ত্রাণ বিতরণে সমন্বয় নেই

কেউ কেউ একাধিকবার পাচ্ছেন বঞ্চিত অনেকে

প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২০     আপডেট: ০৩ এপ্রিল ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সমকাল প্রতিবেদক

ছবি: ফাইল

ছবি: ফাইল

করোনার ফলে উদ্ভূত এই সংকটকালে রাজধানীতে বসবাসরত দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণে সৃষ্টি হয়েছে বিশৃঙ্খলা। মূলত জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণেই এমনটা হচ্ছে। এর ফলে কেউ একেবারেই কিছু পাচ্ছেন না, কেউ তিন-চারবারও ত্রাণ পাচ্ছেন। ফলে ত্রাণ থেকে বঞ্চিত থাকছে নিম্ন আয়ের বড় একটি অংশ।

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলরদের মাধ্যমে একদিকে, অন্যদিকে স্থানীয় এমপি, রাজনীতিবিদ, বিত্তশালী ব্যক্তি, হাউজিং সোসাইটি বা বিভিন্ন কল্যাণ সমিতির মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণ করা হচ্ছে। এতে করে ত্রাণের সমবণ্টন নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কিছু এলাকায় জনপ্রতিনিধিরা দরিদ্র মানুষের তালিকাও চূড়ান্ত করতে পারেননি। কোথাও জনপ্রতিনিধিদের হাতে ত্রাণ পৌঁছলেও সেটা বিতরণে তারা গড়িমসি করছেন। ফলে দরিদ্র ও ছিন্নমূল মানুষের কষ্টের সীমা নেই।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্প্রতি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) পক্ষ থেকে প্রত্যেক ওয়ার্ড কাউন্সিলরের কাছে ৫০০ জন নিম্ন আয়ের মানুষের তালিকা চাওয়া হয়। ইতোমধ্যে বেশিরভাগ কাউন্সিলর তালিকা তৈরি করে কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছেন। তবে তাদের কাছে তালিকার বিপরীতে কোনো খাদ্যসামগ্রী বা অর্থ পৌঁছেনি। ঢাকা উত্তর  সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) প্রত্যেক ওয়ার্ডের কাউন্সিলরের মাধ্যমে ৫০০ জন ও সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলরের মাধ্যমে ১০০ জনকে ত্রাণ বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু উত্তর সিটি করপোরেশনের অনেক ওয়ার্ডেই দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও ভোটারের ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। গুলশান, বনানী, বারিধারা বা উত্তরার মতো এলাকার মানুষ অনেক সচ্ছল। বিপরীতে অনেক ওয়ার্ড রয়েছে, যেখানে প্রচুর সংখ্যক বস্তিবাসী ও দিনমজুরের বাস। এসব বিষয় বিবেচনায় আনা হয়নি। দুই সিটি করপোরেশনেরই কিছু ওয়ার্ডের ভোটার সংখ্যা আছে ১০-১৫ হাজারের মধ্যে। আবার কিছু ওয়ার্ডের ভোটার লক্ষাধিক। সেটাও বিবেচনায় আনা হয়নি।

ডিএসসিসির ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডের (কামরাঙ্গীরচরের একাংশ) কাউন্সিলর মোহাম্মদ হোসেন সমকালকে বলেন, তার ওয়ার্ডে নিম্ন আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি। স্থানীয় এমপি অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম গতকাল আড়াই হাজার মানুষকে ত্রাণ দিয়েছেন। কিন্তু নিম্ন আয়ের মানুষের তালিকা তিন দিন আগে ডিএসসিসিতে জমা দিয়েও এখন পর্যন্ত কিছু পাওয়া যায়নি।

ডিএনসিসির ১১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর দেওয়ান আব্দুল মান্নান বলেন, তার ওয়ার্ডের এক কল্যাণপুর বস্তিতেই আছে দুই হাজার ছয়শ' পরিবার। বাকি এলাকার কথা না-ই বললাম। ডিএনসিসি থেকে ৫০০ জনকে দেওয়ার জন্য দুই লাখ ৭১ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। কীভাবে এই টাকা বিতরণ করব সেটা ভাবছি। তিনি জানান, কল্যাণপুর সমাজকল্যাণ সমিতি ১৭৫টি পরিবারের মধ্যে তারা ত্রাণ দিয়েছে। আবার স্থানীয় এমপি আসলামুল হক আসলামও কিছু ত্রাণ দিয়েছেন। এতে সমন্বয়হীনতা সৃষ্টি হচ্ছে। কেউ দু-তিনবার পাচ্ছে। কেউ মোটেই পাচ্ছে না। সব ব্যক্তি বা সংস্থা একসঙ্গে মিলে ত্রাণ দিলে সমবণ্টন হতো।

গত মঙ্গলবার ঢাকা-১০ আসনের নবনির্বাচিত এমপি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের মাধ্যমে ডিএসসিসির ১৪ ও ১৫ নম্বর ওয়ার্ডে ত্রাণ বিতরণের উদ্যোগ নেন। কিন্তু স্থানীয় নেতাদের অবহেলা ও অব্যবস্থাপনায় ত্রাণের সুষম বণ্টন হয়নি। ওই দিন ত্রাণ বিতরণের খবর পেয়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হন। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে তারা চলে যান। পরে মধ্যরাতে গলিতে গলিতে বিতরণের জন্য স্থানীয় নেতাদের কয়েক বস্তা করে ত্রাণ বুঝিয়ে দেওয়া হলেও সেগুলোর সুষম বণ্টন হয়নি।

ডিএনসিসির ভারপ্রাপ্ত মেয়র জামাল মোস্তফা সমকালকে বলেন, ত্রাণ নিয়ে সমন্বয়হীনতার কথা অনেকেই তাকে জানিয়েছেন। ভাল হতো যদি একটি কন্ট্রোল রুম করে সেখানে সবাই ত্রাণের অর্থ বা খাদ্যসামগ্রী জমা দিতেন। কাউন্সিলরদের মাধ্যমে তালিকা করে প্রত্যেক দরিদ্র মানুষকে সেগুলো সুন্দরভাবে ভাগ করে দেওয়া যেত।