বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তি-৩

কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টিতে ত্রিপক্ষীয় অংশীদারিত্ব জরুরি

প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২০     আপডেট: ০৬ এপ্রিল ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সাজিদা ইসলাম পারুল

সাংবিধানিক আইন অনুযায়ী (অনুচ্ছেদ নং-১৫, ২০, ২৯, ৪০ ও অন্যান্য) রাষ্ট্রের প্রত্যেক নাগরিক যতটুকু সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার অধিকার রাখে, বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরাও সমঅধিকার রাখে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ চিত্র ভিন্ন। সামাজিকসহ বিভিন্নভাবে বৈষম্যের শিকার হন তারা। সংশ্নিষ্ট সংস্থার নেতৃবৃন্দ মনে করেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের বৈষম্য নিরসনে প্রয়োজন কর্মসংস্থানের উপযোগী দক্ষতা বৃদ্ধি করা। আর তাদের কর্মসংস্থানের অধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি ও উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মধ্যে ত্রিপক্ষীয় একটি অংশীদারিত্ব। যার কর্মপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিরা দক্ষ হয়ে উঠবে। ফিরে পাবে স্বাভাবিক জীবনযাপনের নিশ্চয়তা।

সর্বশেষ আদমশুমারি (২০১১) অনুযায়ী সামগ্রিক রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তির তালিকাতে প্রতিবন্ধীদের বঞ্চনার দৃশ্য লক্ষণীয়ভাবে উঠে এসেছে। বাল্যবিয়ে, শিক্ষার হার, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, নির্যাতন-নিপীড়ন, সামাজিক মর্যাদার মতো প্রতিটি বিষয়ে প্রতিবন্ধীরা অপ্রতিবন্ধীদের তুলনায় অধিকতর বঞ্চনার শিকার হয়। গবেষণায় দেখা যায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধী শিশুদের উপস্থিতির হার মাত্র ৪০.২৯ শতাংশ। তিন ভাগের এক ভাগ প্রতিবন্ধী দারিদ্র্যতার কারণে চিকিৎসাসেবা নিতে পারে না। প্রতিবন্ধীদের মাঝে বিয়ের হার অপ্রতিবন্ধীদের তুলনায় অনেক কম, আবার বিয়ে বিচ্ছেদের হার বেশি। আর পুরুষ প্রতিবন্ধীর তুলনায় নারী প্রতিবন্ধীর ক্ষেত্রে এসব মৌলিক চাহিদা প্রাপ্তিতে অসমতার হার বেশি।

জানা যায়, দেশের জনসংখ্যার একটা উল্লেখযোগ্য অংশ বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী। সর্বশেষ আদমশুমারিতে মোট প্রতিবন্ধীর সংখ্যা ছিল ১,০১,৫৮৫। জাতীয় আদমশুমারিতে প্রতিবন্ধকতাকে ৬ ভাগে ভাগ করা হয়- ১. অটিজম ২. শারীরিক প্রতিবন্ধী ৩. মানসিক প্রতিবন্ধী ৪. দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ৫. বাকপ্রতিবন্ধী এবং ৬. শ্রবণ প্রতিবন্ধী। বাংলাদশের মোট প্রতিবন্ধীর ৬০ ভাগ কারও কোনো সাহায্য ছাড়াই নিজে নিজে কাজ করতে পারে এবং মাত্র ২৫ ভাগ অন্যের সাহায্য ছাড়া চলাফেরা করতে পারে না। অথচ সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা পেয়ে থাকে মাত্র ৩ ভাগ।

বাংলাদেশের সংবিধান ও প্রতিবন্ধীদের অধিকার রক্ষাকল্পে গৃহীত জাতীয় নীতিমালায় বর্ণিত রয়েছে যে, কর্মসংস্থান এবং প্রজাতন্ত্রের সব দপ্তরের চাকরির ক্ষেত্রে প্রত্যেক নাগরিকের সমান সুযোগ থাকবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩-এর অনুচ্ছেদ-১০ এ প্রতিবন্ধী ব্যক্তি নিয়োগের ক্ষেত্রে বৈষম্যহীনতা, ন্যায়সঙ্গত সুযোগ-সুবিধা, কোটা সুবিধাসহ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর অব্যাহতির কথাও বলা হয়েছে। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতিমালা-২০১১ অনুযায়ী কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে শতকরা পাঁচ ভাগ আসন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য সংরক্ষিত রাখার কথা বলা হয়েছে। তবে ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের দাবিতে নবম থেকে ১৩তম গ্রেডের সরকারি চাকরিতে সব ধরনের কোটা বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। যার প্রভাবে প্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থানের পরিসর আরও সংকুচিত হতে পারে। যদিও সরকার বিশেষ বিবেচনায় প্রতিবন্ধীদের নিয়োগ প্রদানের বিষয়টি উল্লেখ করেছে।

বাংলাদেশে বর্তমান সামগ্রিক বেকারত্বের হার ৪.২ শতাংশ, (বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ২০১৮) যেখানে প্রতিবন্ধী বেকারত্বের হার তুলনামূলক বেশি। ন্যাশনাল ফোরাম অব অর্গানাইজেশন্স ওয়ার্কিং উইথ ডিসঅ্যাবিলিটিস (এনএফওডব্লিউডি) এক গবেষণায় দাবি করে, মোট প্রতিবন্ধীর মাত্র ৫ শতাংশ সরকারি খাতে চাকরি করছে আর ১৭ শতাংশ বিভিন্ন বেসরকারি খাতে। অথচ বাংলাদেশের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে চাকরি ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীদের কাজের যথেষ্ট পরিসর থাকলেও তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। তবে বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকারবিষয়ক জাতিসংঘ সনদে ২০০৭ সালে স্বাক্ষর করেছে এবং দেশে প্রতিবন্ধীদের অধিকার সুরক্ষা করতে রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতা নিশ্চিত করেছে। কাজ করার অধিকারসহ দেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সব অধিকার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ অঙ্গীকারবদ্ধ।

সরকার দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানে প্রতিবন্ধীদের অন্তর্ভুক্তকরণকে অন্যতম অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করছে এবং সে লক্ষ্যে সব কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ৫ শতাংশ ভর্তি কোটা নির্ধারণ করেছে। এ ছাড়া সেখানে প্রতিবন্ধীদের জন্য অন্যান্য সুবিধা যেমন- হোস্টেল, যাতায়াত এবং বৃত্তি প্রদানের বিষয় উল্লেখ রয়েছে। প্রতিবন্ধীদের অধিকার সমর্থনে বাংলাদেশে ৪০০-এর বেশি সংগঠন রয়েছে যারা প্রতিবন্ধীদের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে।

একই সঙ্গে প্রতিবন্ধীদের কর্মক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তকরণ বৈচিত্র্য আনয়নের লক্ষ্যে বেসরকারি বিভিন্ন এনজিও, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান 'প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালা'র মধ্য দিয়ে কাজ করছে। ওইসব সংগঠনের মধ্যে একটি ভিটিসি। ভিটিসি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি চাকরির ব্যবস্থাও করে থাকে।

পিএফডিএ-ভিটিসির চেয়ারম্যান সাজিদা রহমান ড্যানি বলেন, 'ভোকেশনাল এবং ব্যক্তি উন্নয়নের কাজগুলোর সমন্বয়ে পরিপূর্ণ কারিকুলাম তৈরি করা হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের পূর্ণ প্রোফাইলসহ অ্যাসেসমেন্ট এবং স্কিল ডেভেলপমেন্টের বিস্তারিত পাওয়া যায়। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু এবং প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিদের সরাসরি ইন্টারভেনশন বা সেবাদান, স্নায়বিক প্রতিবন্ধীদের জন্য কারিগরি শিক্ষা, এরপর চাকরি ও অর্থনৈতিক সক্ষমতার বিষয়ে ভিটিসি সমাজের মূলধারায় শক্ত অবস্থান নির্মাণে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।'

কিছু সফলতার গল্প : বর্তমানে রাজধানীর গুলশান-১ এ 'অ্যাঞ্জেল শেফ' নামে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দ্বারা পরিচালিত নতুন ফুড ব্র্যান্ড বাজারে চালু হয়েছে। ওপেন কিচেনসহ বিভিন্ন স্থানে ফুড কিওস্ক স্থাপিত হয়েছে যেখানে প্রতিবন্ধীরা বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ করছে। এ ছাড়া ৫৬ জন স্নায়বিক প্রতিবন্ধী বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন, ট্রান্সকম, দি অলিভ হোটেল, অলিভ গার্ডেন, সিগনেচার ক্যাফেসহ আরও নতুন কিছু হোটেলে কাজ করছে। ভিটিসির জীবন দক্ষতা ও জীবিকাসংক্রান্ত প্রশিক্ষণ নিয়ে বেশকিছু শিক্ষার্থী নিজের এলাকা শহীদ নগর, নতুনবাজার এবং ঢাকায় ফিরে যথাক্রমে কাপড় ও চায়ের দোকান খুলে তাদের নিজের কর্মসংস্থান শুরু করেছে। সেরিব্রাল পলসিতে আক্রান্ত কয়েকজন ব্যক্তি ভিটিসি থেকে সমন্বিত প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজের বাসস্থান শ্যামপুরে টেইলারিং এবং প্রাইভেট টিউশনি করে জীবিকা নির্বাহ করছে। সম্প্রতি পিএফডিএ-ভিটিসি আড়ংয়ের সঙ্গে চুক্তিসম্পন্ন করেছে যেখানে আড়ং কর্তৃপক্ষ ভিটিসির ছাত্রছাত্রীদের তৈরিকৃত পুঁতির অলংকারসামগ্রী সারাদেশে তাদের আউটলেটে বিক্রি করবে। বাংলাদেশে এটাই হবে প্রথম একটি উদাহরণ যেখানে আড়ংয়ের মতো একটি প্রতিষ্ঠান বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের তৈরি দ্রব্যাদির গুণগতমানকে স্বীকৃতি দিয়েছে।

এদিকে ৩৩ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে বেকারি এবং ফুড সার্ভিসের ওপর ট্রেনিং দিয়ে চাকরি দিয়েছে এসিআই লিমিটেড। এসিআই লজিস্টিকের নির্বাহী পরিচালক সাব্বির নাসির বলেন, 'কর্মক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীদের নিয়োগদানকে দাতব্য বা অনুদান অথবা সামাজিক দায়বদ্ধতা হিসেবে না দেখে এটিকে একটি বিচক্ষণ পন্থা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। সেই তাগিদ থেকে স্বপ্নতে সম্পূর্ণ একটা বেকারি পরিচালনা করছে বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তি। বিক্রয়কর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী থেকে শুরু করে খাবার তৈরিও করছেন তারা। প্রথমে ৩৩ জনকে প্রশিক্ষণ প্রদান শেষে চাকরি দেওয়া হয়। এদের মধ্যে বর্তমানে ২৩ জন কর্মরত। আর বাকি যারা চলে গেছেন তাদের অনেকেই নিজ এলাকায় গিয়ে ফাস্টফুডের দোকান দিয়েছেন। তিনি আহ্বান জানিয়ে বলেন, 'দেশের বেসরকরি প্রতিষ্ঠানগুলো অন্তত কোটাভিত্তিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চাকরি দিলে তারাও অর্থনৈতিক উন্নয়নে এগিয়ে আসবে। স্বাভাবিক জীবনযাপনেও তারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে।'

তবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমঅধিকার রক্ষায় সরকা-িবেসরকারি এবং উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মধ্যে ত্রিপক্ষীয় অংশীদারিত্ব তৈরির প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ইসমাইল। তিনি বলেন, 'বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে সরকার নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু জনবলের ঘাটতিসহ বিভিন্ন কারণে তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। তাই বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের বিভিন্ন সংস্থার সাহায্যে প্রশিক্ষণ প্রদান করে কর্মদক্ষ করে তুলতে হবে। একই সঙ্গে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সহযোগিতায় মূলধারার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা এবং সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় তাদের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে।'