সমকাল অনুসন্ধান : ৫

নকল ও অবৈধ মোবাইল সেটের বাজার ৪০০০ কোটি টাকার

সরকারের রাজস্ব ক্ষতি আড়াই হাজার কোটি টাকা

প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২০     আপডেট: ১৪ মে ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

রাশেদ মেহেদী

বিটিআরসির অভিযান আর বৈধ আমদানিকারকদের সচেতনতামূলক প্রচার সত্ত্বেও অবৈধ এবং নকল মোবাইল হ্যান্ডসেট বিক্রি বন্ধ হচ্ছে না। অবৈধ পথে বিপুল পরিমাণ হ্যান্ডসেট আমদানি বন্ধ না হওয়ার কারণে সরকার যেমন বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি সাধারণ ক্রেতারা নিম্নমানের পণ্য কিনে প্রতারিত হচ্ছেন। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, কিছু ক্ষেত্রে টেলিযোগাযোগ সংস্থার নীতির দুর্বলতার কারণেও অবৈধ বাজার নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হচ্ছে না। ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার সমকালকে বলেন, অবৈধ পথে হ্যান্ডসেট আসা বন্ধ করতে বিটিআরসি ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। এটি স্থাপিত হলে অবৈধ পথে আসা হ্যান্ডসেটে সিমকার্ড সচল হবে না। ফলে অবৈধ বাজার এমনিতেই বন্ধ হয়ে যাবে।
মোবাইল ফোন ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমপিআই) তথ্য মতে, বর্তমানে দেশে অবৈধ ও নকল হ্যান্ডসেটের বাজার প্রায় চার হাজার কোটি টাকার। এর ফলে সরকার বছরে রাজস্ব হারাচ্ছে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা। বিএমপিআইর সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া শহীদ সমকালকে বলেন, বিপুল বিনিয়োগ করে যারা বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন করেছেন তারা অবৈধ কারবারিদের দৌরাত্ম্যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পরিস্থিতি এমন যে, অনেক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ হওয়ার উপক্রম। এ অবস্থায় যত দ্রুত সম্ভব বিটিআরসির এনইআইআরের কার্যক্রম শুরু করা জরুরি।
শুধু মোবাইল হ্যান্ডসেটই যে নকল হচ্ছে কিংবা অবৈধভাবে আসছে, তা নয়। অন্য অনেক পণ্যই নকল হচ্ছে। নকল হচ্ছে প্রসাধন সামগ্রী। জীবন রক্ষাকারী ওষুধও নকল হচ্ছে। বিভিন্ন ধরনের রেভিনিউ স্ট্যাম্পও জাল হচ্ছে। এই অপরাধ শুধু ভোক্তা বা কোম্পানির আর্থিক ক্ষতি করছে না, সরকারও বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে। কর ফাঁকি দিতে সিগারেটও অবৈধভাবে বাজারজাত করছে একটি চক্র।
অনুসন্ধানে জানা যায়, অবৈধ কারবারিরা কয়েকটি পথ অবলম্বন করে দেশে মোবাইল হ্যান্ডসেট নিয়ে আসছে। এর মধ্যে প্রথমটি হচ্ছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্র্যান্ডের রিফারবিশড বা পুনঃসংযোজিত পুরোনো সেট বাজারে এনে আসল বলে বিক্রি করা। দেখা যায়, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের অনেক হ্যান্ডসেট উন্নত দেশে পুরোনো হয়ে গেলে সেগুলো বিশেষভাবে পলিশ করে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে অকেজো হয়ে যন্ত্রাংশ পুনঃসংযোজন করে দেশে আনা হয়। এসব হ্যান্ডসেট বাজারে নতুন বলে বিক্রি করা হয়। বিশেষ করে জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের অপেক্ষাকৃত পুরোনো মডেলের ফোনের 'রিফারবিশড' কপি বেশি বিক্রি হয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি নতুন ও বৈধভাবে উৎপাদিত স্যামসাং এস-১০ মডেলের ফোনের দাম ৮৯ হাজার ৯০০ টাকা। সেই হ্যান্ডসেট ফেসবুকে পেজ খুলে বিজ্ঞাপন দিয়ে মোতালিব প্লাজা ও বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সে মাত্র ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। হ্যান্ডসেটগুলোর সবই রিফারবিশড, তবে নতুন দাবি করে বিক্রি হচ্ছে। এসব হ্যান্ডসেট খালি চোখে দেখে নতুন নাকি রিফারবিশড, তা বোঝার উপায় নেই। একইভাবে আইফোন-৮ প্লাস এবং আইফোন এক্স মডেলের রিফারবিশড ফোন ৩৫ হাজার থেকে ৪৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
আরেকটি পথ হচ্ছে লাগেজ পার্টির মাধ্যমে নতুন মডেলের ফোন কর ফাঁকি দিয়ে দেশে নিয়ে আসা। কর ফাঁকি দেওয়ার ফলে এসব ফোন অসাধু বিক্রেতারা ব্র্যান্ড নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা কমমূল্যে বিক্রি করছে। এই পথই উৎপাদক এবং বৈধ আমদানিকারকদের খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই পথের আরও কিছু শাখা-প্রশাখা আছে। চীনের কয়েকটি ব্র্যান্ড নিজেরা আড়ালে থেকে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে হ্যান্ডসেট আমদানি করছে এবং প্রকৃত মূল্যের চেয়ে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ কম দেখিয়ে কর ফাঁকি দিচ্ছে। কর ফাঁকির এ বিষয় নিয়ে একাধিকবার বিএমপিআইর পক্ষ থেকে লিখিতভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলেও কর্তৃপক্ষ যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি।
তৃতীয় পথটি হচ্ছে নকল হ্যান্ডসেট চীন থেকে তৈরি করে এনে বিক্রি করা। এই নকলের ঘটনা ঘটছে মূলত ফিচার ফোন এবং বার ফোনের ক্ষেত্রে। এর ফলে দেশে ফিচার এবং বার ফোন সংযোজন ও উৎপাদনের কারখানা দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্মার্টফোনের ক্ষেত্রে 'মাস্টার কপি' নামে প্রকাশ্যেই ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দিয়ে নকল হ্যান্ডসেট বিক্রি করা হয়। এক্ষেত্রে নিম্নমানের যন্ত্রাংশে মূল স্মার্টফোনের অপারেটিং সিস্টেমের ক্লোন কপি স্থাপন করা হয়। এসব স্মার্টফোন দেখতে প্রকৃত ফোনের মতো মনে হলেও এটি কার্যত অচল ফোন। অধিকাংশ গ্রাহকই এসব 'মাস্টার কপি' ফোন কিনে একেবারেই ব্যবহার করতে পারেন না। যেহেতু 'মাস্টার কপি' নাম দিয়ে বিক্রি করা হয়েছে সে কারণে বিক্রেতারাও আর কোনো ধরনের দায়িত্ব নেন না।
অবৈধ বাজার উৎসাহিত হচ্ছে যেভাবে :সংশ্নিষ্টরা জানান, সরকারের কিছু নীতি অবৈধ পথকে উৎসাহিত করছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের নীতিমালা অনুযায়ী মূল উৎপাদক কোম্পানি ছাড়া তৃতীয় পক্ষ আমদানিকারকের পণ্য বাজারে ঢুকতে দেওয়া হয় না। আর দেশে পরিবেশক কোম্পানি বাধ্যতামূলকভাবে স্থানীয় কোম্পানিই হতে হয়। একই সঙ্গে ভারতে আমদানি পর্যায়ে হ্যান্ডসেটের বক্সে ব্র্যান্ড মূল্য দেখাতে হয় এবং বাজারে সেই মূল্যেই বিক্রি করতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরনের বাধ্যবাধকতা না থাকার কারণে চীনা কয়েকটি কোম্পানি প্রকৃত ব্র্যান্ড মূল্যের চেয়ে অনেক কম মূল্য দেখিয়ে অবাধে কর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
একজন আমদানিকারক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, যেসব ব্র্যান্ড দেশে কারখানা স্থাপন করেছে তাদের বাদ দিয়ে অন্য সব আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের ক্ষেত্রে আমদানিকারক তালিকাভুক্ত করার ক্ষেত্রে বিটিআরসির বিদ্যমান সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো উচিত। যেমন এখন শাওমি ফোন যদি কেউ বৈধভাবে আমদানি করতে চায় তার কাছ থেকে কর নিয়ে আমদানি করার সুযোগ দেওয়া উচিত। কিন্তু একজন আমদানিকারককে তালিকাভুক্ত করে তাকেই শুধু আমদানির সুযোগ দেওয়ার কারণে এর বাইরে বিপুল পরিমাণ হ্যান্ডসেট কর ফাঁকি দিয়ে অবৈধ পথে আসছে। দ্বিতীয়ত, এনইআইআর না থাকার কারণে অবৈধ পথে আসা এবং নকল উভয় ধরনের হ্যান্ডসেটে বিনা বাধায় সিমকার্ড সচল হচ্ছে। এনইআইআর থাকলে অবৈধ পথে আসা হ্যান্ডসেটে সিমকার্ড মোবাইল নেটওয়ার্কে সচল হতে পারত না।
এনইআইআর স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু :বিএমপিআই সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া শহীদ জানান, বিটিআরসি এবং বিএমপিআইর যৌথ উদ্যোগে এনইআইআর প্রযুক্তি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি যত তাড়াতাড়ি হয় ততই মঙ্গল। বিটিআরসির সিনিয়র সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) জাকির হোসেন খান সমকালকে জানান, এরই মধ্যে বিটিআরসি এনইআইআর স্থাপনের জন্য টেন্ডার আহ্বান করেছে। টেন্ডার প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে যন্ত্রপাতি কেনা, স্থাপন এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে এটি চলতি বছরের শেষে চালু করা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এনইআইআর স্থাপনের মাধ্যমে এখানে প্রতিটি হ্যান্ডসেটের আইএমইআই (ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি নম্বর) ডাটাবেজ হবে। সহজ কথায় এখানে প্রতিটি হ্যান্ডসেটের নিবন্ধন হবে এবং হ্যান্ডসেটটি নিবন্ধিত না হলে কোনো মোবাইল ফোন অপারেটরের নেটওয়ার্কেই চলবে না।