করোনা মোকাবিলা

আজ থেকে টিভিতে মাধ্যমিকের ক্লাস

প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২০     আপডেট: ২৯ মার্চ ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সাব্বির নেওয়াজ

করোনাভাইরাসের থাবায় বিপর্যয় নেমে এসেছে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাতেও। ভাইরাস আতঙ্কে ১৭ মার্চ থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে দেশের সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা স্তর মিলিয়ে প্রায় পাঁচ কোটি শিক্ষার্থীর সরাসরি ক্ষতি হচ্ছে এ অচলাবস্থার কারণে। তবে পরিস্থিতি সামাল দিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিয়েছে, দেশের অভিজ্ঞ শিক্ষকদের রেকর্ড করা ক্লাস টেলিভিশনে প্রচার করা হবে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আজ রোববার সকাল ৯টা থেকেই সংসদ টিভিতে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হচ্ছে।

এদিকে করোনা পরিস্থিতির কারণে আগামী ৯ এপ্রিল পর্যন্ত চলমান বন্ধ আরও বাড়বে বলে জানা গেছে। পরিস্থিতির উন্নতি না ঘটলে গ্রীষ্ফ্মকালীন ও রোজার ছুটি সমন্বয় করে একবারে ঈদুল ফিতর পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ রাখার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

কথা ছিল, এপ্রিল মাসে বিদ্যালয়গুলোতে প্রথম সাময়িক পরীক্ষা শুরু হবে। কিন্তু সিলেবাস শেষ না হতেই এবং নতুন শিক্ষাবর্ষের তিন মাস পার না হতেই মধ্য মার্চে বন্ধ হয়ে গেছে সব বিদ্যালয়। পরীক্ষা শুরু না হতেই হোঁচট খেয়েছে সারাদেশের এইচএসসি ও সমমানের ১২ লাখ পরীক্ষার্থী। ১ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়ার কথা ছিল এ পরীক্ষা।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ১২ লাখ শিক্ষার্থীর সব ধরনের পরীক্ষাও আটকে গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সৌমিত্র শেখরের এক গবেষণামতে, শিক্ষার সব স্তর মিলিয়ে একদিন ক্লাস না হলে ১৬ কোটি শিক্ষাঘণ্টা নষ্ট হয়। সে হিসাবে গত ১৭ মার্চ থেকে আগামী ৯ এপ্রিল পর্যন্ত চলমান বন্ধের ২১ দিনে (শুক্রবার বাদে) দেশের সব স্তরের ছাত্রছাত্রীর মোট ৩৩৬ কোটি শিক্ষাঘণ্টা নষ্ট হবে। এই ক্ষতি সামাল দিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় রেকর্ড করা ক্লাস টেলিভিশনে প্রচার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্যমতে, দেশে বিভিন্ন স্তরের ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা পাঁচ কোটির মতো। পৃথিবীর কোনো কোনো দেশের জনসংখ্যাও এত নয়। ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থী এক কোটি ৬৯ লাখ ৫৭ হাজার ৮৯৪ জন। তাদের মধ্যে সরকারি বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী ৯৯ লাখ চার হাজার ২৫৪ এবং বেসরকারি বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ৭০ লাখ ৫৩ হাজার ৬৪০ জন। প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের ৮৫ লাখ ৬৩ হাজার ১৩৩ জন ছাত্রী, যা প্রাথমিকের মোট শিক্ষার্থীর ৫০ দশমিক ৫০ শতাংশ।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আকরাম আল হোসেন সমকালকে বলেন, দেশের ৬৫ হাজার ৬২০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা প্রশাসনের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করে তাদের উপজেলা ও জেলা প্রশাসনকে সহায়তা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিভাবকদের প্রতি অনুরোধ, সন্তানকে ঘরে যত্নে রাখুন। সচিব জানান, মাধ্যমিক স্তরের মতো তারা প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের জন্যও টেলিভিশনে পাঠ প্রচারের উদ্দেশ্যে ভিডিও কনটেন্ট তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সব স্কুল-কলেজ এবং মাদ্রাসাও বন্ধ রয়েছে। মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোয় মোট শিক্ষার্থী ৭৫ লাখ ১০ হাজার ২১৮ জন। আর উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থী ২৯ লাখ ১৫ হাজার ৮৫১ জন। মাদ্রাসা শিক্ষায় মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ২১ লাখ ৯৭ হাজার ৮৭৭। এর বাইরে প্রফেশনাল শিক্ষায় মোট শিক্ষার্থী ৭০ হাজার ৯৯৮ জন। টিচার এডুকেশনে পড়ছেন ৩৮ হাজার ৬৯১ জন শিক্ষার্থী। কারিগরি শিক্ষায় মোট শিক্ষার্থী পাঁচ লাখ ছয় হাজার ৫৫৬ জন।

টেলিভিশনে ক্লাস আজ থেকে : মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তর প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের 'এটুআই' প্রকল্পের সহযোগিতায় টেলিভিশনে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ক্লাস প্রচারের উদ্যোগ নিয়েছে। সংসদ টেলিভিশনে আজ রোববার থেকে মাধ্যমিকের ক্লাস সম্প্রচার শুরু হচ্ছে। এ পরিকল্পনা অনুযায়ী 'আমার ঘরে আমার ক্লাস' শিরোনামে প্রতিদিন ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির আটটি ক্লাস সম্প্রচার করা হবে। সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত এই ক্লাস প্রচারিত হবে। এর পর বেলা ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত একই ক্লাস পুনঃপ্রচার করা হবে।

এটুআইয়ের সহায়তায় মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তর এই ক্লাস সম্প্রচার করছে। ইতোমধ্যে মাউশি অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে বিস্তারিত শ্রেণিসূচি প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রথম পর্যায়ে ২৯ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত শ্রেণিসূচি প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিদিন প্রতিটি শ্রেণির ২টি ক্লাস সম্প্রচার করা হবে। ক্লাসের ব্যাপ্তি হবে ২০ মিনিট। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে ৯টা ৫ মিনিট পর্যন্ত জাতীয় সংগীত প্রচার করা হবে। আজ সকাল ৯টা ৫ মিনিটে ষষ্ঠ শ্রেণির ইংরেজি ক্লাসের মাধ্যমে এই সম্প্রচার কার্যক্রম শুরু হবে। প্রতিদিন বেলা ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ক্লাসগুলো পুনঃপ্রচার করা হবে। পরবর্তী ক্লাস রুটিন আগামী ১ এপ্রিল মাউশির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে।

মাউশি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ গোলাম ফারুক সমকালকে বলেন, 'পাঠদানকারী শিক্ষক ক্লাস শেষে পাঠদানকৃত বিষয়ের ওপর বাড়ির জন্য অনুশীলন দেবেন। প্রতিটি বিষয়ের জন্য শিক্ষার্থীরা আলাদা খাতায় তারিখ অনুযায়ী বাড়ির কাজ করবে। স্কুল খোলার পর স্ব-স্ব স্কুলের নির্দিষ্ট বিষয়ের শিক্ষকের কাছে বাড়ির কাজ জমা দিতে হবে। এই বাড়ির কাজের ওপর প্রাপ্ত নম্বর ধারাবাহিক মূল্যায়নের অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে।'

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের 'ব্যানবেইস', মোবাইল ফোন কোম্পানি 'রবি' এবং একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টুডিওতে ইতোমধ্যে দুই শতাধিক ক্লাস রেকর্ডিং করা হয়েছে। ক্লাস নিতে আগ্রহী শিক্ষকদের কাছে ই-মেইলের মাধ্যমে আবেদনও আহ্বান করেছে মাউশি অধিদপ্তর।