ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের কথা

চাই সম্মিলিত প্রতিরোধ

প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২০     আপডেট: ১৫ মার্চ ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

মুস্তাফিজ শফি

সংবাদপত্র বা বৃহত্তর অর্থে সংবাদমাধ্যমকে আমরা যে 'সমাজের আয়না' বলে থাকি, বর্তমান সময়ে এসে সেই প্রেক্ষিত আরও সম্প্রসারিত হয়েছে। সংবাদমাধ্যম এখন নিছক 'রিফ্লেকশন' বা নির্লিপ্ত প্রতিফলন নয়, বরং সমাজের সঙ্গতি-অসঙ্গতি নিয়ে সক্রিয় অংশীজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে রাষ্ট্রকাঠামোর 'চতুর্থ স্তম্ভ' আখ্যা গ্রহণ করেই সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সামাজিক ও নাগরিক জীবনের দৈনন্দিন বিষয়াবলিতেও এখন দায়িত্বশীল ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হয় আমাদের সংবাদমাধ্যমকে।
সমকাল সূচনালগ্ন থেকেই রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিকদের প্রতি দায়িত্বশীল। আমাদের 'অসংকোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস' কেবল নিরেট সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে সীমিত নয়। সমাজ ও নাগরিকদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, ভালো-মন্দ, হাসি-কান্না, প্রিয়-অপ্রিয় বিষয়াবলিতেও সূচনালগ্ন থেকেই আমাদের দৃষ্টি গভীর এবং প্রসারিত। আমরা বিশ্বাস করি মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় একটি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো এবং বিজ্ঞানমনস্ক মুক্ত সমাজ এগিয়ে নিতে পারে দেশ ও জাতিকে। অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যেও আমরা নিরন্তর কাজ করে চলেছি।
সামাজিক দায়িত্বশীলতার অংশ হিসেবেই আমরা নকল এবং অবৈধ পণ্যের বিরুদ্ধে বারবার নাগরিকদের পক্ষে অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করে আসছি। মার্চের দ্বিতীয় দিন থেকে নকল ও অবৈধ পণ্য নিয়ে প্রকাশিত সাতটি ধারাবাহিক প্রতিবেদন তারই খণ্ডচিত্র মাত্র। শুধু সংবাদ বা অভিমত প্রকাশে সীমিত না রেখে নকল ও অবৈধ পণ্যের বিরুদ্ধে আমাদের অঙ্গীকার, সেটাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিতে আজ ১২ মার্চ বৃহস্পতিবার আমরা শুরু করছি 'নকল পণ্য কিনবো না, নকল পণ্য বেচবো না' শীর্ষক প্রচারাভিযান। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে জাতির প্রতি, প্রজন্মের প্রতি এও আমাদের এক বিশেষ অঙ্গীকার। জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর যোগদান আমাদের এই আয়োজনকে আরও বেশি সমৃদ্ধ করছে। আজকের আয়োজনের সব বিশেষ অতিথির প্রতিও আমাদের অগ্রিম কৃতজ্ঞতা।
অবশ্য নকল বা অবৈধ পণ্যের বিরুদ্ধে প্রচার অভিযান বা সামাজিক আন্দোলন নিছক কেনাবেচার বিষয় নয় এটাও আমরা মনে করি। আমরা বিশ্বাস করি, বৈধভাবে উৎপাদিত ও বাজারজাত করা আসল পণ্য কেনার সুযোগ ক্রেতা বা ভোক্তার অধিকার। ক্রেতারা প্রত্যাশা করেন, সব ধরনের পণ্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে বৈধভাবে বাজারে আসুক, যাতে তারা নিরাপদ বোধ করতে পারেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, এখনও ভোক্তারা বাজারের সব পণ্যকে নিরাপদ মনে করতে পারেন না। এটাও ঠিক, বাজারে নকল ও অবৈধ পণ্য থাকার কারণে ভোক্তারা যেমন ঠকছেন, তেমনি প্রকৃত ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সরকারও প্রতিবছর বড় অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। কিন্তু মূল উদ্বেগের বিষয় তার চেয়েও বড়।
সমকালের ধারাবাহিক প্রতিবেদনগুলোতে স্পষ্ট দেখা গেছে- কীভাবে গবেষণাগারে বা ল্যাবে পরীক্ষা ছাড়া ক্ষতিকারক উপাদান দিয়ে তৈরি নকল পণ্য কর্তৃপক্ষের সনদ ছাড়া অবৈধভাবে বাজারে চলে আসছে। ফলে গোটা দেশের জন্য ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। সব মানুষ তো ঝুঁকিতে রয়েছেই; ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ঝুঁকিও কম নয়। এসব পণ্যের কারণে আমাদের প্রাকৃতিক পরিবেশও কিন্তু হুমকির মুখে, ভুলে যাওয়া চলবে না। ভুলে যাওয়া চলবে না, আমরা মধ্যম আয়ের দেশে এবং একপর্যায়ে উন্নত দেশের সারিতে নিজেদের নিয়ে যেতে চাই। সেক্ষেত্রে উৎপাদন ও অর্থনীতিতে 'ইন্টেগ্রিটি' থাকতেই হবে। কিন্তু নকল বা অবৈধ পণ্য দিয়ে আর যাই হোক, সেই লক্ষ্য অর্জন করা যাবে না। ফলে নকল পণ্যের প্রশ্নটি যেমন নৈতিকতার, তেমনি উন্নয়ন ও সমৃদ্ধিরও।
সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে আমরা দেখেছি- নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্য এমনকি জীবনরক্ষাকারী ওষুধও নকল হচ্ছে। দেশজুড়ে বিশাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে জঘন্য এই অপরাধ ঘটছে। ফুটপাত থেকে শুরু করে বড় শপিংমলে নকল পণ্য বিক্রি হচ্ছে দেদার। অনেক ক্রেতার পক্ষে নকল ধরা কঠিন। পুরান ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় অবৈধ ছোট কারখানায় বানানো হচ্ছে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের নকল পণ্য। নামি ব্র্র্যান্ডের খাদ্যপণ্যও নকল হচ্ছে। বাজারে বিক্রি হওয়া প্রসাধনীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশই নকল। ক্ষতিকর রাসায়নিক ও অন্যান্য উপাদান দিয়ে তৈরি এসব প্রসাধনী ব্যবহার করে অনেকে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। নকল ওষুধের মাধ্যমে স্বাস্থ্যঝুঁকি আরও বেশি। দুর্ভাগ্যবশত, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্রেতার পক্ষে নকল ওষুধ চেনা সম্ভব নয়।
সরকারকে কর না দিয়ে ট্যাক্স স্ট্যাম্প নকল করে কিংবা পুরোনো স্ট্যাম্প ব্যবহার করে এবং চোরাপথে বিদেশ থেকে এনে অবৈধভাবে বাজারজাত হচ্ছে সিগারেট। এতে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে। মোবাইল ফোন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক্স পণ্যের বাজারেও নকল এবং অবৈধ পণ্যের দৌরাত্ম্য। অপরাধীরা সরকারের রেভিনিউ স্ট্যাম্পও জাল করছে। এখানেও সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে। নকল পণ্য উৎপাদন ঠেকানোর ব্যাপারে সরকারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। এটি করা না গেলে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা আরও ক্ষতির মুখে পড়বেন। সরকারের রাজস্ব আহরণে পড়বে নেতিবাচক প্রভাব।
আমরা জানি- নকল পণ্য তৈরি ও বাজারজাত করার বিরুদ্ধে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ, বিএসটিআই, নিরাপদ খাদ্য আইন ও বিশেষ খাদ্য আইনে ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান আছে। স্বস্তির কথা, বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্রায়ত্ত বিভিন্ন সংস্থা আইন বাস্তবায়নে অভিযান পরিচালনা করছে। কিন্তু অভিযানের পরেও থেমে নেই অসাধু ব্যবসায়ীরা। বিভিন্ন অভিযানে পণ্য আটক হচ্ছে। অভিযুক্তরা গ্রেপ্তারও হচ্ছে। এর পরও নকল পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ বন্ধ করা যাচ্ছে না।
আমরা মনে করি, আইন বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া আরও জোরদার করতে হবে। এ কারণে প্রয়োজনে আইন সংশোধন করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করলে অসাধু ব্যবসায়ীদের অপতৎপরতা বন্ধ হবে। নকল পণ্য তৈরি বন্ধে দীর্ঘমেয়াদে পরিকল্পনা নিতে হবে। শিক্ষাক্রমেও ভেজাল ও নকল পণ্যের ব্যাপারে সচেতনতায় জোর দিতে হবে। সচেতন প্রজন্মই পারে একটি সুশৃঙ্খল ও স্বাস্থ্যকর বাজার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে।
শুধু সম্পাদক হিসেবে আমি বা সংবাদমাধ্যম হিসেবে সমকাল নয়; বাংলাদেশের দায়িত্বশীল ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান হিসেবে এ ইস্যুতে আমরা নিষ্ফ্ক্রিয় থাকতে পারি না। বস্তুত, আমরা কেউই পারি না। কাজটি যে একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নয়, সেটাও আমরা সম্যক উপলব্ধি করি। সর্বব্যাপ্ত এই লড়াইয়ে সবাইকে নিয়েই আমরা এগিয়ে যেতে চাই। চাই সম্মিলিত সামাজিক প্রতিরোধ।
আজ আমরা যে প্রচারাভিযান আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করতে যাচ্ছি- তার লক্ষ্য আসলে সামষ্টিক। সবাইকে সঙ্গে নিয়েই নকল ও অবৈধ পণ্য নামক দৈত্যকে আমরা পরাস্ত করতে চাই। প্রচার অভিযানের অংশ হিসেবে আগামী দিনগুলোতে আমরা নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশের পাশাপাশি মানববন্ধন, সভা-সেমিনার, ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রমে সহায়তাসহ নানা সচেতনতামূলক কর্মসূচির পরিকল্পনা করেছি। নকল ও অবৈধ পণ্যবিরোধী সামাজিক উদ্যোগগুলোকেও আমরা সহযোগিতা করব, তাদের কার্যক্রম ব্যাপকভাবে প্রচার করব। সময়ের চাহিদা অনুযায়ী সবার মূল্যবান পরামর্শ নিয়ে আমরা আমাদের কর্মসূচিতে নতুন অনেক কিছু সংযোজন করব। প্রয়োজনে শুধু এ বছর নয়; পরবর্তী বছরগুলোতেও আমরা অভিযান অব্যাহত রাখব।
আমি আনন্দিত যে, স্বল্পসময়ের আহ্বানেই সমকালের এই প্রচারাভিযানে আমরা সহযোগী হিসেবে পেয়েছি বিএসটিআই, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব), কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এবং ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই, ঢাকা চেম্বার ও জেসিআই-নর্থকে। এই আয়োজনের টেলিভিশন পার্টনার হিসেবে রয়েছে চ্যানেল ২৪ এবং রেডিও পার্টনার ঢাকা এফএম। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে সমকালের এই মহতী উদ্যোগে এসব প্রতিষ্ঠানকে সহযোগী হিসেবে পেয়ে আমরা গর্বিত। সমকাল তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। আমরা বিশ্বাস করি, এই অংশীদারিত্ব আরও শক্তিশালী ও সম্প্রসারিত হবে।