সমকাল অনুসন্ধান : ৬

রেভিনিউ স্ট্যাম্পও জাল হচ্ছে

বছরে ৬০০ থেকে হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি

প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২০     আপডেট: ১৪ মে ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

আবু কাওসার

জমি কিনলে কিংবা ফ্ল্যাট হস্তান্তর করলে এর নিবন্ধন (রেজিস্ট্রেশন) করতে হয়। নিবন্ধনের জন্য বিভিন্ন মূল্যের রেভিনিউ স্ট্যাম্প লাগে। এখন যে স্ট্যাম্প আপনি কিনছেন তা আসল না নকল তা বোঝা কঠিন। কারণ এতে টাকার মতো জলছাপ বা বিশেষ নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য থাকে না। এ ছাড়া স্ট্যাম্প কেনাবেচায় নেই কোনো তদারকি। কে বিক্রি করছে, কত বিক্রি করছে, বাজারে চাহিদা কত- এসব দেখভাল করার কোনো সংস্থাও নেই। ফলে দেশে জাল বা নকল রেভিনিউ স্ট্যাম্প ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। স্ট্যাম্প ব্যাপকভাবে নকল হওয়ায় সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব। কঠোর আইন না থাকায় ফুলে-ফেঁপে উঠছে একটি বিশেষ সুবিধা গোষ্ঠী। জানা যায়, শুধু রেভিনিউ স্ট্যাম্প নয়, এর সঙ্গে চালান ও পে অর্ডারও নকল হচ্ছে।
শুধু রেভিনিউ স্ট্যাম্প নকল হচ্ছে, তা নয়। অন্য অনেক পণ্যই নকল হচ্ছে। নকল হচ্ছে প্রসাধনসামগ্রী। মোবাইল হ্যান্ডসেট ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক পণ্যও নকল হচ্ছে। জীবন রক্ষাকারী ওষুধও নকল হচ্ছে। এই অপরাধ শুধু ভোক্তা বা কোম্পানির আর্থিক ক্ষতি করছে না, সরকারও বিপুল অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে। কর ফাঁকি দিতে সিগারেটও অবৈধভাবে বাজারজাত করছে একটি চক্র।
সমকালের অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প বিক্রি ও তৈরির সঙ্গে জড়িত। ওই চক্র দেশের বিভিন্ন পোস্ট অফিস, আদালত, গার্মেন্ট, সরকারি হাসপাতাল, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি অফিসে নকল স্ট্যাম্প বিক্রি করছে। একটি সূত্র বলেছে, স্ট্যাম্প ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ভেন্ডররা এই জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত। যদিও এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন স্ট্যাম্প ভেন্ডররা।
মাঝে মাঝে পুলিশ অভিযান চালিয়ে জাল স্ট্যাম্প উদ্ধার ও জড়িতদের আটক করে। মামলাও হয়। তবে অপরাধীদের শাস্তি হয় না। পুলিশ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ডিবির একটি সূত্র বলেছে, মূলত দুটি কারণে মামলা আদালতে টেকে না। প্রথমত ত্রুটিপূর্ণ তদন্ত এবং দ্বিতীয়ত সাক্ষীর অভাব। অনেক ক্ষেত্রে তদন্তের জন্য তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) নিয়োগ করা হলেও বিভিন্ন কারণে শেষ পর্যন্ত তদন্তের কাজ বেশিদূর এগোয় না। সরকারি ডকুমেন্ট জালিয়াতির অভিযোগে দণ্ডবিধির ৪৬৫ ধারায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। আলামত জব্দের সময় সাক্ষী খুঁজে পাওয়া গেলেও পরবর্তী সময়ে বিচার প্রক্রিয়ার সময় তাদের আর দেখা মেলে না। ফলে উপযুক্ত সাক্ষীর অভাবে বিচারকাজ ব্যাহত হয়।
যোগাযোগ করা হলে ডিবির সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মাহমুদা আফরোজ লাকী সমকালকে বলেন- সঠিক তদন্ত, উপযুক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলে জাল স্ট্যাম্প তৈরি ও বিক্রি অনেকাংশে কমে যাবে। তিনি আরও বলেন, বাজারে যে পরিমাণ আসল স্ট্যাম্প রয়েছে, তারচেয়ে নকল স্ট্যাম্প বেশি। এতে সরকার শুধু রাজস্ব হারাচ্ছে না, দলিল গ্রহীতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সরকারি সংস্থাগুলোর এ বিষয়ে বিশেষ নজর দেওয়া উচিত। এতে সরকারের রাজস্ব বর্তমানের চেয়ে বহুগুণ বাড়বে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রতি বছর কী পরিমাণ রেভিনিউ স্ট্যাম্প নকল হয় এবং সরকার কত টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে তার সঠিক রেকর্ড সরকারের কোনো সংস্থার কাছে নেই। তবে এনবিআরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নকল স্ট্যাম্পের কারণে বছরে কমপক্ষে ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। গোয়েন্দা সূত্র বলেছে, এর পরিমাণ বছরে এক হাজার কোটি টাকার মতো। ঢাকা জেলা ডিসি কার্যালয়ের একটি সূত্র বলেছে, অহরহ যে পরিমাণ রেভিনিউ স্ট্যাম্প জাল হচ্ছে তা অকল্পনীয়।
এ বিষয়ে এনবিআর সদস্য (আয়কর নীতি) আলমগীর হোসেন বলেন, আগে বড় অঙ্কের রেভিনিউ স্ট্যাম্প পাওয়া যেত। এখন তার পরিবর্তে স্ট্যাম্পের মূল্যমান কমানো হয়েছে। এর ফলে জাল আগের চেয়ে কমেছে। তিনি আরও বলেন, চালান জালিয়াতি রোধে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় একটি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে অর্থ মন্ত্রণালয়। এটি শেষ হলে নকল কমবে। এতে সরকারের রাজস্ব আয় আরও বাড়বে বলে জানান তিনি।
নিবন্ধন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে বাজারে ৫, ১০, ২০, ৫০ ও ১০০ টাকা মূল্যমানের রেভিনিউ স্ট্যাম্প রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় ৫০ এবং ১০০ টাকার স্ট্যাম্প। প্রতিটি স্ট্যাম্পই কমবেশি নকল হচ্ছে। ডিবির একটি সূত্র জানায়, যারা জাল স্ট্যাম্প তৈরি করে, তাদের নিজস্ব ছাপাখানা রয়েছে। পুরান ঢাকার কয়েকটি জায়গা, যাত্রাবাড়ী, ডেমরা, মতিঝিল, পুরানা পল্টনসহ ঢাকার আশপাশে এসব ছাপাখানা রয়েছে। যারা জাল স্ট্যাম্প তৈরি করে, তাদের লেখাপড়া কম থাকলেও কম্পিউটার ও প্রিন্টিং কাজে ভালো দক্ষতা রয়েছে। ছোট ছোট বাসা ভাড়া করে থাকে এরা। পেশাদার জাল স্ট্যাম্প ব্যবসায়ীদের আয়-রোজগারও ভালো। ডিবির সিরিয়াস ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন বিভাগের মাহমুদা আফরোজ লাকী বলেন, 'এত সুন্দর করে স্ট্যাম্প নকল করা হয় যে, কোনটা আসল আর কোনটা নকল শনাক্ত করা কঠিন।
যে কোনো দলিল নিবন্ধন, চুক্তিপত্র, নোটারি, হলফনামা, এফিডেভিটসহ বিভিন্ন কাজে স্ট্যাম্প ব্যবহার করা হয়। এর বিনিময়ে ডিডভ্যালু বা চুক্তিমূল্যের ওপর নির্ধারিত হারে রাজস্ব আদায় করে থাকে সরকার। আইন মন্ত্রণালয়ের অধীন নিবন্ধন অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে স্ট্যাম্প বিক্রি (নন-জুডিশিয়াল) বাবদ মোট আদায় হয়েছে ৯ হাজার ৯২৪ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এর আগের অর্থবছর ১২ হাজার ২২৬ কোটি টাকা। চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত আয় হয়েছে ছয় হাজার ১৮২ কোটি টাকা।
সূত্র জানায়, দলিলমূল্য যা-ই হোক না কেন, নিয়ম অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা মূল্যমানের স্ট্যাম্প ব্যবহার করা যায়। এর বেশি মূল্যমানের স্ট্যাম্পের প্রয়োজন হলে বাকি টাকা পে অর্ডারের মাধ্যমে পরিশোধ করার নিয়ম রয়েছে। যেমন- দলিলের চুক্তিমূল্য অনুযায়ী কারও তিন হাজার টাকা মূল্যমানের রেভিনিউ স্ট্যাম্প দরকার হলে ৩০০ টাকার রেভিনিউ স্ট্যাম্পসহ তার সঙ্গে বাকি দুই হাজার ৭০০ টাকা পে অর্ডারের মাধ্যমে ব্যাংকে পরিশোধ করতে হবে।
নিবন্ধন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শহীদুল আলম ঝিনুক সমকালকে বলেন, অধিদপ্তর দলিল লেখকদের লাইসেন্স দেয়। রেভিনিউ স্ট্যাম্প বিক্রির লাইসেন্স দেয় জেলা প্রশাসকের কার্যালয় (ডিসি অফিস)। তাদের দীর্ঘদিন ধরে এ কাজে অভিজ্ঞতা রয়েছে। স্ট্যাম্প বিক্রির সময় ভেন্ডরদের নাম, ঠিকানা, ক্রমিক নম্বর ইত্যাদি উল্লেখ করতে হয়। ফলে এখানে নিবিড় তদারকি করলে অপরাধীদের ধরা কঠিন কিছু নয়। তিনি মনে করেন, সাব-রেজিস্ট্রার কর্মকর্তাদেরও দায়িত্ব রয়েছে। দলিল রেজিস্ট্রির সময় তারা শুধু চালান দেখেন। দলিল গ্রহীতাদের জিজ্ঞাসা করা উচিত কোথা থেকে কেনা হয়েছে, ভেন্ডরের নাম কী? এসব বিষয় তারা দেখেন না। নকল স্ট্যাম্পের কারণে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতির বিষয়টি স্বীকার করেন তিনি। একই সংস্থার সহকারী মহাপরিদর্শক আব্দুল লতিফ বলেন, ভেন্ডররা স্ট্যাম্প বিক্রি করে থাকেন। তাদের লাইসেন্স দেয় ডিসি অফিসের ট্রেজারি শাখা। এখানে তাদের কিছু করার নেই। তিনি জানান, নকল স্ট্যাম্প কীভাবে তৈরি হয় সে সম্পর্কে তার ধারণা নেই। এটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাজ। তারা সক্রিয় হলে এ অপরাধ অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন তিনি।
ঢাকা জেলা ডিসি অফিস সূত্রে জানা গেছে, রেভিনিউ স্ট্যাম্প নকলের বিষয়টি নিয়ে সরকার চিন্তিত। জাল স্ট্যাম্প প্রতিরোধে আইন মন্ত্রণালয় থেকে সুপারিশ চাওয়া হয়েছে। সুপারিশ দেওয়া হলেও তার বাস্তবায়ন নেই। ডিসি অফিসের এক কর্মকর্তা বলেন, স্ট্যাম্প জাল প্রতিরোধে সমাধান আছে, তা হলো- স্ট্যাম্প কেনাবেচার পুরো প্রক্রিয়াকে অটোমেশন করতে হবে এবং তা করতে হবে কেন্দ্রীয়ভাবে। দ্রুত এবং সহজভাবে নকল স্ট্যাম্প শনাক্ত করার এটিই একমাত্র উপায় বলে মনে করেন তিনি।
ঢাকা সদর দলিল লেখক ও স্ট্যাম্প ভেন্ডর কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক কে এস হোসেন টমাস বলেন, প্রশাসন কঠোর হলে জাল স্ট্যাম্প রোধ করা সম্ভব। ভেন্ডররা এর সঙ্গে জড়িত- এমন অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, অভিযোগ ভিত্তিহীন। তিনি জানান, আগে লাইসেন্স পাওয়া কঠিন ছিল। এখন কঠোর করা হয়েছে। যাচাই-বাছাই করে দেওয়া হয়। তেজগাঁও রেজিস্ট্রি অফিসের ভেন্ডর আব্দুল মজিদ হাওলাদার বলেন, স্ট্যাম্প নকলের বিষয়ে তারা কিছু জানেন না।
সারাদেশে লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রায় এক লাখ ভেন্ডর আছেন। এর মধ্যে ঢাকার ডিসির অফিসে রয়েছেন আট শতাধিক। ভেন্ডররা তাদের চাহিদা অনুযায়ী চালান জমা দিয়ে ডিসি অফিস থেকে স্ট্যাম্প সংগ্রহ করে থাকেন। সপ্তাহে বুধ ও রোববার দু'দিন টাকা জমা দেওয়া হয়। এক সপ্তাহের মধ্যে ডিসি অফিসের ট্রেজারি শাখা থেকে স্ট্যাম্প সরবরাহ করা হয়। বিনিময়ে কমিশন পান ভেন্ডররা। বর্তমানে ৫০ থেকে ১০০ টাকা মূল্যমানের রেভিনিউ স্ট্যাম্পের জন্য প্রতি হাজারে কমিশন ১৫ টাকা। ৫ থেকে ৫০ টাকার জন্য প্রতি হাজারে কমিশন ৩৭ টাকা ৫০ পয়সা। নিয়ম অনুযায়ী ভেন্ডরদের প্রতিবছর লাইসেন্স নবায়ন করতে হয়। নবায়ন ফি ৫০০ টাকা।