কারাগারগুলো কবে হবে সংশোধনাগার

প্রকাশ: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০     আপডেট: ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

দেশের বিভিন্ন কারাগারে বর্তমানে ধারণক্ষমতা ৪০ হাজার ৯৪৪ জন। সেখানে আটক বন্দির সংখ্যা ৮৮ হাজার ১৮৫ জন। অর্থাৎ, ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি বন্দি বর্তমানে কারাগারে অবস্থান করছেন। এ হিসাব গত ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত। সরকারি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে এ হিসাব পাওয়া গেছে।

বহু আগে থেকেই অভিযোগ শোনা যায়, আমাদের কারাগারগুলোতে মানবাধিকার ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হয়। নূ্যনতম সুযোগ-সুবিধাও সাধারণ কারাবাসী পান না। গাদাগাদি করে অমানবিক পরিবেশে থাকতে হয়। খাবারদাবারের মানও খুব খারাপ। কারাবাসীর সংশোধনেও নেওয়া হয় না উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগ বা কার্যক্রম।

সরকার নতুন করে বেশকিছু কার্যক্রম হাতে নিয়েছে, যাতে করে কারাবাসী সংশোধনের সুযোগ পাবেন। সূত্র বলছে, কয়েক বছর ধরে কারবাসীর জন্য একের পর এক প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। যাতে দেশের কারাগারগুলো সংশোধনাগার হিসেবে রূপান্তর হতে পারে।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮১৮ সালে রাজবন্দিদের আটকার্থে বেঙ্গল অ্যাক্ট জারি করা হয়। বর্তমানে ঢাকা, রাজশাহী, যশোর, কুমিল্লা এবং কয়েকটি জেলা ও মহকুমা কারাগার ওই সময়ে নির্মিত হয়। ১৭৮৮ সালে একটি ক্রিমিনাল ওয়ার্ড নির্মাণের মধ্য দিয়ে ঢাকা কারাগারের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ১৮৬৪ সালে সব কারাগার পরিচালনা ব্যবস্থাপনার মধ্যে এক সমন্বিত কার্যক্রম প্রতিষ্ঠিত হয় কোড অব রুলস চালুর মাধ্যমে। ১৯২৯ সালে অবিভক্ত বাংলার কলকাতার প্রেসিডেন্সি, আলিপুর, মেদিনিপুর এবং বাংলাদেশের ঢাকা ও রাজশাহীকে কেন্দ্রীয় কারাগার হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর চারটি কেন্দ্রীয় কারাগার, ১৩টি জেলা কারাগার এবং ৪৩টি উপকারাগার নিয়ে বাংলাদেশের যাত্রা শুরু।

বর্তমানে ১৩টি কেন্দ্রীয় কারাগার এবং ৫৫টি জেলা কারাগার নিয়ে কার্যক্রম চলছে। বাংলাদেশ কারাগারের ভিশন হচ্ছে, 'রাখিব নিরাপদ, দেখাব আলোর পথ'। এ ছাড়া কারাগারের অন্যতম একটি লক্ষ্য হচ্ছে, বন্দিদের সঙ্গে মানবিক আচরণ করা। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, কারাগারগুলোতে মানবাধিকার ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। কারাগারগুলোর সুন্দর বা সুউচ্চ ভবন তৈরিসহ বাহ্যিক উন্নতি হয়েছে বটে, তবে মানবিকতার উন্নতি হয়নি।

সংশ্নিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রত্যেক বন্দির জন্য যথেষ্ট পরিমাণ তেল-মসলা বরাদ্দ দেওয়া আছে জেল কোড অনুসারে। বন্দিদের জন্য প্রতিদিন বরাদ্দ ডাল ১৪৫ গ্রাম, মসলা ১৫ গ্রাম, সবজি ২৯১ গ্রাম, ভোজ্যতেল ৪১ গ্রাম, মাছ ৭২.৯০ গ্রাম, খাসির মাংস ৭২.৯০ গ্রাম এবং গরুর গোশত ৭৭.৫৬ গ্রাম। কিন্তু বরাদ্দ করা খাদ্যের তিন ভাগের এক ভাগও পান না বন্দিরা।

বিশ্নেষকরা মনে করেন, কারাগারের বন্দিদের অবহেলা না করে তারা যাতে আলোর পথ দেখতে পান অর্থাৎ, কারাগার যাতে শোষণাগার না হয়ে সংশোধনাগার হয় সেই ব্যবস্থা করতে হবে সরকারকে।

কারাগার উন্নয়নে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। বেশকিছু কার্যক্রম চলছে কয়েক বছর ধরে। কারা কর্তৃপক্ষ আশা করছেন এই কার্যক্রমগুলো সম্পন্ন হলে পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হবে। কারবাসীরা সংশোধনের সুযোগ পাবেন।

কারা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ২৮টি কারাগারে ৫৩ হাজার তিনজন বন্দিকে ৩৮টি আত্মকর্মসংস্থানমূলক ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। বন্দিদের আত্মকর্মসংস্থানমূলক কাজের প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারে গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি চালু করা হয়েছে। কারাগার থেকে মুক্তির পর তাদের সমাজে পুনর্বাসন করার জন্য সমাজসেবা ও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বন্দিদের আত্মকর্মসংস্থানমূলক প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য কেন্দ্রীয় কারাগার-২ অর্থাৎ, গাজীপুরে বন্দি পুনর্বাসন প্রশিক্ষণ স্কুল চালু করা হয়েছে।

গত বছর অর্থাৎ, ২০১৯ সালের মার্চ মাসে টাঙ্গাইল জেলা কারাগারে টেলিফোন বুথ 'স্বজন' চালু করা হয়েছে। যাতে এই কারাগারের আটক বন্দিরা তাদের আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ফোনে কথা বলতে পারেন।

২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত প্যারালিগ্যাল কার্যক্রমের উদ্যোগে ৯৭ হাজার ৯৪০ বন্দিকে আইনি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। ওই সময়ে আইনি সহায়তার ফলে ১১ হাজার ১৪০ বন্দি মুক্তি পেয়েছেন।

কারাবন্দিদের ধর্মীয় শিক্ষা প্রদানের জন্য নিয়োজিত ধর্মীয় উপদেষ্টাদের প্রতিবার ভিজিটের জন্য ফি ৫০ টাকার বদলে ২০০ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। কয়েদিদের উৎপাদিত পণ্যের বিক্রয়লব্ধ অর্থ থেকে লভ্যাংশের ৫০% সংশ্নিষ্ট কয়েদিকে দেওয়া হচ্ছে। কারাভ্যন্তরে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা কাজে নিয়োজিত কয়েদি পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের মাসিক মজুরি ২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।

কারাবন্দিদের সকালের নাশতায় রুটি-গুড়ের পরিবর্তে সপ্তাহে দু'দিন খিচুড়ি, একদিন হালুয়া রুটি ও চার দিন সবজি রুটি প্রদানের জন্য অর্থ বিভাগের সম্মতিক্রমে এ বিভাগ থেকে সম্মতিপত্র কারা অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। ইতোমধ্যে পবিত্র রমজান মাসে কারাগারে আটক বন্দিদের ইফতার বাবদ জনপ্রতি ১৫ টাকা থেকে ৩০ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। আটক বন্দিদের এক কারাগার থেকে অন্য কারাগারে স্থানান্তরকালে খোরাকি ভাতা প্রতিদিন ১৬ টাকা থেকে নূ্যনতম ১০০ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। বাংলা নববর্ষ অর্থাৎ, পহেলা বৈশাখে কারা বন্দিদের উন্নতমানের খাবার পরিবেশনের জন্য জনপ্রতি ৩০ টাকা হারে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বিশেষ দিবস বা উৎসব উপলক্ষে বন্দিদের উন্নতমানের খাবার সরবরাহের জন্য ৩০ টাকার পরিবর্তে ১৫০ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আদালতে পাঠানো বন্দিদের দুপুরের খাবার বাবদ বরাদ্দ ছিল ৩ টাকা ৬০ পয়সা। এটা পরিবর্তন করে ৩০ টাকায় উন্নীত করার জন্য ২০১৮ সালের জুন মাসে অর্থ বিভাগে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

এ ছাড়া কারাগার উন্নয়নে বেশকিছু প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে, কিছু চলমান। এগুলো সম্পন্ন হলে কারাবাসী আরও একটু ভালোভাবে থাকতে পারবেন বলে আশা করছে কারা কর্তৃপক্ষ। ইতোমধ্যে গ্রহণ করা হয়েছে 'পুরাতন ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ইতিহাস, ঐতিহাসিক ভবন সংরক্ষণ ও পারিপার্শ্বিক উন্নয়ন' শীর্ষক প্রকল্প। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার স্থানান্তরিত করা হয়েছে কেরানীগঞ্জে। খুলনা জেলা কারাগার সংশোধন প্রকল্পের কাজ চলছে। শেষ হওয়ার কথা চলতি বছর। রাজশাহী জেলায় কারা প্রশিক্ষণ একাডেমি নির্মাণ কাজ শেষ হবে চলতি বছরেই। ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগার সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ প্রকল্পের কাজও শেষ হওয়ার কথা চলতি বছরে। ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ বিভাগের কারা নিরাপত্তা আধুনিকায়নে প্রকল্প নেওয়া হয় ২০১৬ সালে। কাজ শেষ হওয়া পথে। এদিকে মহিলা কারারক্ষীদের জন্য আবাসন নির্মাণ প্রকল্পের কাজ শেষের দিকে। কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার পুনর্নির্মাণ কাজ চলছে। শেষ হতে এখনও বেশ দেরি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারা কর্মকর্তাদের পদমর্যাদা বৃদ্ধি এবং বেতনস্কেল আপগ্রেড করা হয়েছে। কারারক্ষীরা ঝুঁকিভাতা পাচ্ছেন। কারা কর্মচারীদের ছেলেমেয়েদের স্কুল বাস দেওয়া হয়েছে। কারা কর্মচারীদের ছেলেমেয়েদের জন্য বেসরকারি কারা প্রাথমিক বিদ্যালয় সরকারি করা হয়েছে।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সমকালকে বলেন, 'কারাগারগুলো সংশোধনাগার করার জন্য ইতোমধ্যে সরকার মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। বাস্তবায়নের কার্যক্রম চলমান। এতে কারাবাসীর সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব হবে। বিনা বিচারে বা অপরাধে যারা কারাগারে রয়েছেন, তাদের চিহ্নিত করতে মন্ত্রণালয় থেকে কমিটি গঠন করা হয়েছে। এমন আসামি থাকলে কমিটি তাদের চিহ্নিত করে মুক্তির ব্যবস্থা করছে। এই কার্যক্রম চলমান থাকবে।'

মন্ত্রী আরও বলেন, 'কারাগারে প্রতিটি আসামির সুরক্ষা দিতে সরকার সচেষ্ট। কারাবন্দিদের নিয়ম অনুযায়ী যা যা প্রাপ্য, সব কিছুই দেওয়া হচ্ছে। আসামিদের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য স্বরাষ্ট্র থেকে আইন মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানো হয়েছে। সার্বিক প্রেক্ষাপটে মানবাধিকার লঙ্ঘন হতে পারে না।'

জানতে চাইলে কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম মোস্তফা কামাল পাশা সমকালকে বলেন, দেশের কারাগারগুলো মানবিক করতে সরকার ইতোমধ্যে অনেকগুলো পদক্ষেপ নিয়েছে। কারাবন্দিদের প্রশিক্ষিত করে তাদের বিভিন্ন কাজে লাগানো হচ্ছে। তাদের তৈরি করা উন্নতমানের হ্যান্ডিক্রাফট বা হস্তশিল্প বাজারজাত করা হচ্ছে। বিক্রি করা পণ্যের লভ্যাংশ তাদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। সম্প্রতি রপ্তানি উন্নয়ন মেলায় তাদের উৎপাদিত পণ্যের স্টল প্রথম পুরস্কার পেয়েছে। এগুলো কারাগারের উন্নয়নের নিদর্শন।

কারা মহাপরিদর্শক আরও বলেন, কারাবন্দিদের সব সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। কারাগারে বন্দি আসামিদের বিচার দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। এ জন্য কারাগার থেকে এ-সংক্রান্ত চিঠি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। আশা করি, দ্রুত কারাবন্দির সংখ্যা কমে আসবে। তিনি বলেন, কারাবন্দিদের সামাজিক পুনর্বাসনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তাদের সংশোধন করার জন্য কক্সবাজারের উখিয়ায় প্রায় ৬০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। সেখানে পুনর্বাসনসহ অন্যান্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী কারাগারকে সংশোধনাগারে রূপান্তরের সব ধরনের কার্যক্রম হাতে নিয়েছে সরকার।