অসাম্প্রদায়িক শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলনে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ায় শপথ

প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০     আপডেট: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০      

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক

৯৬২ ও ১৯৮৩ সালের শিক্ষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন ভিপি নুর -সমকাল

১৪ই ফেব্রুয়ারি বিশ্ব ভালোবাসা দিবস হিসেবে সবার কাছে পরিচিত হলেও বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ১৯৮৩ সালের এই দিনটি। অনেকে এই দিনটিকে পালন করেন ‘স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে। এই দিনেই জেনারেল এরশাদের সামরিক সরকারের বিতর্কিত শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে শুরু হয় ছাত্র আন্দোলন, যা কালক্রমে যেটি গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছিল। 

শুক্রবার সকালে রাজধানীর শিক্ষা ভবনের সামনে ১৯৬২ ও ১৯৮৩ সালের শিক্ষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান বিভিন্ন প্রগতিশীল রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠনগুলো। শ্রদ্ধা জানিয়ে তারা এদেশে গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক শিক্ষা প্রচলনে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার শপথ গ্রহণ করেন।   

তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ড. মজিদ খান ১৯৮২ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর একটি নতুন শিক্ষানীতির প্রস্তাব করেন। সেখানে প্রথম শ্রেণি থেকেই আরবি ও দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে ইংরেজি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়। উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য মাপকাঠি করা হয় মেধা অথবা পঞ্চাশ শতাংশ ব্যয়ভার বহনের ক্ষমতা। এই নীতি ঘোষণার পর থেকেই আন্দোলন শুরু করে শিক্ষার্থীরা। ছাত্রসমাজের দাবি ছিল একটি অবৈতনিক বৈষম্যহীন শিক্ষানীতি। কিন্তু মজিদ খান যে নীতি ঘোষণা করেন, সেখানে বাণিজ্যিকীকরণ আর ধর্মীয় প্রতিফলন ঘটেছে বলে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন। তাই শুরু থেকেই ওই নীতির বিরোধিতা করতে শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।

সে বছরই ওই শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনের বিষয়ে একমত হয় ছাত্র সংগঠনগুলো। এরই ধারাবাহিকতায় ১৪ই ফেব্রুয়ারিতে স্মারকলিপি দিতে শিক্ষার্থীরা মিছিল করে সচিবালয়ের দিকে যাবার সময় পুলিশ গুলি চালায়। এতে জয়নাল ও দীপালি সাহাসহ নিহত হন অন্তত ১০জন। তবে হতাহতের এই সংখ্যার বিষয়ে তখন সরকারিভাবে কোন বক্তব্য দেওয়া হয়নি। বিকালে এবং পরের দিনও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান চলে বলে তিনি জানান। পুলিশ অনেক ছাত্র-ছাত্রীকে গ্রেপ্তার করে নির্যাতন চালায়। এর কিছুদিন পরে সরকার একটি ঘোষণা দিয়ে শিক্ষানীতিটি স্থগিত করে।

স্মৃতিস্তম্ভে ৯০’র ডাকসু ও সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য, মধ্য ফেব্রুয়ারি ’৮৩ স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, সন্ত্রাসবিরোধী ছাত্র ঐক্য, বাংলাদেশ ছাত্র সমিতি, ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর, বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের কেন্দ্রীয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটিসহ বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে শদ্ধাঞ্জলী জানানো হয়।  

স্মৃতিচারণ করে মধ্য ফেব্রুয়ারি ’৮৩ স্মৃতি সংরক্ষণ পরিষদের নেতা আনোয়ারুল হক বলেন, ১৯৮৩ সালের এই দিনে বাংলাদেশের ছাত্র সমাজ এক ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলো। স্বৈরাচার এরশাদ যখন আমাদের ওপর সামরিক শাসনের জগদ্দল পাথর চাপিয়ে দিলো, আমাদের সমস্ত গণতান্ত্রিক অধিকার এমনকি শিক্ষার অধিকার কেড়ে নিলো, তখন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলো একত্রে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলেন শিক্ষা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিতে। এই ১৪ ফেব্রুয়ারিই ছিলো মূলত এরশাদকে উৎখাতের সূচনাপর্ব।

তিনি বলেন, বর্তমানে আমাদের অনেকের কাছেই এই ১৪ ফেব্রুয়ারির সংগ্রাম অনেকটা স্মৃতির আঙিনায় পরিণত হয়েছে। এই দিনটাকে শুধুমাত্র স্মৃতির আঙিনা হিসেবে না রেখে, আমরা এই দিনকে ভবিষ্যতের স্বপ্ন হিসেবে রাখতে পারি না? বর্তমান প্রজন্ম ও ছাত্রসমাজকে এই দিনটাকে ভবিষ্যতের স্বপ্ন হিসেবে দেখতে হবে।

তৎকালীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা এম এ জলিল বলেন, সেদিন আমরা গণতন্ত্রের জন্য, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য এবং অবরুদ্ধ গণতন্ত্রকে মুক্ত করার জন্য সমগ্র ছাত্রসমাজ ও জনগণ মিলে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলাম। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে সেই সূচনা থেকে নব্বইয়ের গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারের পতন হয়েছিলো।

তৎকালীন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সহ-সভাপতি (ভিপি) ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, সেদিন যদিও আমরা মজিদ খানের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছিলাম, কিন্তু তার লক্ষ্য ছিলো সামরিক স্বৈরতন্ত্রকে অপসারণ করে গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনার। তবে বর্তমান বাংলাদেশ এমন স্থানে এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে গণতান্ত্রক চর্চা বিভিন্ন প্রতিকূলতার সম্মুখীন হচ্ছে। এজন্য আমাদের গণতন্ত্রের সংগ্রাম চালাতেই হবে।

তিনি বলেন, বর্তমানে শিক্ষাব্যবস্থা সাম্প্রদায়িক ও পাকিস্তান ধারায় পরিবর্তিত হচ্ছে। যে শিক্ষানীতি আমরা দীর্ঘ সংগ্রামের পর আদায় করেছিলাম, সেই শিক্ষানীতি থেকে আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থাকে সরিয়ে আনা হচ্ছে। এর বিরুদ্ধেও আমাদের সংগ্রাম করার শপথ নিতে হবে।

ডাকসু ভিপি নুরুল হক নুর বলেন, আমরা দেখেছি স্বৈরশাসকদের আঘাতে বিভিন্ন সময় এদেশের গণতন্ত্র অবরুদ্ধ হয়েছে। ছাত্রসমাজ সবসময়ই সেই গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধারে এগিয়ে এসছে। যখন থেকে স্বৈরশাসক এরশাদ অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছে, তখন থেকেই ছাত্রসমাজ তার পতনের দাবিতে আন্দোলন করে আসছিলো। ১৯৮৩ সালে মজিদ খান শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ছাত্রদের যে আন্দোলন ছিলো তা একটি ইস্যু ছিলো মাত্র। এর মূলে ছিলো এরশাদের অগণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন। 

তিনি বলেন, যখনই অগণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় থেকেছে, তারা রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে মানুষের ওপর নানাভাবে, নানা কৌশলে নির্যাতন-নিপীড়ন চালিয়েছে, যে কারণে দেখা যায় মানুষ সবসময় রাজপথে আসতে পারে না, প্রতিবাদও করতে পারে না। তবে যখনই ছাত্ররা ঐক্যবদ্ধভাবে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে, মানুষের অধিকার আদায়ে রাজপথে নেমেছে, তখন সাধারণ মানুষ স্বতস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেছে। ভবিষ্যতেও মানুষ ছাত্র আন্দোলনে সংহতি জানাবে।