শীতে বেশি ইলিশ পাঁচ কারণে

প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সুমন চৌধুরী, বরিশাল

চলতি শীত মৌসুমে দক্ষিণাঞ্চলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রুপালি ইলিশ। এ মৌসুমে স্থানীয় নদ-নদীতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি ইলিশ ধর পড়া এবং আকার বড় হওয়ায় বিস্মিত জেলে ও ইলিশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। এ নিয়ে লোকমুখে নানা গুঞ্জন থাকলেও ইলিশ গবেষকরা বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই দেখছেন। শীত মৌসুমে ইলিশ বেশি পাওয়ার পক্ষে অন্তত পাঁচটি যুক্তি দেখিয়েছেন ইলিশ বিশেষজ্ঞরা। তবে একটি যুক্তিতে অনড় সবাই। তা হচ্ছে- প্রজনন মৌসুমে ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা এবং জাটকা নিধন বন্ধ অধিক কার্যকরী হওয়ায় উৎপাদন বেড়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী শীত মৌসুমগুলোতেও এভাবে ইলিশ পাওয়া যাবে বলে আশাবাদী বিশেষজ্ঞরা।

ইলিশ নিয়ে গবেষণাকারী সরকারি একমাত্র প্রতিষ্ঠান মৎস্য অধিদপ্তরের আওতাধীন 'চাঁদপুর ইলিশ গবেষণা কেন্দ্র'। এ প্রতিষ্ঠানটি এবার একুশে পদক পেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আনিছুর রহমান চলতি শীত মৌসুমে স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ইলিশ পাওয়ার বিষয়টি এভাবে যুক্তি দেখিয়েছেন- খেজুর গাছে রাখা হাঁড়িটি ফোঁটা ফোঁটা রসে ভরে গিয়ে একপর্যায়ে রস উপচে পড়ে যায়। তেমনিভাবে ২০০৫ সাল থেকে জাটকা (১০ ইঞ্চির কম সাইজের ইলিশ) নিধন এবং ২০০৭ সাল থেকে বিভিন্ন মেয়াদকালীন ইলিশ নিধন বন্ধ থাকায় আমাদের সাগর এখন ইলিশে পরিপূর্ণ। সাগরে ইলিশ অধিক হয়ে যাওয়ায় সেগুলো নদীতে প্রবেশ করে জেলেদের জালে ধরা পড়ছে।

ইলিশের আকার প্রায় কেজি কিংবা তার বেশি হওয়া প্রসঙ্গে ড. আনিছুর রহমান বলেন, ইলিশ সারা বছর ডিম ছাড়লেও ৮০ ভাগ ইলিশ ডিম দেয় আশ্বিনের পূর্ণিমায়। সে সময়ে (অক্টোবর) ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞায় মা ইলিশ নিরাপদে ডিম ছাড়ে। এ মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দিনই ১ নভেম্বর শুরু হয় জাটকা নিধনে ৮ মাসের নিষেধাজ্ঞা। জাটকা মাঝারি আকারে পরিণত হওয়ার মধ্যেই পাঁচটি অভয়াশ্রমে ১ মার্চ থেকে দুই মাস মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা শুরু হয়। আবার ২০ মে  থেকে ৬৫ দিন সাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকে। এসব কারণে জাটকা ইলিশ একাধিকবার নদী থেকে সাগরে এবং সাগর থেকে নদীতে নিরাপদে আসা যাওয়ার সুযোগ পায়। ইলিশ যত বেশি ছোটাছুটি করবে, আকারে তত বড় হবে।

বাজারে বেশি পাওয়ায় দামও কমে গেছে। ফলে এবার শীত মৌসুমে দক্ষিণাঞ্চলের ঘরে ঘরে ইলিশ নিত্যদিনের খাবারে পরিণত হয়েছে। তবে সবারই একটি অভিযোগ, শীতে পাওয়া ইলিশে স্বাদ নেই, যেমনটি পাওয়া যায় মৌসুমের (জুলাই-আগস্ট-সেপ্টেম্বর) ইলিশে। এ প্রসঙ্গে ড. আনিছুর রহমান বলেন, ইলিশের গতি ঘণ্টায় ৩ কিলোমিটার। একদিনে তারা ৭২ থেকে ৭৪ কিলোমিটার সামনের দিকে ছুটতে পারে। এ গতিতে গভীর সাগর থেকে পদ্মা-মেঘনা কিংবা তার আশপাশের নদনদীতে পৌঁছতে একটি ইলিশের দুই-তিন দিন লেগে যায়। ফলে ক্লান্ত ইলিশের শারীরিক গঠনও চুপসে যায়। আবার সাগরের লোনা পানি থেকে নদীর মিঠা পানিতে পৌঁছে তার খাদ্যাভাসেরও পরিবর্তন ঘটে। মিঠা পানিতে অন্তত ১৫ দিন থাকতে পারলে ইলিশের স্বাদের পরিবর্তন হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তার আগেই জেলেদের জালে ধরা পড়ে যায়। আবার অনেক ইলিশ নদীতে প্রবেশের সময় সাগরের মোহনাতেই ধরা পড়ে যাচ্ছে।

ঢাকার শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের প্রভাষক মীর মোহাম্মদ আলী দীর্ঘ বছর ওয়ার্ল্ড ফিশের গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি বলেন, সাগরে ইলিশ যেমন বেড়েছে, তেমনি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবেও ইলিশের গতি-প্রকৃতির কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। শীতে নদীতে ইলিশ বেশি পাওয়ার এটাও একটা কারণ হতে পারে।

মৎস্য অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্যমতে, এ বছরের জানুয়ারিতে বিভাগের ৬ জেলার স্থানীয় নদ-নদীতে মোট ১৯ হাজার ৫৯১ টন ইলিশ পাওয়া গেছে। এর আগে সর্বাধিক পরিমাণ ইলিশ পাওয়া গিয়েছিল ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে, ২০ হাজার ৩৪৭ টন। এর মাঝের তিন বছর যথাক্রমে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ১২ হাজার ২০ টন, ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ৯ হাজার ৬৫৭ টন এবং ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে ১৭ হাজার ৬৯২ টন। মৎস্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে বরিশাল, ভোলা ও পটুয়াখালীর নদী-নদীতে।