চীনের উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া সংক্রামক ব্যাধি করোনাভাইরাস নিয়ে বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক চলছে। বাংলাদেশে এখনও এই ভাইরাসে সংক্রমিত কোনো রোগী পাওয়া না গেলেও দেশজুড়ে আতঙ্ক আছে। চীনের সঙ্গে গভীর বাণিজ্যিক সম্পর্কের কারণে দেশটির হাজার হাজার নাগরিক এ দেশে যাতায়াত করছেন। করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর তাদের আসা কিছুটা কমেছে। তবে এখনও চীন থেকে প্রতিদিন প্রায় সাতশ' মানুষ বাংলাদেশে প্রবেশ করছেন। বিমানবন্দরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই চীন থেকে আসা এসব যাত্রীকে বাংলাদেশে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। চীনফেরত এক যাত্রীর এ-সংক্রান্ত একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস ভাইরাল হয়েছে।

সমকালসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমেও এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সংসদেও আলোচনা হয়েছে। জাতীয় পার্টির একজন এমপি বিমানবন্দরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া যাত্রীদের প্রবেশের অভিযোগ তদন্ত করে দেখার দাবি করেছেন। তিনি বিষয়টি নিয়ে সংসদে স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে বক্তব্য দেওয়ার আহ্বান জানান। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নড়েচড়ে বসেছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

এবার শুধু চীন নয়, বিদেশ থেকে আসা সব যাত্রীকে স্ট্ক্রিনিং করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। গতকাল শনিবার সরকারের জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদি সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, বিশ্বের যে কোনো দেশ থেকে কেউ বাংলাদেশে প্রবেশ করতে চাইলে বন্দরে স্ট্ক্রিনিংয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।

আইইডিসিআর পরিচালকের এ ঘোষণার পর তা নিয়েও আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। শুধু চীন থেকে আসা যাত্রীদেরই যেখানে স্ট্ক্রিনিং সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয়নি, সেখানে সব যাত্রীর স্ট্ক্রিনিং করা কতটুকু সম্ভব হবে- এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিমানবন্দরে স্থাপন করা হেলথ ডেস্কের আদৌ সেই সক্ষমতা আছে কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

সরেজমিনে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গিয়েও এর সত্যতা মিলেছে। বিদেশ থেকে আসা যাত্রীদের বিমানের ভেতরে মাস্ক পরানো হয়নি। এমনকি যে বিমানবন্দর থেকে তারা ফ্লাইটে চড়েছেন, সেই বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষও মাস্ক পরা-সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা দেয়নি। এ কারণে মাস্ক ছাড়াই বিদেশ থেকে আসা যাত্রীরা শাহজালালে অবতরণ করছেন।

গতকাল বিকেলে কাতার এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মুরাদনগরের সিঙ্গারবিল গ্রামের এনাম আহমেদ শাহজালালে অবতরণ করেন। ইমিগ্রেশন শেষে তিনি সমকালকে বলেন, ফ্লাইট থেকে নামার পর একটি স্টিলের গেটের ভেতর দিয়ে ইমিগ্রেশনে প্রবেশ করতে হয়েছে। তবে এটা করোনাভাইরাস মেশিন কিনা তা তার জানা নেই। ব্যাংকক থেকে আসা বাংলাদেশ বিমানের কয়েকজন যাত্রী একই কথা বলেন। তারা বলেন, বিমানবন্দরে যাত্রীদের করোনাভাইরাস পরীক্ষা করা হয়েছে কিনা, সেটি তারা জানেন না। তবে ফ্লাইট থেকে নামার পর দুটি স্টিলের বিশেষ দরজার পথ দিয়ে এসে তারা ইমিগ্রেশনে প্রবেশ করেছেন।

প্রশ্ন উঠেছে, দেশের সব বন্দরে আসা যাত্রীদের স্ট্ক্রিনিং করার সক্ষমতা স্বাস্থ্য বিভাগের আছে কিনা। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইইডিসিআর পরিচালক বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগ একা নয়, বিভিন্ন এয়ারলাইন্স, বন্দর কর্তৃপক্ষসহ সংশ্নিষ্ট সবার সহায়তায় এ কাজ করা হচ্ছে।

বিমানবন্দর হেলথ ডেস্কের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. শাহরিয়ার সাজ্জাদ সমকালকে বলেন, শনিবার দুপুর পর্যন্ত বিদেশ থেকে আসা ১৩টি বিমানের যাত্রীদের স্ট্ক্রিনিং করা হয়েছে। অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হলেও প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করার জন্য তাদের প্রস্তুতি আছে। বিমানবন্দরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, সিভিল এভিয়েশন থেকে শুরু করে অন্যান্য সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও এ কাজে সহায়তা করছেন।

তবে তিনি বলেন, স্ট্ক্রিনিং করতে গিয়ে একটু সময় লাগলে কিছু যাত্রী, বিশেষ করে বাংলাদেশিরা ক্ষেপে যান। অনেক সময় কিছু বিশৃঙ্খলারও সৃষ্টি হয়। এজন্য যাত্রীদেরও সহায়তা প্রয়োজন। সবার সহায়তা পেলে কাজটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।

ডা. সাজ্জাদ আরও বলেন, এতদিন স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে বিমানের যাত্রীদের কাছে হেলথ ফরম সরবরাহ করা হতো। একজন যাত্রীর এটি পূরণ করতে সময় ব্যয় হতো। এখন এটি যাতে তারা বিমানে বসেই করতে পারেন, সে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সব এয়ারলাইন্স যাতে নিজ উদ্যোগে এই হেলথ ফরমটি যাত্রীদের সরবরাহ করে সেজন্য আজ রোববার বিমানবন্দরে একটি সভা করা হবে। তারা বিষয়টি মেনে নিয়ে সহায়তা করবেন বলে আশা তার।

শাহজালাল বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এএইচএম তৌহিদ-উল আহসান সমকালকে বলেন, ঢাকায় প্রতিদিন আন্তর্জাতিক রুটের প্রায় দুইশ'র মতো বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণ করে। এতে প্রায় ২০ হাজারের মতো যাত্রী যাতায়াত করেন। বিদেশ থেকে আসেন সাড়ে ১২ হাজারের মতো। এর মধ্যে চীন থেকে এখনও প্রায় ৭০০ থেকে ৭৫০ জনের মতো যাত্রী আসেন। আগে শুধু চীন থেকে আসা যাত্রীদের স্ট্ক্রিনিং করা হতো। কিন্তু এখন বিশ্বের সব দেশ থেকে আসা যাত্রীর স্ট্ক্রিনিং করা হবে। গতকাল সকাল থেকে এটি শুরু হয়েছে। কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তিন-চারটি বিমান পরপর অবতরণ করলে তখন যাত্রীরাও প্রায় কাছাকাছি সময়ে বিমানবন্দরে ভিড় করেন। তখন একটু জটলা হয়। তবে সেটি নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সমস্যা হয়নি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার সমকালকে বলেন, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, মংলা ও চট্টগ্রাম নৌবন্দর এবং ২৪টি স্থলবন্দরে ২১ জানুয়ারি থেকে ৫৮ হাজার ২৮৬ জনকে স্ট্ক্রিনিং করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ঢাকায় সন্দেহজনক একজনকে পাওয়া গেছে। তাকে পরীক্ষা করে করোনাভাইরাস সংক্রমণ পাওয়া যায়নি। সব বন্দরে পূর্ণাঙ্গ স্ট্ক্রিনিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ সমকালকে বলেন, বিদেশ থেকে আসা সব যাত্রীর পরীক্ষা-নিরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য ইতোমধ্যে বিমানবন্দরে অতিরিক্ত চিকিৎসক, নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মী পদায়ন করা হয়েছে। বিমানবন্দরে সাধারণ যাত্রীদের জন্য দুটি স্ক্যানার মেশিন এবং ভিআইপি জোনে একটি মেশিন রয়েছে। এই স্ক্যানারের মধ্য দিয়ে কোনো যাত্রী হেঁটে গেলে সঙ্গে সঙ্গে তার শরীরের তাপমাত্রা দেখা যায়। যে যাত্রীর শরীরে ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইট কিংবা তার বেশি তাপমাত্রা পাওয়া যাবে, তাকেই পৃথক করা হবে। ওই ব্যক্তির সঙ্গেই চিকিৎসক ও মেডিকেল টিমের সদস্যরা কথা বলে তার কাছ থেকে তথ্যাদি সংগ্রহ করবেন। প্রয়োজনে তাকে হাসপাতালে ভর্তি কিংবা কোয়ারেন্টাইন করে রাখার ব্যবস্থা করা হবে। সুতরাং বিষয়টি নিয়ে জটিলতা হবে বলে মনে হয় না। তবে প্রক্রিয়াটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করার জন্য সবার সহায়তা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

আইইডিসিআর পরিচালক ডা. ফ্লোরা বলেন, বিশ্বের যে কোনো দেশ থেকে বাংলাদেশের বিমান, নৌ ও স্থল বন্দরে প্রবেশ করা সব যাত্রীকে স্ট্ক্রিনিংয়ের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। চীন ছাড়াও কয়েকটি দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমিত হয়েছে। এ কারণে বিদেশ থেকে আসা সব যাত্রীকেই স্ট্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, চীন এবং আরও পার্শ্ববর্তী কয়েকটি দেশের যাত্রীদের এই স্ট্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনলেই যথেষ্ট ছিল। তবে বাড়তি সতর্কতার অংশ হিসেবে এটি চালু করা হয়েছে।

এই স্ট্ক্রিনিং কার্যক্রম নিয়ে ভীত না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এটি বাড়তি সতর্কতা। গত শুক্রবার থেকে এই কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এটি কতদিন চলবে, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

দেশের সব বন্দরে আসা যাত্রীদের স্ট্ক্রিনিং করার সক্ষমতা স্বাস্থ্য বিভাগের আছে কিনা- এমন প্রশ্নের জবাবে পরিচালক বলেন, শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের একা নয়, বিভিন্ন এয়ারলাইন্স, বন্দর কর্তৃপক্ষসহ সংশ্নিষ্ট সবার সহায়তায় কাজটি করা হচ্ছে। আমরা এয়ারলাইন্সগুলোর সহযোগিতা নিচ্ছি। ফ্লাইটের মধ্যে যে ডিক্লারেশন ফর্ম দেওয়া হয়, তাতে এয়ারলাইন্সগুলো সহায়তা করে। সম্মিলিতভাবেই কাজটি করা হচ্ছে। যেসব বন্দরে থার্মাল স্ক্যানার নেই, সেখানে হ্যান্ডহেল্ড স্ক্যানার দেওয়া হয়েছে। থার্মাল স্ক্যানার এবং হাত দিয়ে যেটা করা হয়, দুটির কার্যক্রম একই।

অধ্যাপক ফ্লোরা বলেন, বিমানযাত্রীদের থার্মাল স্ক্যানারের মধ্য দিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি তাদের স্বাস্থ্যগত অবস্থা সম্পর্কিত একটি কার্ড পূরণ করতে হচ্ছে। থার্মাল স্ক্যানারে পরীক্ষায় কোনো যাত্রীর শরীরের তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের বেশি পাওয়া গেলে প্রথমে তাকে বিমানবন্দরের পর্যবেক্ষণ কক্ষে রাখা হচ্ছে। পরে প্রয়োজনে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। চীন থেকে কেউ জ্বর নিয়ে না এলেও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী তাকে বাসাবাড়িতে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কোয়ারেন্টাইন থাকতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে কারও জ্বর হলে আইইডিসিআরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

করোনাভাইরাস নিয়ে আতঙ্কের মধ্যে দেশজুড়ে মাস্কের ব্যবহার বৃদ্ধির কারণে এ নিয়ে বাণিজ্য হচ্ছে- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে পরিচালক বলেন, রোগী ও রোগীর চিকিৎসায় নিয়োজিত ব্যক্তি ছাড়া অন্যদের মাস্ক ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। চীনে অনেকে মাস্ক ব্যবহার করে ঘুরছেন। চীনে অনেকে আক্রান্ত এবং অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে- এমন আশঙ্কা থেকে সেদেশে সবাই মাস্ক ব্যবহার করছেন। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাস আক্রান্ত কাউকে পাওয়া যায়নি। সুতরাং এখনই সবার মাস্ক পরার কোনো প্রয়োজন নেই।

চীন থেকে আনা ৩১২ জনের বিস্তারিত তুলে ধরে তিনি বলেন, তাদের মধ্যে আশকোনা হজ ক্যাম্পে কোয়ারেন্টাইনে রাখা ৩০১ জন সুস্থ আছে। এ ছাড়া ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন ১১ জনও সুস্থ আছে। এখন পর্যন্ত সন্দেহজনক ৫৩ জনের নমুনা সংগ্রহ করে কারও মধ্যে করোনাভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়নি।