ভোট এবার জমবে তো

প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০     আপডেট: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সমকাল প্রতিবেদক

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে ভোটের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার ঘোষণা করা হয়েছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচনের তফসিল। আগামী ২৯ মার্চ দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই নগরীতে অনুষ্ঠিত হবে ভোট। একই সঙ্গে বগুড়া-১ ও যশোর-৬ আসনের উপনির্বাচনেও ভোট গ্রহণ হবে একই দিনে। চসিকের সব কেন্দ্রেই থাকবে ইভিএম আর দুই উপনির্বাচন হবে ইভিএম ছাড়া সাধারণ ব্যালট পেপারে। এবার সকাল ৮টার পরিবর্তে ভোট শুরু হবে ৯টায় এবং শেষ হবে বিকেল ৫টায়। ইসি কার্যালয়ের সচিব বলেছেন, ভোটারদের ঘুম থেকে উঠতে দেরি হওয়ায় কমিশন সকাল ৯টায় ভোট শুরুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে কম ভোট পড়ার হার নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা এখনও থামেনি। নির্বাচন কমিশন, সরকার, রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজসহ বিভিন্ন পক্ষের নানা বিশ্নেষণ চলছে কম ভোটার উপস্থিতি নিয়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত কয়েকটি স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচন প্রক্রিয়া ভোটারদের মনে আস্থার সংকট তৈরি করেছে। ভোটদানে বাধা, জাল ভোট দেওয়া, বিরোধী প্রার্থীদের অংশ না নেওয়া ইত্যাদি নানা কারণে ভোটাররা ভেবে নিচ্ছে ভোট দেওয়া-না দেওয়া সমান। ফলে ঘোষিত তফসিলে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনগুলো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও সুষ্ঠু হওয়া নিয়ে শঙ্কায় সংশ্নিষ্টরা।

গতকাল রোববার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বৈঠক শেষে ইসি সচিব মো. আলমগীর তফসিল ঘোষণা করেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদার সভাপতিত্বে এই সভায় অন্য কমিশনার এবং ইসি কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন।

ঢাকার দুই সিটিতে নগণ্য ভোটার উপস্থিতির পর এবার উল্লিখিত তিন এলাকায় ভোট জমবে তো- তফসিল ঘোষণার পর থেকেই মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে এই প্রশ্ন। নির্বাচন বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, ভোটারদের কেন্দ্রে উপস্থিত করতে না পারলে সার্বিক বিচারে গণতন্ত্রেরই ক্ষতি হবে। তারা প্রধান দলগুলোকে এ ব্যাপারে কার্যকর ভূমিকা নেওয়ারও আহ্বান জানান।

অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করার পরামর্শ বিশ্নেষকদের :এ বিষয়ে বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্নেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ সমকালকে বলেন, ভোটের হার কমে যাওয়া গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়। এটা রাজনীতিবিদের ব্যর্থতা। এর সবচেয়ে বেশি দায় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের। অতীতের নির্বাচনগুলোতে সরকারি দলের প্রার্থীরা কেন্দ্র দখল, বিরোধী পোলিং এজেন্টদের বের করে দেওয়া এবং প্রতিপক্ষের কর্মী-সমর্থকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। সেসব অভিজ্ঞতা থেকে ভোটাররা বিমুখ হয়ে পড়েছে। সরকার ও নির্বাচন কমিশন যদি ঢাকা সিটি নির্বাচন থেকে শিক্ষা নিয়ে ভোটারদের অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে আশ্বস্ত না করে- এবারও একই চিত্র দেখার সম্ভাবনা রয়েছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী সমকালকে বলেন, নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য করতে হলে সরকার, নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল ও ভোটার- চার পক্ষের ভূমিকা রয়েছে। ভোটারদের আস্থা ফেরাতে ওয়ার্ডভিত্তিক মতবিনিয়ম সভার আয়োজন করতে হবে কমিশনকে। প্রয়োজনে সুশীল সমাজকে সঙ্গে নিতে হবে। নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ করতে যে পরিবেশ দরকার তা নিশ্চিত করতে হবে সরকারকে। প্রার্থীদের কাজ হবে ভোটাররা যাতে ভোটকেন্দ্রে যায় সে বিষয়ে ভূমিকা রাখা। আর একজন যোগ্য প্রার্থী নির্বাচিত করা একজন ভোটারের নাগরিক দায়িত্ব।

গত জানুয়ারিতে চট্টগ্রাম-৮ আসনের উপনির্বাচনে ভোট পড়েছিল ২৩ শতাংশ। আর চলতি মাসে সর্বশেষ অনুষ্ঠিত ঢাকার দুই সিটিতে নির্বাচনে গড়ে ২৭.১৫ শতাংশ ভোট পড়ে। ইভিএমে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ভোটার উপস্থিত কম হওয়ায় সমালোচনার মুখে পড়েছে ইসি।

বিশ্নেষকরা বলছেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর থেকে ভোটের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমছে। সব রাজনৈতিক দলের অংশ না নেওয়া, বিরোধী দলের সহিংসতা, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ায় নির্বাচনের প্রতি মানুষের আস্থা কমতে থাকে। এরপর অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে ত্রুটিপূর্ণ ব্যবস্থাপনা, অনিয়ম, জালিয়াতির শক্ত প্রমাণ থাকলেও ইসির এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর অনৈতিক তৎপরতায় নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি ভোটাররা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।

ঢাকা সিটি নির্বাচনের পর অন্যতম বিরোধী দল বিএনপি অভিযোগ করেছে, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে সরকার ও নির্বাচন কমিশন বারবার ব্যর্থ হওয়ায় জনগণ ভোটের প্রতি আস্থা হারিয়েছে। সিটি নির্বাচনে ভোটার কম হওয়া এরই প্রমাণ। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে দাবি করলেও তারাও ভোট কম পড়ার বিষয়ে উদ্বিগ্ন। বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগের নেতারা। তবে নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য ভোটারদের কেন্দ্রে আনার দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোর। দলগুলো ভোটারদের কেন্দ্রে আনতে ব্যর্থ হচ্ছে।

তফসিল : ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী চসিক এবং দুই আসনের উপনির্বাচনে মনোনয়নপত্র দাখিল করা যাবে ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। মনোনয়ন বাছাই হবে ১ মার্চ। মনোনয়ন নিয়ে আপিল করা যাবে ২ থেকে ৪ মার্চ। আর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ সময় ৮ মার্চ। প্রতীক বরাদ্দ ৯ মার্চ। নির্বাচন কর্মকর্তারা জানান, ইভিএমে ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ার কারণে ব্যালটে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে ইসি। এ জন্য বগুড়া-১ ও যশোর-৬ আসনের ভোট ব্যালটে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ব্যালটে ভোটার উপস্থিতি বাড়বে বলে মনে করছে ইসি।

২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল চসিক নির্বাচনের ভোট গ্রহণ করা হয়। ওই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী সাবেক মেয়র এম মনজুর আলমকে হারিয়ে নির্বাচিত হন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন। এ সিটির মেয়াদ শেষ হবে আগামী ৫ আগস্ট। এ সিটির মোট ওয়ার্ড ৪১টি, সংরক্ষিত ওয়ার্ড ১৪টি, মোট ভোটার ১৯ লাখ দুই হাজার ৮১১ জন।

মেয়র নাছির উদ্দীন ও ৪১ ওয়ার্ডের কাউন্সিলররা দায়িত্ব নিয়ে প্রথম সভা করেছেন ২০১৫ সালের ৬ আগস্ট। স্থানীয় সরকার নির্বাচন আইনে বলা আছে, নির্বাচিত পরিষদের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম সভার পাঁচ বছর মেয়াদ পূরণের দিন থেকে ১৮০ দিন আগে পর্যন্ত যে কোনো দিন নির্বাচন সম্পন্ন করতে হবে। সে হিসাবে চসিকের নির্বাচন হতে হবে ২০২০ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে।

গত ২১ জানুয়ারি যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনের সংসদ সদস্য ও সাবেক জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমাত আরা সাদেকের মৃত্যুতে আসনটি শূন্য হয়। এ ছাড়া ১৮ জানুয়ারি বগুড়া-১ আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য আবদুল মান্নানের মৃত্যুতে আসনটি শূন্য হয়।

তফসিল ঘোষণার একদিন আগেই শনিবার চসিক এবং বগুড়া-১ ও যশোর-৬ আসনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তাদের প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে। চসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম চৌধুরী। অন্যদিকে বগুড়া-১ আসনে উপনির্বাচনে নৌকার প্রার্থী করা হয়েছে এই আসনের প্রয়াত সংসদ সদস্য আবদুল মান্নানের স্ত্রী সাহাদারা মান্নান শিল্পীকে। আর যশোর-৬ আসনের নৌকা পেয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সদর উপজেলা চেয়ারম্যান শাহীন চাকলাদার।