উন্নয়ন প্রকল্প

থোক বরাদ্দ আর নয়

সচিব সভার কঠোর অনুশাসন মন্ত্রণালয় মানছে না

প্রকাশ: ১৫ মার্চ ২০২০     আপডেট: ১৫ মার্চ ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব

অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধে উন্নয়ন প্রকল্পে আর থোক বরাদ্দ দেবে না সরকার। প্রকল্পে বাড়তি থোক বরাদ্দের বিপুল টাকা নয়ছয়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বরাদ্দের এই টাকা কাগজে কলমে উন্নয়ন খাতে ব্যয় হয়েছে দেখিয়ে একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে তা নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে আসছে। সিন্ডিকেটটি দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন ও কেনাকাটা নিয়ন্ত্রণ করে আসছে।

মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি ইতোমধ্যে ঠিকাদার, সংশ্নিষ্ট প্রকল্পের কর্মকর্তা ও মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষের যোগসাজশে অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছে। এরই মধ্যে সাতটি মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) মামলাও হয়েছে। এ ধরনের ঘটনা অন্যান্য প্রকল্পেও ঘটছে। এমন প্রেক্ষাপটে শুধু স্বাস্থ্য খাত নয়, বিভিন্ন প্রকল্পেই থোক বরাদ্দের নামে অনিয়ম ও দুর্নীতি রোধে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের সভাপতিত্বে সচিব কমিটির সভা হয়। সভায় একাধিক সচিব বিভিন্ন খাতে দুর্নীতির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য উপস্থাপন করেন।

পরিকল্পনা কমিশনের এক সদস্য (সচিব) সভায় অভিযোগ করেন, এর আগে পরিকল্পনামন্ত্রীর সভাপতিত্বে সচিব সভা থেকে কোনো প্রকল্পে থোক বরাদ্দ না রাখার অনুশাসন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অধিকাংশ মন্ত্রণালয় এ নিয়ম মানছে না। কোনো কোনো মন্ত্রণালয় থোক বরাদ্দ রেখে পিপি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠাচ্ছে। দুর্নীতি রোধে পিপিতে সব ধরনের পণ্যের মূল্য উল্লেখ করার নির্দেশনা থাকা প্রয়োজন। সভায় আরেক সচিব বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের যোগসাজশে একটি সিন্ডিকেট স্বাস্থ্য খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি করে আসছে। এদের দৌরাত্ম্য কমাতে অথবা দুর্বল করতে পিপিতে সব ধরনের পণ্যের মূল্য উল্লেখ বাধ্যতামূলক ও পিপিআরে বর্ণিত নিয়ম অনুযায়ী দরপত্র সম্পন্ন করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। সচিব আরও বলেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। প্রকল্পের সঠিক বাস্তবায়নের জন্য এ দুটি বিভাগে কাজের সমন্বয় রাখা জরুরি। না হলে এই মন্ত্রণালয়ের গতিশীলতা বাড়ানো সম্ভব হবে না। স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের প্রকল্প নেওয়ার আগে সমীক্ষা যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতা রাখার জন্য মন্ত্রণালয়কে আরও সতর্ক থাকতে হবে।

সভায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতি রোধে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে- মন্ত্রণালয়ের উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় থোক বরাদ্দ না দেওয়ার জন্য কঠোর অনুশাসনের ব্যবস্থা এবং মাঠ পর্যায়ে অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধে সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবদের নিয়মিত প্রকল্প কার্যক্রম পরিদর্শন করা।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সভার কার্যপত্রের তথ্যমতে, স্বাস্থ্য খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতি অনুসন্ধানে গঠিত তদন্ত কমিটি মাঠ পর্যায়ে অনিয়মের সত্যতা পেয়েছে। 'থোক বরাদ্দ' বন্ধ করা গেলে দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধ হবে বলে সচিব সভায় মতামত দেওয়া হয়েছে।

সম্প্রতি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভায়ও স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে আলোচনা হয়। কমিটির সভাপতি আবুল কালাম আজাদের সভাপতিত্বে সভায় পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, সাবের হোসেন চৌধুরী, বীরেন শিকদার, আবিদা আনজুম মিতাসহ সংশ্নিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবরা অংশ নেন।

সভায় সংসদীয় কমিটির সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, তার নির্বাচনী এলাকা রাজধানীর মুগদা জেনারেল হাসপাতাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিন বছর আগে উদ্বোধন করেন। কিন্তু এর মধ্যেই হাসপাতালটির সব যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে পড়েছে। কারণ নিম্নমানের যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হয়েছে।

সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, হাসপাতালে যন্ত্রপাতি কেনার চেয়ে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় বেশি হচ্ছে। একটি সিন্ডিকেটের খপ্পরে গোটা স্বাস্থ্য খাত জিম্মি হয়ে পড়েছে। সরকারি হাসপাতালগুলো জনগণকে কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্য সেবা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। থোক বরাদ্দের নামে লুটপাট যাতে না হয়, সে ব্যাপারে তাই কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

কমিটির সদস্য বীরেন শিকদার জানান, তার নির্বাচনী এলাকা মাগুরা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা সরঞ্জাম ক্রয়ে অনিয়ম হয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে কতিপয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন না থাকলেও প্রচলিত বাজার মূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দামে বিভিন্ন চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে। এ ক্ষেত্রে অসাধু ঠিকাদাররা সিন্ডিকেট করে এ ধরনের টেন্ডারে অংশ নিচ্ছে। সিন্ডিকেটের কারণে প্রতিযোগিতামূলক দর না পাওয়ায় প্রচলিত বাজারমূল্যের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দামে বিভিন্ন সামগ্রী কেনা হচ্ছে।

সংসদ সদস্য আবিদা আনজুম মিতা বলেন, কিছু সুবিধাবাদী রাজনৈতিক নেতা ও কর্মকর্তার যোগসাজশে কিছু ঠিকাদার স্বল্পমূল্যে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি কিনে সরকারি হাসপাতালগুলোতে সরবরাহ করছে। ফলে অল্পদিনের মধ্যে সেগুলো নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তিনি যত্রতত্র থোক বরাদ্দ না দেওয়ার সুপারিশ করেন। হাসপাতালের যন্ত্রপাতির মান পর্যবেক্ষণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মনিটরিং সেল গঠনের প্রস্তাবও দেন তিনি।

সদস্য বেগম রওশন আরা মান্নান বলেন, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত সিন্ডিকেটের কবলে পুরোপুরি জিম্মি হয়ে পড়েছে। মন্ত্রণালয়ের অধিকাংশ দরপত্রই সরকারি কর্মকর্তাদের যোগসাজশে নির্দিষ্ট ঠিকাদাররা পেয়ে থাকে। থোক বরাদ্দের নামে অর্থ নেওয়া হলেও তা যথাযথ কাজে ব্যয় করা হয় না।