সমকাল অনুসন্ধান: ২

ফুটপাত থেকে শপিংমল সর্বত্র নকল প্রসাধনী

সরকারের সহযোগিতা বাড়ানোর দাবি কোম্পানিগুলোর, অভিযান চালাবে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলো

প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২০২০     আপডেট: ১৪ মে ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

মিরাজ শামস

দেশে প্রসাধনীর বাজার দিন দিন বাড়ছে। ভালো ব্র্যান্ডের প্রসাধনীর জনপ্রিয়তাও বেশ। এ সুযোগে ছড়িয়ে পড়ছে নকল পণ্য। অনেকেই নকল প্রসাধনী কিনে প্রতারিত হচ্ছেন। এমনভাবে নকল হচ্ছে যা দেখে বা ঘ্রাণ নিয়ে বোঝার উপায় নেই। এগুলো ব্যবহারে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। অন্যদিকে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে এবং প্রকৃত ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত  হচ্ছেন।

বাংলাদেশ কসমেটিকস অ্যান্ড টয়লেট্রিজ ইম্পোটার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা গেছে, বছরে প্রসাধনপণ্য বিক্রি হয় প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার। এর ৬০ শতাংশ দেশে উৎপাদন হয়। বাকিগুলো আমদানি করা হয়। কেউ কেউ মনে করেন, বাজারে বিক্রি হওয়া প্রসাধনীর প্রায় অর্ধেক নকল।

প্রসাধনী ছাড়াও নকল ও অবৈধভাবে বাজারে ছাড়া হচ্ছে এমন পণ্যের মধ্যে ওষুধ, সিগারেট, মোবাইল হ্যান্ডসেট ও ইলেকট্রনিক ডিভাইস, নকল রেভিনিউ স্ট্যাম্প উল্লেখযোগ্য।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এক সময় হাতে ও ডাইসের মাধ্যমে নকল প্রসাধনী তৈরি হতো। এখন আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে এমনভাবে নকল করা হচ্ছে, বোঝা দায়। পুরান ঢাকার গলি-ঘুপচিতে বহুতল আবাসিক ভবনে গড়ে তোলা হয়েছে নকল প্রসাধনীর কারখানা। ঢাকার ফার্মগেট, মতিঝিল, গুলিস্তান, যাত্রাবাড়ী, নিউমার্কেটসহ বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখা গেছে, নামিদামি ব্র্যান্ডের নকল প্রসাধনী ফুটপাতে সস্তায় বিক্রি হচ্ছে। এসব পণ্যের নির্দিষ্ট কোনো দাম নেই। ক্রেতার সঙ্গে দরকষাকষির মাধ্যমে দাম ঠিক হয়।

শুধু ফুটপাত নয়, শপিংমল ও মার্কেটেও নকল প্রসাধনী বিক্রি হচ্ছে। ঢাকার কয়েকটি মার্কেটের বিক্রয়কর্মীদের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, বেশিরভাগ নকল পণ্য চকবাজার ও মৌলভীবাজার থেকে আসে। আসল কোম্পানির পণ্যে লাভ কম হওয়ায় মালিকের নির্দেশে তারা এ অপরাধ করছেন। তবে আসল পণ্যও দোকানে রাখছেন। আলাদা করে চিনে নেওয়ার ক্ষমতা নেই ক্রেতাদের। তাদের মতে, দেশি ও বিদেশি সব ধরনের প্রসাধনীই নকল হয়। বিদেশি ব্র্যান্ডের পণ্য বেশি নকল হয়।

প্রসাধনী বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান কারনেসিয়া যুক্তরাষ্ট্রের নিওর, জর্ডানা ও মিলানি ব্র্যান্ডের পণ্য দেশে বাজারজাত করে। গত জুলাই মাসে বাংলাদেশের অনুমোদিত বিপণনকারী হিসেবে চুক্তি সই করে কারনেসিয়া। আগে থেকে এসব ব্র্যান্ডের নকল পণ্য বাজারে বিক্রি হচ্ছে। বৈধ বিপণনের পরও কমেনি। চকবাজারের কয়েকটি কারখানায় এই পণ্য নকল হয় বলে জানান এক প্রসাধনী বিক্রেতা। তিনি বলেন, ইউনিলিভার, ম্যারিকো, জিএসকে, জনসন, এসিআই ও স্কয়ারের মতো নামিদামি ব্র্যান্ডের প্রসাধনী নকল হচ্ছে। এমন কোনো প্রসাধনপণ্য নেই যা অবৈধভাবে ছোট কারখানায় তৈরি হয় না।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের চর্ম ও যৌন রোগ বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. রাশেদ মোহাম্মদ খান সমকালকে বলেন, নকল প্রসাধনী অবশ্যই নিম্নমানের হয়। এসব প্রসাধনীতে ব্যবহূত ক্ষতিকারক কেমিক্যালের কারণে ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। তিনি বলেন, এগুলো দীর্ঘদিন ব্যবহারে চামড়া পাতলা হয়ে যায়। আবার কুঁচকে যায় এবং একজিমার মতো নানা সমস্যা সৃষ্টি হয়। মুখে ব্রণ বেড়ে যায়। কোনো প্রসাধনী ব্যবহারের পর শরীর চুলকালে ব্যবহার বন্ধ করে দিতে হবে। তিনি বলেন, আসল পণ্য যাচাই করে কেনা উচিত। ব্যবহারকারীদের আরও সতর্ক হতে হবে।

ইউনিলিভার বাংলাদেশের পরিচালক (আইন) এস ও এম রাশেদুল কাইয়ুম সমকালকে বলেন, প্রসাধনী কোম্পানিগুলোর ব্যবসা বাড়ছে। এর সঙ্গে নকল প্রসাধনীর বিস্তারও বাড়ছে। এখন দেশে তৈরি ও আমদানি সব পর্যায়ে নকল পণ্য বাজারে আসছে। এর সমাধান কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, প্রথমত বন্দরে কাস্টমস কর্তৃপক্ষের নকল পণ্য আটকানো উচিত। দোকানে বিক্রির ক্ষেত্রে বিএসটিআইর জোরদার তদারকি প্রয়োজন। বিদেশি কোম্পানির পণ্য বৈধ পরিবেশকের মাধ্যমে বাজারে আনার নিয়ম রয়েছে। তবে অবৈধভাবে বাজারে আসছে, যা বন্ধ করা উচিত। নকল রোধে অভিযান বাড়াতে সরকারের অগ্রাধিকার দিতে হবে। এটি সমাধানে এখন পদক্ষেপ না নিলে দিন দিন আরও বেড়ে যাবে। বর্তমানে সচেতনতার অভাবে নকল বেশি হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ভোক্তাদের সচেতন হতে হবে।

স্কয়ার টয়লেট্রিজের বিপণনপ্রধান জেসমিন জামান বলেন, নকল প্রসাধনীর কারণে ঠকছেন ক্রেতারা। অসাধু ব্যবসায়ীদের নকল পণ্য উৎপাদন বন্ধ করা উচিত। দেশে যারা নিয়ম মেনে মানসম্মত পণ্য উৎপাদন করছে তারা সরকারকে রাজস্ব দিচ্ছে। বৈধ কোম্পানি পণ্য উৎপাদনে অনেক ব্যয় করলেও নকল পণ্যের কারণে তারা ক্ষতির শিকার হচ্ছে। তিনি বলেন, নকল পণ্য রোধে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলো চেষ্টা করছে। কিন্তু সক্ষমতা কম থাকায় তেমন কার্যকর হচ্ছে না। সংশ্নিষ্ট আইন বাস্তবায়নে জনবল বাড়িয়ে জোরদার পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। তবে সবচেয়ে বেশি দরকার ক্রেতা সচেতনতা। কারণ প্রসাধনী ব্যবহারের পরে কৌটা নষ্ট করে ফেলা উচিত। পণ্য কেনার সময় বারকোড বা ব্যাচ নাম্বার যাচাই করে কিনলে নকল পণ্য বিক্রির সুযোগ থাকবে না।

রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর তৎপরতা : গত তিন বছরে পুরান ঢাকার চকবাজার, যাত্রাবাড়ী, কেরানীগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ২৬টি নকল প্রসাধনী তৈরির কারখানা বন্ধ করেছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। সংস্থাটির অভিযানে এসব কারখানা সিলগালা করে অবৈধ পণ্য জব্দের মাধ্যমে ধ্বংস করা হয়। সর্বশেষ গত ২ ডিসেম্বর মৌলভীবাজারে একটি কসমেটিকসের কারখানা ও গোডাউনে অভিযান চালিয়ে বেবি লোশন, হেয়ার অয়েল, বেবি অয়েল ও বেবি ক্রিম পাওয়া যায়, যার আনুমানিক বাজার মূল্য ২ কোটি টাকা। এই অবৈধ পণ্য তৈরির কারণে প্রতিষ্ঠানের মালিককে ৩ মাসের কারাদণ্ডসহ এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। গত তিন বছরের অভিযানে ১২৫টি প্রতিষ্ঠানকে নকল প্রসাধনী উৎপাদন, আমদানি ও বিক্রির অপরাধে ২ কোটি ২৫ লাখ ৭৭ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। আর গত এক বছরে এ অপরাধে ৪২ প্রতিষ্ঠানকে ১ কোটি ১৮ লাখ ৫৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। গত তিন বছরে ৩৩ জনকে তিন মাস করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

বিএসটিআইর পরিচালক সাজ্জাদুল বারী সমকালকে বলেন, আগের চেয়ে এখন নকল রোধে অভিযান বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে নকল প্রসাধনীর উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় বেশি ধরা পড়ছে। এ জন্য আরও অভিযান জোরদার করা হবে। বিএসটিআইর সক্ষমতা আরও বাড়ানোর প্রয়োজন। এটি হলে একসঙ্গে জোরদার অভিযান চালিয়ে নকল প্রসাধনী উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। বিশেষ করে রং ফর্সাকারী ও সৌন্দর্য বাড়ানোর প্রসাধনীগুলো নকল বেশি ধরা পড়ছে।

র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম সমকালকে বলেন, নকল প্রসাধনী নিয়ন্ত্রণে আনতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে এখনও নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। ইতোমধ্যে বহু কারখানার উৎপাদন বন্ধ করা হয়েছে। কারখানা সিলগালা, নকল পণ্য ধ্বংস, জেল ও জরিমানার পরেও থেমে নেই অসাধু ব্যবসায়ীরা। এর বড় কারণ, অল্প পুঁজিতে অনেক লাভ। এর ফলে একস্থানে বন্ধ করলেও অন্যস্থানে গিয়ে আবার অবৈধ কারখানা স্থাপন করে উৎপাদন করছে। তিনি বলেন, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি একটি অবৈধ কারখানায় অভিযান চালিয়ে ৩২ ধরনের ব্র্যান্ডের নকল প্রসাধনী তৈরির প্রমাণ মেলে। এজন্য দুইজনকে জেল ও ১০ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। ক্ষতিকারক প্রসাধনী জব্দ করে ধ্বংস করা হয়।

গত অর্থবছরে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অভিযানে প্রসাধনীসহ বিভিন্ন নকল পণ্য তৈরির অপরাধে ১৭৩টি প্রতিষ্ঠানকে ৪৬ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার সমকালকে বলেন, এখন বাজারে অভিযানে সবচেয়ে বেশি ধরা পড়ছে নকল প্রসাধনী। বাজার থেকে প্রসাধনী কিনতে নকল যাচাই করার সুযোগও ক্রেতাদের নেই। যাচাই করার ব্যবস্থা করতে পারে কোম্পানিগুলো। তাহলে ক্রেতারা সঠিক পণ্য কেনার সুযোগ পাবে। পাশাপাশি নকল প্রতিরোধে জনসচেতনতা দরকার। এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো মিলে তরুণদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারে। তরুণরা সোচ্চার হলে নকল পণ্য তৈরি ঠেকানো সহজ হবে। ভোক্তা অধিকার নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। পাশাপাশি ভোক্তারা অভিযোগ দিলে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। শহরে মনিটরিং জোরদার হওয়ায় গ্রামে নকল পণ্য বেশি বিক্রি হচ্ছে। এ জন্য প্রসাধনী ব্যবহারের পরে কৌটা নষ্ট করা উচিত। তাহলে এর প্রবণতা কমবে।

বিভিন্ন উপায়ে হচ্ছে নকল : অপরাধীরা প্রসাধনীর পুরোনো খালি কৌটা সংগ্রহ করে ধুয়েমুছে পরিস্কারের মাধ্যমে বোতলজাত করে বিক্রি করছে। তাদের ব্যবসা বাড়ায় চাহিদা মতো খালি বোতল পাচ্ছে না। চীন থেকে খালি কৌটা, লেভেল ও স্টিকার আমদানি করে নকল পণ্য তৈরি করছে। এসব পণ্য তৈরির কারখানায় নানা ধরনের ক্ষতিকারক উপাদান সম্পূর্ণ ব্যবহার করে তৈরি করছে। বোতলে ৯০ ভাগ নকল ও ১০ ভাগ আসল পণ্য পরের অংশে ব্যবহার করেও তৈরি হচ্ছে। স্থানীয় বাজারে থাকা দেশি ও বিদেশি অনেক ব্র্যান্ডের প্রসাধনী চীনে উৎপাদনে নেই। এরপরেও নমুনা পণ্য পাঠিয়ে সেসব উচ্চমূল্যের পণ্য হুবহু নকল করে আনছে। সিঙ্গাপুর, ব্যাংককসহ নানা দেশ থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য এনে মোড়ক পরিবর্তন করে বিক্রি করছে। দু'এক মাস বা তার কম সময় মেয়াদ থাকা পণ্য কম দামে বৈধ কৌশলে আমদানি করে লেবেল পরিবর্তন করে মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও বাজারে ছাড়ছে নামের বানান পণ্যের কাছাকাছি রেখে গ্রাম পর্যায়ে নকল পণ্য বেশি বিক্রি করছে। ক্ষতিকারক কেমিক্যাল দিয়ে তৈরি করা পণ্যে অনেক ক্ষেত্রে দেশ-বিদেশি ভালো ব্র্যান্ডের নাম বেশি ব্যবহার করে বাজারে ছাড়ছে।