সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের নির্মাণ করা অবকাঠামো এবং চলমান বিভিন্ন প্রকল্পের তালিকা তৈরি করছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। তালিকা তৈরির পর তারা সংশ্নিষ্ট সংস্থার কাছে ক্ষতিপূরণ চাওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে। সম্প্রতি সংসদীয় কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনার পর মন্ত্রণালয় এসব পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী জানান, আইন অনুযায়ী সংরক্ষিত বনের ভেতর রাস্তাঘাট, রেললাইন ও বিদ্যুতের লাইন নির্মাণের কোনো সুযোগ নেই। এ পর্যন্ত এ ধরনের অবকাঠামো কী পরিমাণ নির্মিত হয়েছে তার একটি তথ্য সংসদীয় কমিটি সংগ্রহ করেছে। তবে এটি পূর্ণাঙ্গ নয়। এমন অবকাঠামো অসংখ্য পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেন, 'আইন সবার জন্য সমান। এ পর্যন্ত যত অবকাঠামো নির্মিত হয়েছে তাতে বন, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের যে ক্ষতি হয়েছে তার হিসাব করা হবে। সংশ্নিষ্টদের কাছে এর ক্ষতিপূরণ চাওয়া হবে।

সংসদীয় কমিটি সূত্র জানায়, অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে রয়েছে রাস্তাঘাট, রেললাইন ও বিদ্যুতের লাইন। নির্মিত হয়েছে এবং নির্মাণাধীন এ ধরনের অবকাঠামোতে বনের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের কাছে ক্ষতিপূরণ চাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

সূত্র জানায়, জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে অনুষ্ঠিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে কী পরিমাণ সরকারি অবকাঠামো নির্মাণ হয়েছে তা নিয়ে আলোচনা হয়।

ওই বৈঠকে সড়ক ও জনপথ বিভাগ এবং বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় কী পরিমাণ রাস্তাঘাট ও বৈদ্যুতিক লাইন নির্মাণ করেছে তার আংশিক তথ্য তুলে ধরা হয়। তবে সংরক্ষিত বনে কী পরিমাণ রেললাইন রয়েছে সেই তথ্য ওই বৈঠকে উল্লেখ করা হয়নি।

ইতোমধ্যে চিহ্নিত প্রকল্প বা অবকাঠামোগুলোর মধ্যে রয়েছে- চট্টগ্রামের হাজারীখিল সংরক্ষিত বনের অভ্যন্তরে ৯ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ। লিংকরোড থেকে টেকনাফ সড়কের দু'পাশে সড়ক ও জনপথের রাস্তা সম্প্রসারণ। কক্সবাজারের সুরাজপুর মৌজার ইয়াংছা থেকে জিদ্দাবাজার পর্যন্ত সওজের ২৬ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক পাকাকরণ। মাতামুহুরী সংরক্ষিত বনভূমির মধ্য দিয়ে আলীকদম থেকে পোয়ামুহুরী পর্যন্ত ৩৭ দশমিক ৫০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ৯ দশমিক ৮ মিটার প্রস্থের দুই লেনবিশিষ্ট রাস্তা নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। সাঙ্গু সংরক্ষিত বনের মধ্য দিয়ে থানচি-রেমারকি-মদন-লিকরী ৪০ থেকে ৪৫ কিমি. সড়কের নির্মাণকাজ চলছে। গাজীপুর সদর, জয়দেবপুর ও শ্রীপুর উপজেলার মধ্য দিয়ে ৫৬ কিলোমিটার পাকা সড়ক নির্মাণ হয়েছে।
এ ছাড়াও দেশের ৮টি জেলার ২৪টি উপজেলার বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে ৪৫৭ কিলোমিটার বৈদ্যুতিক লাইন নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে মেঘনা-মদুনাঘাট পর্যন্ত ৯ কিলোমিটার ৪০০ কেভি ডাবল সার্কিট বৈদ্যুতিক সঞ্চালন লাইন নির্মাণ চলমান রয়েছে এবং গাজীপুর সদর, জয়দেবপুর ও শ্রীপুর উপজেলার মধ্য দিয়ে ১৭২ কিলোমিটার বৈদ্যুতিক সঞ্চালন লাইন নির্মাণ হয়েছে।

ওই বৈঠকে দীর্ঘ আলোচনা শেষে এসব অবকাঠামো নির্মাণে গাছ-গাছালিসহ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে মন্ত্রণালয়কে তা নিরূপণের দায়িত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সিদ্ধান্ত হয় সরকারের কোন কোন সংস্থা কী পরিমাণ ক্ষতি করেছে তা যাচাই করে তাদের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের জন্য তৎপরতা শুরু করা হবে। এ ছাড়া সংরক্ষিত বনের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের প্রকল্প গ্রহণ না করা হয় তার সুপারিশও আসে বৈঠক থেকে। এমনকি চলমান প্রকল্পগুলো বাইপাস করে বনের পাশ দিয়ে নেওয়া যায় কিনা, তার জন্য বিকল্প প্রস্তাব তৈরিরও সুপারিশ করা হয়।

জানা গেছে, বৈঠকে বন মন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রটোকল তৈরি করে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়, যাতে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় নতুন কোনো প্রকল্প তৈরির সময় সংরক্ষিত বনের বিষয়টি বিবেচনায় আনে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনারও পরামর্শ আসে ওই সভা থেকে।

এ বিষয়ে কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী আরও বলেন, কিছু প্রকল্প রয়েছে যা সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মধ্যে কাজ শুরু করলেও বন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগও করেনি। একনেকে অনুমোদনের দোহাই দিয়ে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়। বলা হয় জাতীয় স্বার্থে এ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বন, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যও জাতীয় স্বার্থের অংশ। একনেকে প্রকল্প পাস হওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রীকে জানানো হয় না যে, এই সড়কটি এমন স্থান থেকে যাবে যেটা সংরক্ষিত বনাঞ্চল। এ জন্য বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রটোকল তৈরি করে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়কে দেওয়া হবে, যাতে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সহজেই বিষয়টি চিহ্নিত করতে পারে।