ডাকসু প্রত্যাশা পূরণের ধারেকাছে নেই

নির্বাচনের বর্ষপূর্তি

প্রকাশ: ১১ মার্চ ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সাব্বির নেওয়াজ ও মাজহারুল ইসলাম রবিন

টানা প্রায় তিন দশকের স্থবিরতা কাটিয়ে গত বছরের ১১ মার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন। আজ এ নির্বাচনের বর্ষপূর্তি। নির্বাচনের আগে থেকেই ডাকসুকে ঘিরে সাধারণ শিক্ষার্থীসহ সবার মধ্যে যে প্রত্যাশা দেখা দিয়েছিল, তা পূরণের ধারেকাছেও যেতে পারেনি এই ডাকসু। শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে প্রকট দ্বন্দ্ব ও দূরত্বের কারণে কোনো সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনা দূরে থাক, অভিষেকই করতে পারেনি সংসদ।
ডাকসুর বর্তমান সহসভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব রয়েছে, তা তারা নিজেরাও রাখঢাকের চেষ্টা করেননি। বিজয়ী নেতাদের মধ্যে নির্বাচনী ইশতেহার পূরণের কোনো লক্ষ্য আছে বলেও মনে করছেন না শিক্ষার্থীরা। সমস্যার আধিক্য, ডাকসু নেতাদের নিষ্ফ্ক্রিয়তা, সদিচ্ছা ও অর্থায়নের অভাব এবং সমন্বয়হীনতা শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা পূরণের পথে বড় বাধা বলে মনে করেন শিক্ষার্থীরা। এদিকে ইতিমধ্যেই ডাকসু তহবিল থেকে ৮৭ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে বলে জানা গেছে।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকটের সমাধান, গণরুম-গেস্টরুম প্রথা উচ্ছেদ, অছাত্র-বহিরাগত বিতাড়ন, সান্ধ্যকালীন বাণিজ্যিক কোর্স বন্ধ, গবেষণা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো, পরিবহন সমস্যা দূর করা, ক্যান্টিনে খাবারের মান বাড়ানো, সাত কলেজের অধিভুক্তি বাতিল, ক্যাম্পাসে বাইরের যান চলাচল বন্ধসহ নির্বাচনী ইশতেহারের বড় অঙ্গীকারগুলোর বিষয়ে ডাকসু কোনো উদ্যোগ নিতে পারেনি। অভিযোগ, ডাকসুর শীর্ষ দুই নেতা ভিপি নুরুল হক নুর ও জিএস গোলাম রাব্বানীর দূরত্ব ও দ্বন্দ্ব ডাকসুর কার্যক্রমে শুরু থেকেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ডাকসুতে সংগঠনগতভাবে ছাত্রলীগের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। কিন্তু কয়েকজন ডাকসু নেতা ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু কাজ করলেও নির্বাচনী ইশতেহারের মূল প্রতিশ্রুতি পূরণের ক্ষেত্রে তাদের সামগ্রিক কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। বরং প্রভাব বিস্তারের দ্বন্দ্বে নির্বাচিত ডাকসু নেতারাও নতুন নতুন সমস্যা সৃষ্টি করে চলেছেন। ডাকসু ভবনে হামলার ঘটনা এরই চূড়ান্ত উদাহরণ।
সাধারণ শিক্ষার্থীরা জানাচ্ছেন, কয়েকজন সম্পাদক ও সদস্যকে ইশতেহারের বাইরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে কিছু কাজ করতে দেখা গেছে। এসবের মধ্যে ক্যাম্পাসে জো-বাইক চালু, স্যানিটারি ভেন্ডিং মেশিন স্থাপন, ডাকসু ট্যালেন্ট হান্ট প্রতিযোগিতা, বিভিন্ন হল ও ইনস্টিটিউটের ফি কমানো, সচেতনতামূলক সভা-সেমিনার, বিভিন্ন দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠান চোখে পড়ার মতো। তবে দিবস ও উপলক্ষ সম্পর্কিত প্রোগ্রামই বেশি হয়েছে আর এসবে ব্যয়ও হয়েছে অনেক বেশি।
খরচ হয়ে গেছে ৮৭ লাখ টাকা :ডাকসু থেকে পাওয়া গত ১০ মাসের হিসাবে দেখা যায়, ১০ মাসে ডাকসুর ব্যয় হয়েছে ৮৭ লাখ ১৭ হাজার টাকা। এর মধ্যে ডাকসুর অফিস খরচ বাবদ গেছে ৩ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। বাকি ৮৩ লাখ ৫১ হাজার টাকার মধ্যে ৫০ লাখের বেশি টাকা খরচ হয়েছে নানা আনুষ্ঠানিকতায়।
হিসাব অনুযায়ী, ডাকসুর ক্রীড়া সম্পাদক শাকিল আহমেদ তহবিল থেকে ১৯ লাখ ৮১ হাজার টাকা, সাহিত্য সম্পাদক মাজহারুল কবির ১৩ লাখ ৭১ হাজার ৮৩৪ টাকা, আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক শাহরিমা তানজিন অর্ণি ৬ লাখ ৭১ হাজার ৯০০ টাকা, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক সাদ বিন কাদের চৌধুরী ৭ লাখ ৮২ হাজার ১২০ টাকা, সংস্কৃতি সম্পাদক আসিফ তালুকদার ১২ লাখ ৬৫ হাজার টাকা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক আরিফ ইবনে আলী ৯ লাখ ৯৯ হাজার টাকা, সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেন ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ছাত্র পরিবহন সম্পাদক শামস-ঈ-নোমান ৫৮ হাজার ৭০০ টাকা তুলেছেন।
ডাকসুর সদস্যদের মধ্যে তহবিল থেকে তানভীর হাসান ৯০ হাজার টাকা, রাকিবুল হাসান ৬১ হাজার ৭০০ টাকা, রাইসা নাসের ৭৪ হাজার ৫০ টাকা, রকিবুল ইসলাম ২ লাখ ২০ হাজার টাকা, মুহা. মাহমুদুল হাসান ৯৪ হাজার ৫০০ টাকা, রফিকুল ইসলাম ৩০ হাজার টাকা, ফরিদা পারভীন ৬১ হাজার ৫০০ টাকা, সাইফুল ইসলাম এক লাখ টাকা এবং যোশীয় সাংমা ৪০ হাজার টাকা তুলেছেন। প্রসঙ্গত, ডাকসু সদস্যদের জন্য আলাদা কোনো বাজেট নেই- এই অর্থ তারা সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর তহবিল থেকে তুলেছেন।
দ্বন্দ্ব ও নিষ্ফ্ক্রিয়তা :ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে ২৩ জন এবং ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ থেকে দু'জন ডাকসুতে নির্বাচিত হয়েছেন। তবে মাত্র দুটি পদে নির্বাচিত হলেও ডাকসু ভিপির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদটি পরিষদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ডাকসুর কার্যক্রমে এই দু'পক্ষের দ্বন্দ্বও বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। ছাত্রলীগের ২৩ জন ডাকসুর ব্যানারে কোনো কর্মসূচি পালন করলেও ভিপি নুরুল হক নুর ও সমাজসেবা সম্পাদক আখতার হোসেনকে তাতে দেখা যায় না। আবার ভিপি ও সমাজসেবা সম্পাদক কোনো কর্মসূচি নিলে ছাত্রলীগ থেকে নির্বাচিত ডাকসু নেতারা তাতে অংশগ্রহণ করেন না। বরং তাতে বাধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
নির্বাচনের পর থেকে এখন পর্যন্ত কোনো কাজে সম্পৃক্ততা দেখা যায়নি ডাকসুর কমনরুম ও ক্যাফেটেরিয়া-বিষয়ক সম্পাদক লিপি আক্তার, সদস্য নিপো ইসলাম এবং সাবরিনা ইতিকে। তারা বলছেন, নিজেরা কোনো কর্মসূচি না দিলেও অন্যান্য সম্পাদকের সঙ্গে এক হয়ে কিছু কাজ করেছেন তারা। তবে সেগুলো শিক্ষার্থীদের ভেতর তেমন প্রচারিত হয়নি।
ডাকসুর কার্যক্রমে উচ্ছ্বসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান। তিনি বলেন, 'ডাকসু বিভিন্নভাবে অনেক কর্মসূচি করছে এবং সেগুলোতে প্রচুর শিক্ষার্থীর সম্পৃক্ততাও দেখা গেছে। এগুলো দেখে খুব ভালো লাগছে। এত অল্প সময়ে তারা যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তা খুবই আশাব্যঞ্জক।' ডাকসুর কার্যক্রম সম্পর্কে শিক্ষার্থীরাই ভালো মতামত দিতে পারবেন বলে মনে করেন উপাচার্য।
ডাকসু নেতাদের মূল্যায়ন :ডাকসু কার্যক্রমের সার্বিক মূল্যায়ন করে ভিপি নুরুল হক নুর সমকালকে বলেন, দীর্ঘ ২৮ বছর পরে ডাকসু নির্বাচন হয়েছে- এটি একটি বড় অর্জন। ডাকসু শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্ম। এটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। এদিক থেকে ডাকসু খানিকটা সফল, খানিকটা ব্যর্থ। ভর্তির পর শিক্ষার্থীদের মেধা ও প্রয়োজনীয়তার ভিত্তিতে আবাসিক হলে সিট পাওয়ার কথা থাকলেও সরকারি দলের ছাত্রসংগঠন সব সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো নিয়ন্ত্রণ করে। এটা একটা অলিখিত নিয়ম হয়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনও এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ছিল, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক সংকট, গণরুম ও গেস্টরুম সমস্যার সমাধানে ডাকসু ভূমিকা রাখবে। কিন্তু ডাকসুর প্রভাবে গণরুম ও গেস্টরুমের নির্যাতন কিছুটা কমলেও আবাসিক সংকটের কোনো সমাধান হয়নি। তবে ক্যাম্পাসে ভিন্নমত প্রকাশের গণতান্ত্রিক পরিবেশ খানিকটা সৃষ্টি হয়েছে।
ডাকসু ভিপি নুর বলেন, ডাকসু বাজেটের বেশিরভাগই শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যয় হয়েছে। যদিও এই খরচ নিয়ে খানিকটা অস্বচ্ছতা রয়েছে। তবে সমন্বিতভাবে ডাকসুর কার্যক্রম পরিচালনা করা গেলে আরও ভালো হতো। কিন্তু সেটা হয়নি। ২৮ বছর পর নির্বাচন হওয়ায় এ ক্ষেত্রে কিছুটা কমতি থাকতেই পারে। নির্বাচনের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আরও ভালো কাজ হবে।
তবে বর্তমান ডাকসুকে সফল মনে করেন ডাকসুর সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) সাদ্দাম হোসেন। তিনি ডাকসুর গত এক বছরের বিভিন্ন কার্যক্রমের কথা তুলে ধরে বলেন, গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং জবাবদিহিতামূলক ছাত্ররাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা ডাকসুর প্রথম সফলতা। এ ছাড়া ডাকসু শিক্ষার্থীদের স্বার্থসংশ্নিষ্ট বিষয়গুলোর সমাধান ডাকসু করেছে।
নতুন নির্বাচনের উদ্যোগ নেই :ডাকসুর বর্তমান কমিটির প্রথম সভা হয়েছিল গত বছরের ২২ মার্চ। গঠনতন্ত্র অনুসারে, এক বছর মেয়াদি এ কমিটির মেয়াদ শেষ হবে আগামী ২২ মার্চ। এরপর উপাচার্য ও ডাকসুর সভাপতি চাইলে ৯০ দিন পর্যন্ত বর্তমান কমিটির মেয়াদ বাড়াতে পারেন। গঠনতন্ত্রে তাকে এ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। তবে ৯০ দিন পেরিয়ে গেলে কমিটি আপনা আপনিই ভেঙে যাবে। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, ডাকসুর বর্ষপূর্তি হতে চললেও এ বিষয়ে নতুন নির্বাচন আয়োজনের কোনো উদ্যোগ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নেই। গত বছরের নির্বাচন-পরবর্তী অচলাবস্থা ও ক্যাম্পাস পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে আপাতত ডাকসু নির্বাচন করা নিয়ে অনীহা রয়েছে প্রশাসনের।
আগামী ডাকসু নির্বাচন হবে কি- এমন প্রশ্নের উত্তরে ভিপি নুরুল হক নুর বলেন, ডাকসু নির্বাচন হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী তিনি। উপাচার্যের সঙ্গে এই বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন। তবে এই বিষয়ে প্রশাসনের ততটা আগ্রহ নেই বলে তার মনে হয়েছে। ডাকসুর চতুর্থ কার্যকরী সভায় এ বিষয়ে সমাজসেবা সম্পাদক প্রশাসন ও ডাকসুর অন্য সদস্যদের অবস্থান জানতে চাইলে সেখানে উপাচার্য কোনো মন্তব্য করেননি এবং প্রতিনিধিরাও তেমন কোনো আগ্রহ দেখাননি। এ সময় তিনি পরবর্তী নির্বাচন হওয়ার বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেন।
এজিএস সাদ্দাম হোসেন বলেন, তারা চান এই নির্বাচন 'ক্যালেন্ডার ইভেন্টে' পরিণত হোক। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব একাডেমিক কার্যক্রমের মতো এটিও যেন নিয়মিত হয়। এই নির্বাচন প্রশাসনের কোনো ধরনের করুণা বা বদান্যতা নয়। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবিচ্ছেদ্য একটি ধারা। তাই তারা প্রত্যাশা করছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ডাকসু নির্বাচন হবে। যদিও তারা প্রশাসনিক নিষ্ফ্ক্রিয়তা লক্ষ্য করছেন। তারা চান, প্রশাসন আড়মোড়া ভেঙে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিক।
'আগামী ডাকসু নির্বাচন কবে নাগাদ হতে পারে'- জানতে চাইলে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, এ বিষয়ে কথাবার্তা চলছে। আলোচনা সাপেক্ষে পরে জানানো হবে।

বিষয় : ডাকসু