শুরু হলো সমকালের বিশেষ প্রচারাভিযান

নকল পণ্যের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে

প্রকাশ: ১২ মার্চ ২০২০     আপডেট: ১৫ মার্চ ২০২০   

 সমকাল প্রতিবেদক

সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে নকল পণ্যবিরোধী বিশেষ প্রচারাভিযান শুরু করেছে 'সমকাল'। মুজিববর্ষ সামনে রেখে 'নকল পণ্য কিনবো না, নকল পণ্য বেচবো না'- এ শিরোনামে বৃহস্পতিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সমকাল কার্যালয়ে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত হয়ে প্রচারাভিযানের উদ্বোধন করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী সবাই অভিন্ন কণ্ঠে বলেছেন, নকল পণ্যের বিরুদ্ধে এখনই সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। নকল পণ্য নীরব ঘাতক। প্রয়োজনে আরও কঠোর আইন করে হলেও সমাজের এই নীরব ব্যাধি সারাতে হবে। নকল পণ্যের কারণে বিপুল রাজস্ব ক্ষতির পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। নকল পণ্যবিরোধী এমন আয়োজনকে সময়োপযোগী পদক্ষেপ উল্লেখ করে উপস্থিত সব অংশীজন আগামীতে এ ধরনের যে কোনো কর্মসূচিতে সমকালের পাশে থাকার দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

বৃহস্পতিবার নকল পণ্যবিরোধী একটি প্ল্যাকার্ডে স্পিকারের স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে সমকালের প্রচারাভিযানের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। একে একে আমন্ত্রিত অতিথিরা এতে স্বাক্ষর করেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি। সূচনা বক্তব্যে তিনি এই প্রচারাভিযানের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন।

মুস্তাফিজ শফি বলেন, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে সমকাল এবার দেশব্যাপী নকল পণ্যবিরোধী প্রচারাভিযানে নেমেছে। শুধু পত্রিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে গণমাধ্যমের সামাজিক দায়বদ্ধতা শেষ হয়ে যায় না। সামাজিক ও দৈনন্দিন জীবনের নানা বিষয়েও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হয়। সমকাল প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই রাষ্ট্র, সমাজ ও নাগরিকের প্রতি দায়িত্বশীল।

তিনি বলেন, প্রত্যেকে যার যার সেক্টরে একটি দৃষ্টান্ত রাখার মতো ভালো কাজ করলেই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার শতভাগ বাস্তবায়ন হবে। বছরজুড়েই নকল পণ্যবিরোধী এই কার্যক্রম চালিয়ে যাবে সমকাল।

নকল পণ্যের বিরুদ্ধে সবাইকে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে সমকাল সম্পাদক বলেন, নকল পণ্যের আর্থিক ক্ষতি হাজার হাজার কোটি টাকা। স্বাস্থ্য ও পরিবেশ ঝুঁকি তো রয়েছেই। বছর শেষে নকলবিরোধী নানা কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য ভূমিকার জন্য বিচারকমণ্ডলীর মাধ্যমে মনোনীত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে একাধিক ক্যাটাগরিতে পুরস্কার ও ক্রেস্ট দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

এই প্রচারাভিযানে সমকালের সহযোগী হিসেবে রয়েছে বিএসটিআই, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব), কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব), এফবিসিসিআই, ঢাকা চেম্বার ও জেসিআই-নর্থ। টেলিভিশন পার্টনার হিসেবে রয়েছে 'চ্যানেল টোয়েন্টিফোর' এবং রেডিও পার্টনার 'ঢাকা এফএম'।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, নকল-ভেজাল পণ্য বন্ধে শুধু অভিযান চালালে হবে না, এ জন্য সচেতনতাও জরুরি। নকল পণ্য সরাসরি মানুষের জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই অনেক গুরুত্ব দিয়ে নকল পণ্য বন্ধে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। সমকালের এ উদ্যোগ সময়োপযোগী এবং প্রশংসনীয়।

স্পিকার আরও বলেন, নকল পণ্যের ব্যাপারে ভোক্তাকে আরও সচেতন করতে হবে। সচেতনতা তৈরি হলে ভোক্তা নিজেই নকল পণ্য কিনবেন না। নকল পণ্য ঠেকাতে সবার দৃঢ় প্রতিশ্রুতি থাকা দরকার। নকল পণ্য মোকাবিলায় নানা আইনি কাঠামো বিদ্যমান। তবে এসব আইন যথাযথভাবে কার্যকর করা জরুরি। যারা পণ্য উৎপাদন করছে, তারা পণ্যের গায়ে বিশেষ এমন কিছু ব্যবহার করতে পারে, যাতে ভোক্তা সহজেই দেখে বুঝতে কোনটা আসল আর কোনটা নকল।

অনুষ্ঠানে সমকালে প্রকাশিত সাতটি অনুসন্ধানী সিরিজ প্রতিবেদনের সারমর্ম তুলে ধরেন সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। তিনি জানান, দেশে প্রায় সব পণ্য নকল হচ্ছে। ক্রেতারা নকল প্রসাধনী কিনে প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন। নামিদামি ব্র্যান্ডের নকল প্রসাধনী ফুটপাতে সস্তায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন কোম্পানির নকল ওষুধও বাজারে অবৈধভাবে বিক্রি হয়। নকল-ভেজাল ও মানহীন ওষুধ উৎপাদনের মূলে রয়েছে খোলাবাজারে বিক্রি হওয়া কাঁচামাল। অবৈধপথে বিপুল পরিমাণ হ্যান্ডসেট আমদানি বন্ধ না হওয়ার কারণে সরকার যেমন রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি ক্রেতারাও নিম্নমানের পণ্য কিনে প্রতারিত হচ্ছেন। এ ছাড়া অবৈধ কারখানায় সিগারেট তৈরি, নকল ট্যাপ স্ট্যাম্প ব্যবহার, একই ট্যাপ স্ট্যাম্প বারবার ব্যবহার ও চোরাপথে সিগারেট আমদানি করে একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী সরকারকে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে। এমনকি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র জাল রেভিনিউ স্ট্যাম্প বিক্রি ও তৈরির সঙ্গে জড়িত। নকল জাল স্ট্যাম্পের কারণেও সরকার ওই খাতে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন বলেন, সাধারণত দেখা যায় বড় বড় প্রতিষ্ঠান সব ধরনের পণ্য তৈরি করতে চায়। ফলে ছোট প্রতিষ্ঠানের জন্য বাজারে টিকে থাকা দায় হয়ে যায়। অনেক নামসর্বস্ব কোম্পানি নকল পণ্য বানানো শুরু করে। তাই বড় কোম্পানির উচিত সব ধরনের পণ্য প্রস্তুত না করা।

শিল্পমন্ত্রী বলেন, কিছু পণ্য ছোট কোম্পানিগুলোর জন্য ছেড়ে দেওয়া উচিত। লাভের আশায় অধিক ক্যাশপ্রেম বাদ দিয়ে দেশপ্রেম বাড়ানো উচিত। বড় কোম্পানিগুলো সব পণ্য তৈরি করতে পারবে না- এমন আইন করা দরকার। তিনি বলেন, ভেজাল পণ্য ঠেকাতে সরকারের ওপর সব দায়িত্ব ছেড়ে দিলে হবে না। বড় প্রতিষ্ঠানের উচিত নকল প্রতিরোধে নিজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো ও নিজস্ব টিম তৈরি করা।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতেও একসময় নকল ছিল, সেটা সারাতে অনেক সময় লেগেছে। সাদা কাপড় পরা মানুষগুলো সাদা হলে দেশ থেকেও নকল পণ্য একদিন উঠে যাবে। নকল পণ্য ঠেকাতে যেসব মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা আছে, তাদের অভিযান পরিচালনা করা উচিত বলে মত দেন শিল্পমন্ত্রী। তিনি বলেন, ভেজালবিরোধী অভিযান র‌্যাবের পরিচালনা করার কথা নয়। পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো অভিযানে র‌্যাবের সহযোগিতা চাইলে তখন তারা সহায়তা করবে। তবু অন্য কাজের বাইরে র‌্যাব নকলবিরোধী অভিযান চালাচ্ছে। এতে তারা সাধুবাদ পেতে পারেন।

কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান বলেন, ভোক্তারা নকল, ভেজাল, নিম্নমানের পণ্য ও সেবার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে শুধু আর্থিক ক্ষতি হয় তা নয়, স্বাস্থ্যগত ক্ষতিও হয়। যেখানে ভোক্তার প্রাণের ঝুঁকি আছে, সেখানে আইনে মাত্র দুই লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। এটা এক ধরনের দুর্বলতা। আইনের এই দুর্বলতা দূর করা দরকার। নকল প্রতিরোধে সরকার বেশ কিছু আইন করেছে। এসব আইন বাস্তবায়নে কিছু প্রতিষ্ঠানও করা হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানগুলোর জনবল ও দক্ষতায় ঘাটতি রয়েছে।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম বলেন, নকল পণ্য তৈরি করতে কিছু মেশিন দরকার। কিছু কাঁচামাল দরকার। দেশে কোন মেশিনের বা কাঁচামালের কতটা চাহিদা, তার সঠিক পরিসংখ্যান দরকার। এ ক্ষেত্রে সরকারের সংস্থাগুলোর সমন্বয় প্রয়োজন। নকল পণ্য বানানোর জন্য কাঁচামাল আমদানি বন্ধ করতে হবে। এ জন্য কোন খাতে কী পরিমাণ পণ্য দরকার, তা সঠিকভাবে নিরূপণ করতে হবে। তিনি নকলকারীদের শাস্তির পাশাপাশি পুনর্বাসনের প্রস্তাব দেন। তিনি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, বিএসটিআই, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে শক্তিশালী করার সুপারিশ করেন। সমকালের এ উদ্যোগে এফবিসিসিআই সব পর্যায়ে থাকবে বলে জানান তিনি।

র‌্যাব মহাপরিচালক ড. বেনজীর আহমেদ বলেন, নকল ও ভেজাল পণ্য রোধ করা জাতির জন্য চ্যালেঞ্জ। তবে এরই মধ্যে জাতি অনেক সমস্যা অতিক্রম করে এসেছে। নকল পণ্যের সমস্যাও অতিক্রমযোগ্য। তিনি আরও বলেন, নকল পণ্য প্রতিরোধে দুটি দিক রয়েছে। একটি হলো আইন প্রয়োগ করা, আরেকটি সচেতনতা বাড়ানো। অভিযান ও মামলায় জরিমানার অঙ্ক বাড়াতে হবে। যাতে একবার জরিমানার পর সে আর ঘুরে দাঁড়াতে না পারে। র‌্যাব মহাপরিচালক তার বক্তব্যে ভারত থেকে মেয়াদহীন লাইফসেভিং ওষুধ এনে নতুন লেবেল লাগিয়ে ঢাকার অভিজাত হাসপাতালে সরবরাহকারী একটি চক্রকে গ্রেপ্তারের কথাও জানান।

এনবিআরের সদস্য মেফতাহ উদ্দিন খান বলেন, একটি পণ্য যখন নকল হয়, তখন সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাজস্ব বোর্ড। ওই পণ্যে সরকার ভ্যাট পায় না। আবার ওই ব্যবসায়ী আয়করও দেয় না। যখন কোনো উৎপাদক আনুষ্ঠানিক ব্যবসায় থাকে না, তখন সরকারই বঞ্চিত হয়। কর কমিশনারের দায়িত্ব পালনের সময় রাজধানীর পুরান ঢাকার বাজারে কীভাবে আসল পণ্যের পাশাপাশি বড় কোম্পানির এজেন্টরা নকল পণ্য বাজারজাত করে, সে অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, বড় কোম্পানির কিছু এজেন্ট জেনেবুঝে নকল পণ্য বিক্রি করে।

বিএসটিআইর পরিচালক সাজ্জাদুল বারী বলেন, অনেক ধরনের পণ্যই নকল হচ্ছে। বিএসটিআই অভিযান চালিয়ে এসব কোম্পানি ও জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা করছে। বর্তমানে বিএসটিআই দেশে তৈরি ১৮১টি পণ্যের লাইসেন্স দেয়। আর আমদানি করা ৫৫ পণ্যে লাইসেন্স দিয়ে থাকে। এসব পণ্যের নমুনা বাজার থেকে সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয়। কোনো পণ্যে মান বজায় না থাকলে সংশ্নিষ্ট কোম্পানিকে সতর্ক করা, লাইসেন্স স্থগিত করাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়।

ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশের চেয়ারম্যান গোলাম মঈন উদ্দিন বলেন, যারা নকল পণ্য তৈরি করছে, তাদের শাস্তি হতে হবে কঠোর। বর্তমানে নকলকারীরা ধরা পড়লেও আদালতে জামিন পেয়ে যায়। আইনটি হওয়া উচিত জামিন অযোগ্য। সিগারেটের রাজস্ব প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রতি শলাকা সিগারেটের বিক্রয়মূল্যের ৭১ থেকে ৮১ শতাংশ অর্থ সরকার রাজস্ব হিসেবে পেয়ে থাকে। ফলে রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে সিগারেট বাজারজাত করতে পারলে অনেক লাভ। তিনি বলেন, নকল পণ্য বা সিগারেট তৈরিতে যেসব মেশিন ব্যবহার হচ্ছে, সেগুলো ধ্বংস করার উদ্যোগ দরকার। নকল করতেও বিনিয়োগ করতে হয়, সেই বিনিয়োগ নষ্ট হলে নকলকারীরা নিরুৎসাহিত হবে।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান খান চৌধুরী বলেন, সরকার ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান একসঙ্গে কাজ করলে শতভাগ সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব। কোম্পানিগুলো প্রতিদিন নকল পণ্যের বিরুদ্ধে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই করছে। নকল পণ্যের কারণে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে। আর ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। ভালো পণ্য হারিয়ে যাচ্ছে। শহরের তুলনায় গ্রামের মানুষ নকল পণ্যের মাধ্যমে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রতারিত হচ্ছে। আইন প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠানকে পাশে পেলে নকল পণ্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা যাবে। সমকাল নকল পণ্য প্রতিরোধে যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা দেশের জন্য অত্যন্ত সময়োপযোগী পদক্ষেপ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

ইউনিলিভার বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কেদার লেলে বলেন, নকলকারীরা মেধাবী। কিন্তু তারা মেধা খারাপ কাজে ব্যবহার করছে। এতে দেশ রাজস্ব হারাচ্ছে। মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। যদিও বিশ্বব্যাপী এই অবৈধ ব্যবসা রয়েছে। পুরো বিশ্বের ব্যবসার ৫ শতাংশ হয় অবৈধ প্রক্রিয়ায়। ইউনিলিভার এই নকল ঠেকাতে বাংলাদেশে বাজারজাত করা পণ্যের ৯৯ দশমিক ৫ শতাংশই স্থানীয় কারখানায় তৈরি করে। এরপরও বাজারে সরবরাহ করা পণ্যে নকল হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বিএসটিআই ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নকলের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে, যা ইতিবাচক। তিনি মেধাস্বত্ব রক্ষা ও আমদানির সময় কঠোর পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দেন।

এসিআই কনজুমার ব্র্যান্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ আলমগীর বলেন, গবেষণায় উঠে এসেছে, ৩০ শতাংশ কসমেটিকস ও অন্যান্য পণ্য নকল হচ্ছে। দেশে মশার কয়েলের দেড় হাজার কোটি টাকার মার্কেট। নকল কোম্পানির দৌরাত্ম্যে এখন আসল মশার কয়েল তৈরির প্রতিষ্ঠান সব চলে গেছে। নকল কোম্পানিগুলোর ভ্যাট ও ট্যাপ দিতে হয় না। একদিকে রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার, অন্যদিকে ভোক্তারা পাচ্ছে খারাপ পণ্য। তিনি বলেন, মানসম্মত কয়েলে মশা চলে যাবে; মশা মরবে না। কিন্তু ভেজাল কয়েলে ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানোর কারণে মশা মরে যাচ্ছে। ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে তো কেউ পণ্য কেনে না। তবে নিরাপদ পণ্য কিনতে পারা ভোক্তার অধিকার। এ অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

ঔষধ শিল্প সমিতির মহাসচিব এস এম শফিউজ্জামান বলেন, অন্যান্য পণ্যের চেয়ে ওষুধ নকল হওয়া বিপজ্জনক। এ ক্ষেত্রে ওষুধ কোম্পানিগুলোর সমস্যা আছে। অধিকাংশ কোম্পানি ওষুধ তৈরি বাজারে ছেড়ে দিয়ে বসে আছে। কোনো তদারকি নেই। ঔষধ প্রশাসনের এত দিন লোকবল কম ছিল। এখন লোকবল হয়েছে। বাজারে কিছু অভিযানও চলছে। একটি চক্র আছে, যারা জনপ্রিয় পণ্য নকল করে। এই চক্র ভাঙতে হবে।

স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেডের বিপণন বিভাগের প্রধান জেসমিন জামান বলেন, প্রসাধন পণ্যে নকল অনেক বেশি। স্থানীয় ও আমদানি করা উভয় ধরনের প্রসাধন পণ্যেই নকল হচ্ছে। উৎপাদক প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়কর্মীরা দেশের দোকানে দোকানে গিয়ে নকল পণ্য পাচ্ছে। আর আমদানি করা প্রসাধনের প্রায় অর্ধেকই নকল। এসব প্রসাধন পণ্য পাইকারি বাজারের মাধ্যমে খুচরা পর্যায়ে আসছে। নকল পণ্য প্রতিরোধে ব্যবহূত পণ্যের মোড়ক ধ্বংস করার পরামর্শ দিয়ে বলেন, এতে প্লাস্টিক ও নকল দুটোই কমবে।

বাংলাদেশ মোবাইল ফোন ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক মো. মেজবাহউদ্দিন বলেন, নকল মোবাইল ফোন ব্যবহার করে অপরাধ ঘটতে পারে। অবৈধ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে মানি লন্ডারিং সহজ। মোবাইলের আইএমইআই নম্বর চেক করতে পারার কারণে নকলের প্রবণতা কমছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন (অ্যামচেম) বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক শাহাদাত হোসেন বলেন, অনেক আগে থেকেই অ্যামচেম নকল প্রতিরোধে কথা বলে আসছে। বিশেষ করে মেধাস্বত্ব রক্ষায় এটা জরুরি। সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মেধাস্বত্ব রক্ষা জরুরি। তিনি বলেন, নকল প্রতিরোধে যে আইন আছে, তা কার্যকরে বেশ জটিলতা রয়েছে। শাস্তিও পর্যাপ্ত নয়। আইন কার্যকরে সংশ্নিষ্টদের মধ্যে সমন্বয় ও শাস্তি বাড়ানো দরকার। ঢাকাতে নকলবিরোধী অনেক কার্যক্রম হলেও ঢাকার বাইরে কম। ঢাকার বাইরেও তদারকি বাড়াতে হবে।

ঢাকা চেম্বারের সিনিয়র সহসভাপতি এন কে এ মবিন বলেন, নকল করার শাস্তি বাড়ানো দরকার। নিজের ব্যবসার উদাহরণ দিয়ে বলেন, কখনও কখনও রেভিনিউ স্ট্যাম্পের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। অতিরিক্ত চাহিদার কারণে একশ' টাকার স্ট্যাম্প পাঁচশ' টাকায়ও বিক্রি হয়। এ জন্যই নকল হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের যে সংস্থা রেভিনিউ স্টাম্প সরবরাহ করছে, তাদের সরবরাহ ঠিক রাখার দায়িত্ব নিতে হবে।

র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম বলেন, নকল পণ্য প্রতিরোধে দু-একটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া কারও নিজেদের সার্ভিলেন্স টিম নেই। নামিদামি প্রতিষ্ঠানের নকল পণ্য জব্দ হলে এর সঙ্গে জড়িতরা যাতে শাস্তি পায়, তা নিশ্চিত করতে ওই কোম্পানির পক্ষ থেকেও আইনি সাপোর্ট দেওয়া উচিত। অনেক সময় জব্দ মালপত্র নেওয়ার ক্ষেত্রে বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। ট্রাক ভাড়াও রাষ্ট্রকে বহন করতে হচ্ছে।

জুনিয়র চেম্বার অব কমার্স (বাংলাদেশ) নর্থের সহসভাপতি নাহিদা আক্তার বলেন, নকল প্রতিরোধে সচেতনতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি যারা নকল পণ্য তৈরি করেন বা বাজারজাত করেন, তাদের শাস্তির পরিবর্তে মূলধারার ব্যবসায় সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ইউনিলিভার বাংলাদেশের হেড অব করপোরেট অ্যাফেয়ার্স শামীমা আখতার, বাংলাদেশ মোবাইল ফোন ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী কর্মকর্তা মনিরুল বাশার, ওয়ালটনের অতিরিক্ত পরিচালক মিল্টন আহমেদ, এসিআই কনজুমার ব্র্যান্ডের উপমহাব্যবস্থাপক নাহিদ নেওয়াজ, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের সহকারী মহাব্যবস্থাপক কে এম জিয়াউল হক ও সিনিয়র ম্যানেজার তৌহিদুজ্জামান এবং বিএটি বাংলাদেশের সিনিয়র করপোরেট অ্যাফেয়ার্স ম্যানেজার আনোয়ারুল আমিন ও এপটার্নাল কমিউনিকেশনের এক্সিকিউটিভ ফয়েজ আলী।