ঋণ জালিয়াতির অভিযোগে আলোচিত ক্রিসেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান এম এ কাদের দুদকের মামলায় জামিন পেতে আদালতের কাছে অসত্য তথ্য দিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত ১০ ফেব্রুয়ারি আদালতে তার জামিন আবেদনে বলা হয়, ক্রিসেন্ট গ্রুপের ঋণ পুনঃতফসিল হয়েছে। সে আলোকে তিনি জনতা ব্যাংকের সব পাওনা পরিশোধ করবেন। যদিও জামিন আবেদনে উল্লিখিত এ তথ্য সঠিক নয়।

ইতোমধ্যে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি দুই পক্ষের আইনজীবীর যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে ঢাকা মহানগরের জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ কে এম ইমরুল কায়েস এম এ কাদেরের জামিন আবেদন মঞ্জুর করেছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের শীর্ষ ঋণখেলাপি ক্রিসেন্ট গ্রুপ। এই গ্রুপের পাঁচ প্রতিষ্ঠানের খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা। দুই শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিয়ে এসব ঋণ বিশেষ নীতিমালায় পুনঃতফসিলের জন্য জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে আবেদন করে ক্রিসেন্ট গ্রুপ। তবে বিশেষ নীতিমালায় না করে সাধারণ নিয়মে পুনঃতফসিলের জন্য ব্যাংকের পক্ষ থেকে তা পাঠানো হয় বাংলাদেশ ব্যাংকে। এরপর গত ৬ ফেব্রুয়ারি বেশ কয়েকটি শর্ত দিয়ে জনতা ব্যাংকে চিঠি দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে সেই শর্তের আলোকে ক্রিসেন্ট গ্রুপ আর ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি।

অথচ গত ১০ ফেব্রুয়ারি ক্রিসেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যানের জামিন আবেদনে বলা হয়, 'বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে দুই শতাংশ ডাউনপেমেন্ট বাবদ ৪৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা জমা দিয়েছে। দরখাস্তকারী আসামি জামিনে মুক্তি পাইলে ব্যাংকের দেনা পর্যায়ক্রমে বা পুনঃতফসিল অনুযায়ী ব্যাংকে জমা দেবেন।'

বাংলাদেশ ব্যাংক ও জনতা ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ক্রিসেন্ট গ্রুপের পাঁচ প্রতিষ্ঠানের একটিরও ঋণ পুনঃতফসিল হয়নি। এমনকি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের শর্তের আলোকে পুনঃতফসিলের জন্য আর আবেদনও করা হয়নি। যদিও নিয়মিত ঋণ পরিশোধ এবং তার পাসপোর্ট আদালতে জমা রাখার শর্তে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি তাকে জামিন দেওয়া হয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরেই ক্রিসেন্ট গ্রুপের ঋণ পুনঃতফসিলে তদবির করছে একটি পক্ষ। তবে এখানে জালিয়াতি সংঘটিত হওয়ায় জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ আবেদন সরাসরি বিবেচনায় না নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠিয়েছে।

ক্রিসেন্ট গ্রুপের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক শর্ত দিয়েছিল, তাদের ঋণ একক গ্রাহকের ঋণসীমার বাইরে চলে গেছে। পুনঃতফসিল করতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অফসাইট সুপারভিশন বিভাগের অনাপত্তি নিতে হবে। শর্তে আরও বলা হয়েছিল, মোট ঋণের অন্তত ৫ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিতে হবে। বৈদেশিক বিল ক্রয়ের মাধ্যমে সৃষ্ট দায় পুনঃতফসিল করা যাবে না। আর দুদকের মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নতুন করে কোনো ঋণ দেওয়া যাবে না। অথচ এসব শর্তের ব্যাপারে কোনো যোগাযোগ বা মন্তব্য না জানিয়েই ক্রিসেন্ট চেয়ারম্যানের জামিন চাওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, ক্রিসেন্ট গ্রুপের ঋণ বের করা হয়েছে নানা জালিয়াতির মাধ্যমে। এ ছাড়া রপ্তানি না করেই ভুয়া বিল তৈরির মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের টাকা বের করে নেওয়া হয়েছে। শুধু নগদ সহায়তার নামেই ভুয়া কাগজ তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি ৪০৮ কোটি টাকা নিয়ে গেছে। এসব কারণে বিশেষ নীতিমালার আওতায় এ ঋণ পুনঃতফসিলের কোনো সুযোগ নেই। যদিও বিভিন্ন পক্ষের চাপে শর্তসাপেক্ষে পুনঃতফসিলের কথা বলা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. জামালউদ্দিন আহমেদ, এফসিএ সমকালকে বলেন, ক্রিসেন্ট গ্রুপের ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে পাঠানো হয়েছে। এখনও তা কার্যকর হয়নি। তিনি বলেন, যা হওয়ার হয়ে গেছে। টাকা তো নিয়ে গেছে। এখন কোনোভাবে যদি পুনঃতফসিল করে ব্যবসা-বাণিজ্য চালানো যায়, তাহলে কিছু টাকা ফেরত আসবে। না হলে পুরো টাকা গচ্চা যাবে। তাই তাদের আবেদন বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হয়েছে। তবে এখনও পুনঃতফসিল হয়নি। এ ব্যাপারে জনতা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে গিয়েও ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুছ ছালাম আজাদের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

গত বছরের ৩০ জানুয়ারি গ্রেপ্তার হন এম এ কাদের। অর্থ পাচারের অভিযোগে ওই দিন মানি লন্ডারিং আইনে রাজধানীর চকবাজার থানায় করা শুল্ক্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মামলায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনটি মামলায় ৯১৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা পাচারের অভিযোগ আনা হয়। আসামি করা হয় ১৭ জনকে। আসামির তালিকায় ছিলেন ক্রিসেন্ট গ্রুপের চারজন। বাকি ১৪ জন ছিলেন জনতা ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় ও ইমামগঞ্জ শাখার কর্মকর্তা। শুল্ক্ক গোয়েন্দা অধিদপ্তরের মামলার পর গত বছরের ১০ ফেব্রুয়ারি মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। রপ্তানি না করেও ভুয়া বিল তৈরি করে জনতা ব্যাংক থেকে এক হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা তুলে নিয়ে আত্মসাতের অভিযোগে এই মামলায় এম এ কাদেরসহ ২০ জনকে আসামি করা হয়।

জাতীয় সংসদে সর্বশেষ গত জানুয়ারিতে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের শীর্ষ ঋণখেলাপি ক্রিসেন্ট গ্রুপ। এর পাঁচ প্রতিষ্ঠানের কাছে জনতা ব্যাংকের পাওনা চার হাজার ৮৮৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাওনা রিমেক্স ফুটওয়্যারের কাছে। প্রতিষ্ঠানটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ এক হাজার ৭০৮ কোটি টাকা। এ ছাড়া ক্রিসেন্ট লেদার প্রোডাক্টের কাছে এক হাজার ২৯৬ কোটি, রূপালী কম্পোজিটের কাছে এক হাজার ২৩৯ কোটি, লেক্সকো লিমিটেডের কাছে ৫১৪ কোটি এবং ক্রিসেন্ট ট্যানারিজের কাছে ২৩১ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে।