চোখ দুটো আয়ত তুলে ওপরের দিকে তাকালেন আল আমিন। বুজে আসছে ও দুটো। কষ্ট হচ্ছে খোলা রাখতে। ক্লান্ত আর অবসন্ন চাহনিতে তবু তাকিয়ে রইলেন আকাশের দিকে। এক টুকরো মেঘ ভেসে যাচ্ছে পেঁজা তুলোর মতো। পাশে নীলচে আরও কয়েক খণ্ড। একটু দূরে গোলাপি আভায় মেশানো আরও কিছুটা। আর বাকিটুকু সফেদ-সাদা কী সুন্দর, কী মায়া, কী বুক
নাচানো ছবি!

জ্বর ছিল আল আমিনের। বেদনাবিধুর শরীর, ভার আর চিন্তাক্রান্ত মন। ঢাকা থেকে ফিরছিলেন নওগাঁর বাড়িতে। শুক্রবার, সূর্য ডুবে রাত। কিন্তু বাড়িতে ঢোকা তো দূরের কথা, গ্রামে ঢুকতে পারেননি তিনি। সবার সন্দেহ- করোনায়
ছুঁয়েছে তাকে।

ভেটি অটোরিকশা স্ট্যান্ডে অনেকক্ষণ বসে ছিলেন আল আমিন। গ্রামের বাইরে এই জায়গাটা থেকে তাকিয়ে ছিলেন তিনি গ্রামের দিকে। ওই তো আল রাস্তাটা পেরিয়ে ডান দিকে একটা বাঁক, সেটা পেছনে ফেলে খাঁ বাড়ি। তাদের মস্ত কাছারি ঘরটা পেরিয়ে আরও একটু সামনে। রানাঘাটের পুকুর ছুঁয়ে ঝাঁকড়া পাতার পাকুড় গাছটা। বুকের ভেতর ঠান্ডা করা বাতাস ছুঁইয়ে যে হালট নেমে গেছে পুব দিকে, তার মাথাতেই তার বাড়ি। টিনের গেটে হাত রাখা ঠিক তারপর। আলতো চাপে তার ক্যাচক্যাচ, স্বাগতমের অভিবাদন। দরজায় যাওয়ার আগেই অলৌকিক দেবতার মতো মায়ের আগমন, 'গ্যাদা আইছোস!' দ্রুত গ্লাস হাতে মায়ের কলতলায় যাত্রা, অনেক পানি ঝরিয়ে ঠান্ডা গ্লাস ছেলের হাতে, 'পানি খা বাপ। অনেক দূর থেইক্যা আইছোস। মুখটা শুকায়া গেছে রে!'

ভাত খেতে থাকেন আল আমিন। বাড়ির কয়জন এসে পাশে দাঁড়ায় তার। স্বজন যে, বুকের গভীরে যে নিত্য বাস। চিকিৎসার জন্য প্রথমে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় আদমদীঘি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, সেখান থেকে ভেটি কমিউনিটি ক্লিনিকে, তারপর রানীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, তারও পর নওগাঁ সদর হাসপাতালে। কোথাও কোনো চিকিৎসা পাননি তিনি।

পরের দিন। শনিবারের বিকেল। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় তাকে। চিকিৎসাবিহীন তিনি সেখানেও। তার পর তার কি অভিমান হয়েছিল? একটু? না একটু বেশি? কার প্রতি- মানুষের, না স্রষ্টার? সম্ভবত স্রষ্টার প্রতি। অভাবীদের অভিমান দীর্ঘ হয় না। আর স্রষ্টাকেও সম্ভবত কিছু বলার আছে তার। তাই তো টুপ করে রাতেই চলে যান তিনি।

দীর্ঘদিন অসুখে ভুগছিলেন আল আমিন। অসুস্থ থাকার পরও পেটের দায়ে কাজ করতেন ঢাকায়। আল আমিন মানে বিশ্বাসী। সেই বিশ্বাসী হয়েই বিশ্বাস করেছিলেন- স্রষ্টার কাছে খাবারের অভাব নেই। তার কাছে প্রচুর খাবার। চোখ দুটো বুজে ফেলেন তিনি প্রবল বিশ্বাসে।

রণবীর সিং বলিউডের নায়ক নন, এ রণবীর সিং কাজ করতেন দিল্লির এক রেস্তোরাঁয়। খাবার সরবরাহ করতেন তিনি সেখান থেকে। কিন্তু করোনায় হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায় সবকিছু। কাজ নেই। ভাবলেন- বাড়ি ফিরবেন, ফিরে যাবেন মধ্যপ্রদেশের মনেরা জেলায়। ৩০০ কিলোমিটার দূর। সড়কে কোনো গাড়ি নেই। হাঁটতে শুরু করেন তিনি।

কিন্তু ২০০ কিলোমিটার যাওয়ার পর আগ্রায় পৌঁছে থেমে যান রণবীর। ক্লান্ত চেহারার তাকে দেখে এক দোকানি পানি খেতে দেন, চা-বিস্কুট দেন। নিস্তেজ হয়ে পড়েন তিনি ক্রমেই। সাড়ে ৬টার সন্ধ্যা। হৃদযন্ত্র থেমে যায় তার, থেমে যান রণবীর।

তার আর বাড়ি ফেরা হয় না।

'জীবনটা বেদনার।'

তবে কেন শিমুরার কাছে জীবনটা বেদনার ছিল না কখনও। আনন্দের ছিল বরাবরই। জাপানের এই জনপ্রিয় কমেডিয়ান বাংলায় প্রবেশ করেছিলেন বাংলা ডাবিংয়ে, তার অভিনীত বিভিন্ন দৃশ্যে, আমাদের দেশে তার নাম ছিল- কাইশ্যা। সব শেষে হাসতে হাসতে উচ্চারণ- জীবনটা বেদনার।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত শিমুরার জীবনটা বেদনারই হয়ে গেল- ২০ মার্চে জ্বর আসে তার, ২৩ মার্চে করোনা টেস্টে পজিটিভ, তারপর ২৯ মার্চ...?

সত্তর বছরের হাসিমাখা জীবন ছিল, মাত্র একদিনে বিষাদ হয়ে গেল সব। হাসাবেন না আর কোনোদিন, কাঁদাবেন। অনেকদিন, বহুদিন।

আল আমিন মুসলমান ছিলেন, রণবীর হিন্দু আর শিমুরা ছিলেন বৌদ্ধ। একেকজন একটা করে জীবন পেয়ে এই পৃথিবীতে এসেছিলেন, স্রষ্টা দিয়েছিলেন জীবনটা। ধর্মের বিভাজনে নয়, মানুষ হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। স্রষ্টা প্রত্যেক মানুষকে পাঠান শেষ পর্যন্ত তার নিজের কাছে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য। তারা ফিরে গেছেন। তাই কষ্টটা চুয়ে চুয়ে শেষ হয়ে যাবে একসময়। একই পদ্ধতিতে পৃথিবীতে আসা মানুষ তিনজন একই উছিলায় চলেন গেলেন! আবার বুঝে যাই আমরা- মরে গেলে সব ধর্মের সব দেহই মাটি হয়ে যায় শেষ পর্যন্ত, সুবাস-মাখা ফুল ফোটানো সোঁদা গন্ধের মাটি!