করোনাভাইরাসের প্রভাবে ব্যাপক সংকটে পড়েছে দেশের অন্যতম শিল্প খাত পোলট্রি। পুষ্টির চাহিদা মেটাতে প্রধান উৎস মুরগি ও ডিম উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পোলট্রি খাদ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় অনেক খামার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হলো, পরীক্ষাগার বন্ধ থাকায় আমদানি করা পোলট্রি ফিডের কাঁচামাল সরবরাহ হচ্ছে না। পর্যাপ্ত পোলট্রি খাদ্য সরবরাহ না থাকায় খামারিরা মুরগি ও ডিম বিক্রি করে দিচ্ছেন। ফলে বাজারে চাহিদার চেয়ে অতিরিক্ত সরবরাহ থাকায় মুরগি ও ডিমের দাম কমেছে।

নানা গুজবের কারণেও এ পণ্যের চাহিদা কমেছে। এতে মাংস ও ডিম অবিক্রীত থাকছে ৬০-৭০ ভাগ। ফলে নতুন করে খামারিরা মুরগির বাচ্চা তুলছেন না। হ্যাচারিগুলোর উৎপাদন করা এক দিন বয়সের মুরগির বাচ্চা বিক্রি হচ্ছে না। এমনকি ফ্রি দিলেও তা নিতে চাচ্ছে না। এসব কারণে পোলট্রি খাতে প্রতিদিন শতকোটি টাকার বেশি ক্ষতি হচ্ছে বলে দাবি করেছেন এ খাতের সংগঠনগুলোর নেতারা।

পোলট্রি খাত সংশ্নিষ্ট সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিনই ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। চলতি মাসের মাঝামাঝি থেকে এ খাতে করোনার প্রভাব পড়তে শুরু করে। তবে গত এক সপ্তাহ ধরে বড় ধরনের সংকটে আছে এ খাত। বর্তমানে প্রতিদিন দেশে ৩ হাজার ২৭ টন মুরগির মাংস উৎপাদন হচ্ছে। এতে ৩০ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়। কিন্তু ৭০ শতাংশ মুরগি অবিক্রীত থাকছে। এতে ক্ষতি হচ্ছে দিনে প্রায় ২১ কোটি টাকা। প্রতিদিন ৪ কোটি ৬৬ লাখ ডিম উৎপাদনে ২৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু ডিম বিক্রি ৬০ শতাংশ কমে গেছে। এ জন্য ১৫ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ক্ষতি হচ্ছে। এক দিনের মুরগির বাচ্চা উৎপাদন হয় গড়ে ২৬ লাখ ৭২ হাজার পিস। ব্যয় হয় ৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। এই বাচ্চার ৯০ শতাংশ এখন বিক্রি হচ্ছে না। ফলে দিনে ৮ কোটি ৪২ লাখ টাকার ক্ষতি হচ্ছে। দিনে ৯ হাজার ৮৬৩ টন পোলট্রি খাদ্য উৎপাদনে ৩৪ কোটি ৫২ লাখ টাকা ব্যয় হয়। এখন এই খাদ্যের ৭০ শতাংশ বেচাকেনা কমায় ২৪ কোটি ১৭ লাখ ক্ষতি হচ্ছে ফিড ইন্ডাস্ট্রিতে। প্রতিদিন  এ ধরনের প্রাণীর ওষুধ উৎপাদনে ব্যয় হয় ১১ কোটি ১০ লাখ টাকা। এখন প্রায় ৭০ শতাংশ ওষুধ অবিক্রীত থাকায় দিনে ৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকার ক্ষতি হচ্ছে। এছাড়া প্রতিদিন ১ কোটি ৩৪ লাখ টাকার প্রক্রিয়াজাত হিমায়িত পোলট্রি খাদ্য পণ্য উৎপাদন হয়। এখন বাজারে চাহিদা কমে যাওয়া ৯৫ শতাংশ অবিক্রীত থাকছে। এতে দিনে ১ কোটি ২৭ লাখ টাকা ক্ষতি হচ্ছে। এ খাতে বিক্রি কমে যাওয়ায় দিনে মোট ৭৮ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হচ্ছে। মুরগি ও ডিমের দাম কমে যাওয়ায় আরও ১৫ কোটি টাকা লোকসান হচ্ছে। এছাড়া এ খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত পোলট্রি সরঞ্জাম ও খামারিরা বেকার হয়ে পড়েছেন। এতে সব মিলিয়ে শতকোটি টাকার বেশি প্রতিদিন ক্ষতির মুখে পড়েছে পোলট্রি খাত। পোলট্রি খাতের এই সংকটে চরম হতাশায় আছেন খামারিসহ উদ্যোক্তারা। এ খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত উদ্যোক্তারা আশঙ্কা করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি আরও দু'এক সপ্তাহ অব্যাহত থাকলে এ খাতে দেড় হাজার কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হবে।

বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের (বিপিআইসিসি) তথ্য অনুযায়ী, পোলট্র্রি ইন্ডাস্ট্রিতে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ রয়েছে। এ খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৬০ লাখ কর্মসংস্থান রয়েছে। মুরগি ও বাচ্চা উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাত হিমায়িত খাদ্য তৈরি, পোলট্রি খাদ্য, ওষুধ, সরঞ্জাম ও রিসাইক্লিংসহ নানাভাবে তারা সম্পৃক্ত। খামারি থেকে শুরু করে এ শিল্পে ছোট-বড় মিলিয়ে সম্পৃক্ত আছেন কয়েক লাখ উদ্যোক্তা। বর্তমানে সারাদেশে শুধু ৮৮ হাজার মুরগির খামার রয়েছে। এসব খামারে ২০৬টি বিডার্স ফার্ম বা হ্যাচারি বাচ্চা উৎপাদন করে সরবরাহ করছে। এছাড়া অনিবন্ধিত অসংখ্য ক্ষুদ্র হ্যাচারি আছে। নিবন্ধিত ফিড মিল আছে ২১৭টি। দেশে ৩০টির মতো কোম্পানি প্রাণিসম্পদের জন্য ওষুধ উৎপাদন করছে। এছাড়া ওষুধ সরবরাহকারী পাঁচ শতাধিক প্রতিষ্ঠান আছে। পোলট্রির হিমায়িত প্রক্রিয়াজাত শিল্প রয়েছে প্রায় ১২টি।

পোলট্র্রি শিল্পের কেন্দ্রীয় সংগঠন বিপিআইসিসির সভাপতি মসিউর রহমান সমকালকে বলেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতেও পোলট্রির উৎপাদন বন্ধ রাখা যাবে না। কিন্তু উৎপাদিত পোলট্রি বেশিরভাগই অবিক্রীত থাকছে। এখন খামারিরা মুরগির বাচ্চা নিচ্ছে না। অনেকে বাচ্চা ফ্রি দিলেও নিচ্ছে না। মাটিতে গর্ত করে ফেলে দিতে হচ্ছে। বাজারে মুরগি ও ডিমের তেমন ক্রেতা নেই। খামার থেকে বাজার পর্যন্ত পরিবহন ও শ্রমিকের অভাবে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। সার্বিকভাবে চরম সংকট তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে হঠাৎ করে চাহিদা বাড়লেও বাজারে ডিম ও মুরগি দেওয়া সম্ভব হবে না। তখন অস্বাভাবিক দাম বেড়ে যাবে। এখন পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, অনেক খামার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে ডিম, মুরগি, দুধ ও মাছ উৎপাদন, সরবরাহ ও বাজারজাতকরণে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যাংক ঋণের সুদ মওকুফ করার দাবি জানান তিনি।

বিডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ও আফতাব বহুমুখী ফার্মসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবু লুৎফে ফজলে রহিম খান শাহরিয়ার জানান, হঠাৎ করে মুরগি ও মাছ করোনা ছড়াচ্ছে- এমন গুজবে এ খাতে প্রভাব পড়া শুরু হয়। এরপর এ খাতে পণ্য পরিবহনে বাধার সৃষ্টি হওয়ায় সংকট আরও বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন ক্ষুদ্র খামারিরা। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ক্ষুদ্র খামারিদের নিবন্ধন করে ভর্তুকির আওতায় আনতে হবে। পাশাপশি হ্যাচারি, পোলট্রি ফিড ও বড় শিল্পগুলোকে আগামী ছয় মাস ঋণের সুদ মওকুফ ও কিস্তি পরিশোধ স্থগিত করতে হবে। যাতে আর্থিক ক্ষতিতে থাকা পোলট্রিগুলো ঘুরে দাঁড়াতে পারে। তিনি বলেন, এ খাতে পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক না রাখা হলে সমস্যা আরও প্রকট হবে। অনেক খামার বন্ধ হবে।

খালাস হচ্ছে না কাঁচামাল : চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ে একমাত্র পিআরটিসি ল্যাব বন্ধ থাকায় বিপাকে পোলট্র্রি উদ্যোক্তারা। আমদানি করা পোলট্র্রি খাদ্যের কাঁচামাল খালাস করতে পারছেন না তারা। এতে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে ডিম ও মুরগির মাংসের উৎপাদন। পোলট্রি শিল্পে ব্যবহূত প্রায় সব ধরনের কাঁচামাল, বিশেষ করে পোলট্র্রি ও ফিশ ফিডে ব্যবহূত কাঁচামাল এই ল্যাবে পরীক্ষা করে বন্দর থেকে খালাসের অনুমতি দেওয়া হয়। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে গত ২৫ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল সরকার সব সরকারি-বেসরকারি অফিসের জন্য সাধারণ ছুটি ঘোষণা করে। এর আগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়। ফলে চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত পরীক্ষাগারটি বন্ধ হয়ে যায়। এতে বন্দরে আটকা পড়েছে শত শত কোটি টাকার পোলট্র্রি শিল্পের আমদানি করা কাঁচামাল।

এ বিষয়ে বিপিআইসিসির সভাপতি মসিউর রহমান বলেন, পিআরটিসি ল্যাব বন্ধ থাকায় বন্দর থেকে কাঁচামাল খালাস করা যাচ্ছে না। এতে পোর্ট ডেমারেজের পরিমাণ বাড়ছে এবং সেসঙ্গে কাঁচামালের সংকটের কারণে পোলট্রি ও ফিশ ফিডের উৎপাদন বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

প্রাণিসম্পদ খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, দুর্যোগকালীন সময়ে ডিম, দুধ, মাছ, মাংসের মতো পুষ্টিকর খাদ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থাপনায় ল্যাব খোলা রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা শেষ করে পণ্য ছাড় করা সম্ভব হয়।