এই যুদ্ধেও জয়ী হবে বাংলাদেশ

আজকের লড়াই বিশ্ববাসীর

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২০     আপডেট: ২৬ মার্চ ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

শারমীন মুর্শিদ

একাত্তরে আমাদের লড়াই ছিল চেনা শত্রুর বিরুদ্ধে, আজকের শত্রু অচেনা। একাত্তরে লড়াই ছিল বাঙালির। আজকের লড়াই বিশ্ববাসীর। একাত্তরে আমাদের  প্রতিপক্ষ ছিল আর একদল মানুষ, আমরা লড়েছিলাম দেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে, পাকিস্তানি শোষণ-পীড়ন থেকে নিজেদের রক্ষা করতে। আর আজ আমাদের প্রতিপক্ষ একটি অস্তিত্বহীন অস্তিত্ব, যেটি অদেখা কভিড-১৯ ভাইরাস। আজকের লড়াই মানবসভ্যতার টিকে থাকার লড়াই।

একাত্তরে পাকিস্তানি বাহিনী যখন এই বাংলায় গণহত্যা শুরু করে তখনও কিন্তু আমরা প্রস্তুত ছিলাম না। ২৫ মার্চের রাতে এ ধরনের গণহত্যা দেখার জন্য বাঙালি প্রস্তুত ছিল না। কিন্তু বাঙালি ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। সেদিন বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে বাঙালিকে স্বাধীনতার জন্য চূড়ান্ত যুদ্ধে অংশ নিতে আহ্বান জানান। সে ঘোষণায় বাঙালি ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। আমরা সে যুদ্ধে জিতেছিলাম। ৯ মাসের যুদ্ধে আমাদের অনেক প্রাণ হারাতে হয়, অনেক মূল্য দিতে হয়, ক্ষয়ক্ষতির শিকার হতে হয়। আসলে একটা বড় অর্জনের পেছনে সবসময়ই অনেক বড় ত্যাগ থাকে। মুক্তিযুদ্ধের যে চেতনা, যে লক্ষ্য ছিল তা হয়তো ষোলআনা আজ অর্জিত হয়নি। কিন্তু স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে মাথা উঁচু করে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি, আমাদের যে অর্জনগুলো এখনও বাকি আছে সেগুলোও অর্জন করব, সে প্রত্যয় আমাদের আছে। একাত্তরে আমাদের সূর্যসন্তানদের আত্মত্যাগই আমাদের প্রত্যয়ী করে রাখে সবসময়।

আজকে বিশ্ব এক মহাদুর্যোগের সামনে। দুর্যোগ কিন্তু নতুন নয়। অনেকবারই পৃথিবী এ ধরনের মহমারির দুর্যোগে পড়েছে। ১৯১৮ সালে স্প্যানিশ ফ্লুর কথা যদি বলি সে সময় কিন্তু বিপুল সংখ্যায় মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ সে সময় আক্রান্ত হয়েছিল। এর আগেও প্রায় প্রতি শতাব্দীতেই একটা করে মহামারির দুর্যোগ এসেছে। মানবসভ্যতা টিকে থাকার চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। অসংখ্য মানুষ জীবন হারিয়েছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মানুষই জিতেছে এবং টিকে থেকেছে। বরং সেই জীবাণুই নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। অতএব, এবারও বিশ্ব কভিড-১৯-কে কেন্দ্র করে যে সংকটে পড়েছে, সেটাও মানুষ খুব দ্রুতই কাটিয়ে উঠবে, সেই দৃঢ় প্রত্যাশা আমার রয়েছে।

আজ বিশ্বজুড়ে মানুষকে ঘরে থাকতে বলা হচ্ছে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে বলা হচ্ছে, সেটাও কিন্তু নতুন নয়। ১৯১৮ সালেও স্প্যানিশ ফ্লু ঠেকাতে 'মানুষে মানুষে সংস্পর্শ' এড়িয়ে চলার তথ্য ইতিহাসে পাওয়া যায়। তখন এখনকার মতো 'লকডাউন' ব্যবস্থা হয়তো ছিল না। কারণ তখন তো বিশ্বের শহরে শহরে 'কসমোপলিটান সিটি' ব্যবস্থাও গড়ে ওঠেনি। আজ এই লকডাউনের প্রয়োজন হচ্ছে এ দুর্যোগে যতটা সম্ভব মানুষকে আক্রান্ত হওয়া থেকে রক্ষার জন্য। বিশ্বের অনেক দেশ লকডাউনের মাধ্যমে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছে। আমাদের দেশে আমরা আসলে কতটা পারছি?

আমাদের দেশে যতটা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, আমার মনে হয় খুব ধীরগতিতে নেওয়া হচ্ছে। আমরা নিশ্চিতভাবেই এ ধরনের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। আমরা অন্যদের পরিস্থিতি মোকাবিলার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিচ্ছি এবং ব্যবস্থা নিচ্ছি। কিন্তু তারপরও মনে হয় আর একটু কম সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি। যেমন ধরুন সরকার ছুটি ঘোষণা করল, আর মানুষ বাস টার্মিনালে, লঞ্চ টার্মিনালে উপচে পড়ল। এটা প্রমাণ করে আমাদের দেশের মানুষ এখনও এই কভিড-১৯-এর বিপদ সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন নয়। মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া সরকারি তথ্যেই বলেছে, তাদের দেশে মসজিদ নামাজের জামাত থেকেই করোনাভাইরাস বেশি ছড়িয়েছে। আমাদের দেশে কিন্তু সেই অভিজ্ঞতা থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে এখনও এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং কিছু অসচেতন মানুষ এ পরিস্থিতিতেও জামাতে নাজাজ পড়ার জন্য বলে যাচ্ছে। এগুলো এখনই বন্ধ করা দরকার। কারণ আমরা সত্যি জানি না, পরিস্থিতি কোথায় আছে আর কোনো দিকে যাচ্ছে। কমিউনিটি ট্রান্সমিশন বড় আকারে হলে ভয়ংকর পরিণতির মুখোমুখি হতেই হবে। সেই পরিণতি থেকে রক্ষার জন্য, অনেক বেশি প্রাণহানি এড়ানোর জন্য, এখনই আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। সামাজিক দূরত্ব রক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেই হবে সবার মঙ্গলের জন্য।

মুক্তিযোদ্ধা, উন্নয়নকর্মী