুলোতে বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে বিধিমালা করা হবে।

সূত্র জানায়, বিধিমালায় চালক নিয়োগের আগে এবং নিয়মিত বিরতিতে ডোপ টেস্ট করার প্রস্তাব রয়েছে। মালিকরাই এই ডোপ টেস্ট করবেন। এক্ষেত্রে মালিকপক্ষ প্রত্যেক জেলার সিভিল সার্জনের মাধ্যমে ডোপ টেস্টের চিকিৎসক নির্ধারণের প্রস্তাব করেছেন। আইনের ৪৯ (ক) ধারায় বলা আছে, মদ্যপান বা নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন করে কেউ গাড়ি চালাতে পারবে না। এই ধারা বাস্তবায়নে ডোপ টেস্টের এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নানান ধরনের পরিবর্তন করে যেসব গাড়ি দেশে চালানো হচ্ছে, সেগুলো বন্ধ করার প্রস্তাব রয়েছে বিধিমালায়। তবে পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি খন্দকার এনায়েত উল্লাহ আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় বলেছেন, সময় বেঁধে না দিয়ে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে নিষ্পত্তির প্রস্তাব করেন তিনি। স্টাফ বাসের ক্ষেত্রেও রুট পারমিট বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব করেছেন।

ইলেকট্রিক ভেহিক্যাল নিবন্ধন ফিও নির্ধারণ করা হচ্ছে এই বিধিমালার মাধ্যমে। বিলাসবহুল গাড়ি বলতে কোন ধরনের গাড়িকে বিলাসবহুল গাড়ি বলা হবে, তা স্পষ্ট করা হয়েছে। কোন ধরনের অপরাধে ড্রাইভিং লাইসেন্স স্থগিত হবে, কোন ধরনের অন্যায়ের ফলে লাইসেন্স বাতিল হবে, তা স্পষ্ট করা হচ্ছে এই বিধিমালায়। নো পার্কিং এলাকায় পার্কিং করলে জরিমানা তো হবেই, ভুলবশত পার্কিং করলেও জরিমানার প্রস্তাব রয়েছে এতে।

বিধিমালায় কোনো ড্রাইভিং লাইসেন্স তিন বছরের বেশি সময় ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ হলে সেটি আর নবায়ন না করে প্রত্যাখ্যানের প্রস্তাব করা হয়েছে। যদিও বাংলাদেশ ট্রাক-কাভার্ডভ্যান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক রুস্তম আলী এ প্রস্তাবটি পুনর্বিবেচনার সুপারিশ করেছেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, অনেকে বিদেশে যায়। তিন বছরের পর লাইসেন্স নবায়ন করা না গেলে প্রবাসফেরত ড্রাইভাররা সমস্যায় পড়বেন। এ ছাড়া বিধিমালায় ৩০ দিনের মধ্যে লাইসেন্স নবায়ন কার্যক্রম শেষ করার কথা বলা হয়েছে। রুস্তম আলী এই সময় ১৫ দিন করার প্রস্তাব করেছেন।